আগস্ট মাস চলছে। শুধু বাংলাদেশই নয়, উপমহাদেশের ইতিহাসে আগস্ট নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক পরাধীনতার শেকল ভেঙ্গে পাকিস্তান ও ভারত স্বাধীনতা লাভ করেছিল ১৯৪৭ সালের যথাক্রমে ১৪ ও ১৫ আগস্ট। এর আগে ১৯৪৬ সালের ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট ৪ দিন কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। ইতিহাসে তা ‘গ্রেট কলকাতা কিলিং’ নামে পরিচিত। এ দাঙ্গার সময় হাজার হাজার মুসলমান পরিবার কলকাতা, আসাম ও বিহার থেকে পূর্ব বাংলায় মাইগ্রেট করতে বাধ্য হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে ঊর্দূভাষি পাকিস্তানি হিসেবে পরিচিত যে সব স্ট্র্যান্ডেড অবাঙ্গালীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে জেনেভা ক্যাম্প বা বিহারিদের আবাসস্থলগুলোতে অবস্থান করছে, তাদের একটা বড় অংশ ছিচল্লিশ সালের দাঙ্গার সময় প্রাণভয়ে বাংলাদেশে এসেছিল। একদিকে হিন্দুত্ববাদিদের মুসলিম বিদ্বেষী প্রচারণা এবং ধমের্র ভিত্তিতে বাংলা ভাগের দাবি, অন্যদিকে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে সর্বভারতীয় মুসলীম লীগের ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ বা ১৬ আগস্ট পূর্ব ঘোষিত ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’র কর্মসূচি ঠেকাতে হিন্দুত্ববাদীরা কলকাতার রাস্তায় রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছিল। হিন্দুরা বাংলা ভাগের পক্ষে থাকলেও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা ও প্রদেশগুলোর প্রতিনিধিরা শুরুতে ঐক্যবদ্ধ বা অখ- বাংলার পক্ষে ছিল। কিন্তু কলকাতায় দাঙ্গার পর সে চিত্র আমূল পাল্টে যায়। পূর্ব বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান আন্দোলনে সমর্থন দিয়ে তা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বাহ্যিকভাবে বৃটিশদের গণতান্ত্রিক পন্থাকে সমর্থন করে এবং পশ্চিম বাংলাকে ভারতের সাথে রাখার স্বার্থে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানে ঠেলে দিতে কুণ্ঠিত না হলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলাকে আলাদা করে পাকিস্তান রাষ্ট্রকে দুর্বল ও খ-িত করার চক্রান্ত শুরু হয়। ভিন্ন প্রেক্ষাপট এবং পাকিস্তানী শাসকদের বৈষম্য নীতি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বদলে সামরিক শাসন অব্যাহত রাখার বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির সুত্রে শেখ মুজিবুর রহমানও সেই চক্রান্তের সাথে জড়িত হয়ে পড়েন। কালিদাস বৈদ্য ও চিত্তরঞ্জন সুতারদের লেখায় সেসব ইতিহাস বেরিয়ে এসেছে। ষাটের দশকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সামরিক-বেসামরিক ৩৫ জন আসামীর কেউ কেউ অনেক পরে এই মামলাকে একটি সত্য মামলা হিসেবে স্বীকার করে নেন। ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী তাদের একজন। ২০১১ সালে প্রকাশিত তার লেখা বইয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে সত্য মামলা হিসেবে স্বীকার করেন। যাই হোক, আগস্ট মাস আমাদের মুক্তির মাস, নাকি শোকের মাস তা নিয়ে দলীয় রাজনৈতিক বিভাজন ইতিহাসের এক অমোঘ বাস্তবতা। রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে পাকিস্তানী সামরিক জান্তার রাজনৈতিকভাবে সমাধানের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল, একইভাবে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশের গণমানুষের আকাক্সক্ষার বাইরে গিয়ে গণতন্ত্রের পথ চিরতরে রুদ্ধ করে দিয়ে দেশে একদলীয় দু:শাসন চাপিয়ে দেয়ার প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবসহ তার পরিবার নির্মম হত্যাকা-ের শিকার হন। শেখ মুজিবের সেই নিমর্ম হত্যা-কে জাতি স্বাগত জানিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল। সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে প্রতিশোধের রাজনীতি করতে গিয়ে মুজিবকন্যা শেখ হাসিনা পিতার চেয়েও বড় স্বৈরাচারে পরিনত হয়ে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়ে আরেকটি রক্তাক্ত অভ্যুত্থানকে অনিবার্য করে তুলেছিলেন।
দেড় দশকের আওয়ামী দুঃশাসন থেকে জাতিকে মুক্ত করতে চব্বিশের উত্তাল ছাত্র-জনতা জুলাই মাসকেই বেছে নিয়েছিল। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে দিনে দুপুরে রাজপথে গুলি করে হত্যার পর উত্তাল হয়ে পড়ে ছাত্র-জনতা জুলাই মাসের মধ্যেই হাসিনার পতন নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। ৩১ জুলাই পার হয়ে যাওয়ার পর তারা ১ আগস্টকে ৩২ জুলাই গণনা করে এবং ৫ আগস্টে হাসিনার চুড়ান্ত পতন ও পালিয়ে যাওয়ার দিনটি হয়ে যায় ৩৬ জুলাই। জুলাই অভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়নি। তবে বিএনপি-জামায়াতের মত মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলোই এই অভ্যুত্থানের বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাভোগী হয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদলও পরোক্ষভাবে ক্ষমতার অংশীদার। বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরাও সরকারি দলের মতো একই রকম সুযোগ সুবিধা ভোগ করে থাকেন। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণের ৬ মাসের মাথায় জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর রাষ্ট্রীয় আয়োজন কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। সেখানে আবারো ইতিহাস বিকৃতি এবং জাতিকে বিভক্ত ও বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার এক নীরব তৎপরতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হাফিজউদ্দিন আহমেদের উপস্থিতিতে ৫ আগস্টের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত জুলাই অভ্যুত্থান বিষয়ক প্রামাণ্যচিত্রে জুলাই অভ্যুত্থান শহীদদের প্রধান প্রতীক আবু সাঈদসহ নেতৃত্বে থাকা জুলাই যোদ্ধাদের ভূমিকাকে সঠিকভাবে তুলে না ধরা এবং এক দফার ঘোষক হিসেবে তারেক রহমানের নাম উল্লেখ করার বিষয় নিয়ে চীন মৈত্রী করভেনশন হলে হট্টগোল দেখা দেয়ায় সেখানে আমন্ত্রিত অতিথি বিদেশি কূটনীতিকরা অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যান। জুলাই অভ্যুত্থান দিবসের তাৎপর্য ও ভাবমর্যাদা এভাবে নষ্ট করার মধ্য দিয়ে পতিত স্বৈরাচারের দোসররা কিছুটা হলেও উৎফুল্ল হতে পারে। একাত্তরকে কেন্দ্র করে যেভাবে জাতিকে বিভক্ত করে ভারতীয় আধিপত্যবাদের এজেন্টরা লাভবান হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানকে ঘিরেও ভিন্নভাবে একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানের সহযাত্রী, রাজনৈতিক সুবিধাভোগী এবং এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়া স্বৈচারের দোসর ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের এজেন্টরা একযোগে জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখসারির ছাত্রনেতাদের ভিলেনে পরিনত করতে চাইছে। তারা জুলাই সন্ত্রাস, জুলাই জঙ্গি ইত্যাদি শব্দ গণমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে একটা কাউন্টার প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইনে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। এর বিপরীতে যারা বিএনপিকে আওয়ামী লীগের নতুন সংস্করণ, বিএনপি সরকারের পতন ঘটানো কিংবা নতুন অভ্যুত্থানের ডাক দেয়ার হুঙ্কার দিচ্ছেন, তারাও প্রকারান্তরে পতিত স্বৈরাচারের দোসরদের ফাঁদেই পা দিতে চাইছে!
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু মুজিবীয় শাসনে স্বাধীন বাংলাদেশ আইয়ুব-ইয়াহিয়ার চেয়েও ভয়ঙ্কর দুঃশাসনের সম্মুখীন হয়। শেখ মুজিবের সাড়ে তিন বছরের শাসনে মুজিববাহিনীর হাতে যত সংখ্যক বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মী গুম-খুন ও হত্যার শিকার হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তানের তেইশ বছরেও তার অর্ধেক হয়নি। এ সময়ে রাষ্ট্রীয় লুন্ঠন এবং বৈষম্যের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুর শিকার হয়েছে। একাত্তর পরবর্তী সরকারের অভ্যন্তরে যে অপরাজনীতির চর্চা, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি, অদক্ষতা ও বিভাজন- বৈষম্যের সূচনা হয়েছিল, পঁচাত্তরের বিপ্লবী পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে আমূল পরিবর্তন হওয়ার কথা তার কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করা হয়নি। প্রেসিডেন্ট জিয়ার পরিকল্পনায় সবই ছিল, তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে সে সম্ভাবনা নস্যাৎ করা হয়েছে। এরপর ভারতীয় আধিপত্য ও কালচারাল হেজিমনি এজেন্ডায় জাতিকে বিভক্ত করে অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রেখে লেন্দুপ দর্জির মতো অনুগত শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থের ষোলকলা পূর্ণ করে ভারতীয় আধিপত্যবাদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নিশ্চিত করার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের অভিন্ন লক্ষ্যের ধারাবাহিকতা মাত্র। যারা চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকে একাত্তরের উল্টোপিঠে দাঁড় করাতে চায়, তারা জাতিকে মূলত একাত্তর ও পঁচাত্তরকে ব্যর্থ করে দেয়ার ন্যারেটিভ ও কালচারাল হেজিমনির পুরনো কৌশলের ফাঁদে ফেলতে চাইছে। দেশের শাসক শ্রেণী বলতে শাসকদল ও বিরোধীদলসহ অলিগার্ক ও এলিটশ্রেণীকে বোঝায়। দেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিটি আন্দোলনে সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্ত-নি¤œবিত্ত শ্রেণীর অবদান সব সময়ই অনেক বেশি থাকলেও জাতীয় ঐক্য এবং সমৃদ্ধির সম্ভাবনাগুলো নষ্ট করে কায়েমি স্বার্থ হাসিলের প্রতিযোগিতা শাসক শ্রেণীর মধ্যেই দেখা যায়। গত দেড় যুগ ধরে বিএনপি-জামায়াত আওয়ামী দুঃশাসনের দ্বারা নিপীড়িত-নিগৃহীত হলেও তাদের অবদান ও নেতৃত্ব দৃশ্যমান ছিল না। সতেরো বছর ধরে চলা তাদের সরকারবিরোধী আন্দোলন দেশে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। লন্ডনে বসে তারেক রহমান যথেষ্ট দক্ষতার সাথে দলের নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হলেও দেশে তার নেতাকর্মীরা সে ধারায় ঢাকায় কিংবা মাঠের নেতৃত্ব পায়নি। এ কারণেই ২০১৫ সালের জানুয়ারীতে খালেদা জিয়ার গুলশান অফিসের সামনে থেকে বালুর ট্রাক সরাতে পারেনি। একইভাবে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে লাখ লাখ মানুষের মহাসমাবেশ পুলিশ ফাঁকা গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারগ্যাস দিয়ে ১০ মিনিটে ফাঁকা ও প- করে দিতে পেরেছিল। তারেক রহমানের তুলে দেয়া জনপ্রিয় শ্লোগান ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ’ বিএনপি’র নেতাকর্মীরা ধারণ করতে ব্যর্থ হলেও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের কর্মীরা তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়েছে, এরাই হচ্ছে নতুন বাংলাদেশ।
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ৬ মাসের মাথায় জাতি ঐতিহাসিক বিভক্তি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে। স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যর্থ করে দিতে শুধুমাত্র এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও বিভক্তির রাজনীতিই যথেষ্ট। গত ৫৫ বছর ধরে একপাক্ষিকভাবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেই ভারতীয় হেজিমনি জিইয়ে রাখা হয়েছে। দেশের আমলাতন্ত্র, গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক বয়ানের মধ্যে সেই হেজিমনির বিষবৃক্ষ অনেক গভীর পর্যন্ত শেকড় বিস্তৃত করেছে। নিজেদের ধর্মীয় সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় এবং ইউরোপ, মধ্য এশিয়া ও পারস্য জয় করা মুসলমানদের হাজার বছরের উদারনৈতিক রাজনৈতিক বহুত্ববাদী ঐতিহ্য ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ করার মধ্য দিয়েই সংকীর্ণ আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তির ন্যারেটিভকে পরাজিত ও পরাস্ত করা সম্ভব। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান সেই ধারাকেই জাতির সামনে তুলে ধরেছে। শরিফ ওসমান হাদীর বয়ানে যে চেতনার অনুরণন দেখা গেছে, শোনা গেছে, তা ছিল ভারতীয় আধিপত্যবাদ মোকাবেলায় জাতীয় ঐক্য ও সাংস্কৃতিক চেতনার বয়ান। জুলাই অভ্যুত্থানের দেড় বছর পর রাজপথে আততায়ীর গুলিতে শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যু এবং সেই হত্যাকারীদের ভারতে পলায়ন ও আশ্রয় লাভ থেকে সহজেই অনুমেয় যে, বাংলাদেশের যেকোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে তারা বেশি হুমকি মনে করে। তারা একাত্তরকে ব্যর্থ করে দিয়েছে, পঁচাত্তরকে ব্যর্থ করে দিয়েছে, সর্বদলীয় ঐক্যের নব্বইয়ের গণআন্দোলনকেও ব্যর্থ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। এবার যেকোনো উপায়ে জুলাইকে ব্যর্থ করে দিয়ে জাতিকে আবারো বিভক্ত করে হানাহানি ও নির্মূলের রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতে পারলে যেকোনো এক পক্ষের দিকে ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির হাত প্রসারিত হলে, তা হতে পারে কাশ্মীর-বেলুচিস্তানের মত বাংলাদেশকে চিরস্থায়ীভাবে অস্থিতিশীল করে তোলার মধ্য দিয়ে আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার নতুন সুযোগ। নিষিদ্ধ ও পলাতক আওয়ামী লীগ গত দেড় দশকে দেশের জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুঠ করে যে অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে তা ব্যয় করবে, এটাই স্বাভাবিক। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এক শ্রেণীর অতি উৎসাহী নেতাকর্মী প্রতিপক্ষের প্রতি অসহিষ্ণু ও সহিংস হয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে মূলত জুলাই ব্যর্থ করে দেয়ার আওয়ামী-ভারতীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের পক্ষেই কাজ করছে। জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিন ৫ আগস্টে দিল্লিতে শেখ হাসিনাকে গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দিয়ে ভারত সরকার তাদের অবস্থান আবারো পরিষ্কার করেছে। কিন্তু জুলাইয়ের পক্ষে বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল, সরকার এবং জনগণের অভূতপূর্ব ঐক্য ও ভারতীয়দের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে অভিন্ন তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখে ভারতীয়রা ভোল পাল্টে শেখ হাসিনার বক্তব্যের সাথে দ্বিমত পোষণের কথা বললেও বাংলাদেশে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ও রায়ে শাস্তিপ্রাপ্ত ভারতে পালিয়ে যাওয়া একজন খুনিকেও বাংলাদেশে প্রত্যাপর্ণ করেনি। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রায় দেড় বছর পর শরিফ ওসমান হাদী হত্যাকারীদের নিরাপদ আশ্রয় দিয়ে তারা প্রমাণ করেছে, জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা তাদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক মতভেদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবিলম্বে দূর করতে হবে। ১৯৪৬ সালের আগস্টে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ থেকে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে পুলিশের গুলিতে ম্যাস কিলিংয়ের আসল কুশীলব ও লক্ষ্য অভিন্ন। বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে। এ জন্য জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কোনো বিকল্প নেই।
[email protected]