Author,
তানহা তাসনিম
Role,
বিবিসি নিউজ বাংলা
৪ ঘন্টা আগে
পড়ার সময়: 6 মিনিট
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ৩০০ আসনে। অর্থাৎ পুরো বাংলাদেশকে ৩০০ ভাগে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটা জায়গা থেকে জনসাধারণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে সংসদে পাঠান তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য।
কোনো রাজনৈতিক দল যদি এককভাবে এই ৩০০ আসনের মধ্যে ২০০ বা তার বেশি, মানে তিন ভাগের দুই ভাগ আসনে পায় তখন তাকে বলা হয় দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী – যেমনটা এবার বিএনপি এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে হয়েছিল আওয়ামী লীগ।
দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার একটি কারণ হলো, এতগুলো আসনে নিজেদের প্রতিনিধি থাকার ফলে সংসদে যেকোনো আইন প্রণয়ন সহজ হয়, এমনকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে পরিচিত সংবিধান পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়।
কারণ সংবিধানে কোনো পরিবর্তন আনতে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন অর্থাৎ অন্তত ২০০ সদস্যের সমর্থন থাকতে হয়।
অনেকের মতে, অতীতে দেখা গেছে এমন জয় কখনও কখনও 'ফ্যাসিস্ট' শাসক তৈরি করার ক্ষেত্রেও ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ঘটনার সংখ্যা কম না, যেখানে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে রাজনৈতিক দল নিজেদের স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন করে বদলে দিয়েছে ইতিহাসের পথরেখা।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৩০টি আসনে এককভাবে জয় পায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ
বাংলাদেশে একাধিক জাতীয় নির্বাচনে একটি রাজনৈতিক দল বা জোট দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় পাওয়ার উদাহরণ রয়েছে।
সবশেষ ২০২৪ সালে বিএনপিবিহীন বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৭টি আসন পেয়েছিল।
এর আগে ২০১৮ সালের আরেক বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৫৭ আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ওই নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো অংশ নিলেও আগের রাতে বেশিরভাগ আসনে ভোট বাক্স ভরে রাখায় ওই নির্বাচন 'রাতের ভোট' হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল।
তবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনগুলোর মধ্যে সবশেষ উদাহরণ ছিল ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচন।
সেই নির্বাচনে ২৩০টি আসনে এককভাবে জয় পায় আওয়ামী লীগ, জোট শরিকসহ যে সংখ্যা দাঁড়ায় ২৬২টিতে।
নির্বাচনের পর আদালতের আদেশের পথ ধরে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিলোপ ঘটায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এছাড়া সংবিধানে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়।
যদিও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনরুজ্জীবিত করে। এর ফলে ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতায় থাকাকালীন ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় তিন মেয়াদে বিরোধিতাহীন সংসদে সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন বেশ কিছু বিতর্কিত আইন পাস করে আওয়ামী লীগ সরকার। সেসব আইন পাস করাতে আওয়ামী লীগকে সংসদে বড় কোনো বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি।
সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংসদে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সংবিধান পরিবর্তনের ঘটনা আরো আছে।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৯৩টি আসনে জয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল - বিএনপি। জামায়াতে ইসলামীসহ চার দলীয় জোট মিলে ২১৬টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করে তারা, যে সরকার চার দলীয় জোট সরকার হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিল।
পাঁচ বছর পর ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় এলে নিজেদের পছন্দের প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার জন্য অবসরের বয়স সীমা বাড়িয়ে পরিবর্তন আনা হয় সংবিধানে, যা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল সে সময়কার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
২০০১ সালের নির্বাচনে ১৯৩টি আসনে জয়ী হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল - বিএনপি
অতীতে একসময় বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকায় তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান না করার দাবি আদায়ে আওয়ামী লীগের অনড় অবস্থানের কারণে পরিস্থিতির অবনতি হলে দৃশ্যপটে হাজির হয় সেনা সমর্থিত সরকার। সেখান থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
তবে এই ধারাবাহিকতাও আবার একদিনের না। ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আওয়ামী লীগ সংবিধান পরিবর্তন করে বাতিল করেছিল, সেই ব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের দাবি ও আন্দোলনের মুখে, ১৯৯৬ সালে।
১৯৯১ সালে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলেও ক্ষমতা ছাড়ার সময় সেই ব্যবস্থা প্রয়োগে অসম্মতি জানায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। কারণ তখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায় সরকার ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। বিশেষ করে সেই দাবি আরো জোরালো হয় ১৯৯৫ সালে মাগুরা উপ নির্বাচনের পরে, যে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ছিল।
দলীয় সরকারের অধীনেই আয়োজিত ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। নির্বাচনে ২৭৮টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
তীব্র আন্দোলনের মুখে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাশ করে তৎকালীন বিএনপি সরকার। চার মাসেরও কম সময় পর আয়োজিত হয় সপ্তম সংসদ নির্বাচন।
এতো গেলো সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়কে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফিরিস্তি। এর বাইরেও সংবিধান পরিবর্তন করে শাসন কাঠামো পরিবর্তন এবং অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষ্যে, সংবিধানের 'ইসলামীকরণ' হয়েছিল একই প্রক্রিয়ায়।

ছবির ক্যাপশান,
সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে শাসন কাঠামোই বদলে দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন আয়োজন হয়েছিল ১৯৭৩ সালে। সেই নির্বাচনে কারচুপির নানা অভিযোগ ওঠে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। ওই নির্বাচনে ২৯৩টি আসনে জয়ী হয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ।
কিন্তু এর দুই বছরেরও কম সময় পর ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধান পরিবর্তন করে প্রথমে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থায় ফিরে যায় দেশ।
এর পরের মাসে আওয়ামী লীগসহ সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত ঘোষণা করে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা চালু করা হয়, যার নাম দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল।
মোটাদাগে বদলে যায় দেশের পুরো শাসন কাঠামোই।
পরবর্তী সময়ে সামরিক অভ্যুত্থানে স্বপরিবারে শেখ মুজিবের মৃত্যু, দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ক্ষমতার পালাবদলের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেন সেনাশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। দেশে জারি হয় মার্শাল ল।
মার্শাল ল ব্যবহার করে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ দিয়ে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়।
মোশতাক সরকারের সময়েই আইন করে শেখ মুজিবের হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেয়া হয়।
বিচারপতি সায়েম সরকারের সময় এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বেশ কয়েক দফায় মার্শাল ল অধ্যাদেশ জারি করে সংবিধানে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়। এসব অধ্যাদেশের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মূলনীতিতে পরিবর্তন করা হয়।
সংবিধানের শুরুতে যুক্ত করা হয় 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম'। "ধর্মনিরপেক্ষতা" বাদ দিয়ে সংস্থাপন করা হয় "মহান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস"। বাঙালি জাতীয়তাবাদের বদলে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করা হয়।
একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা বাতিল করে পুনরায় বহুদলীয় রাজনীতি চালু হয়। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলেও সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, ফলে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলো পুনরায় প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করে।
যুদ্ধপরাধে অভিযুক্তদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়।
১৯৭৯ সালে আয়োজিত হয় দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন, যেখানে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়।
বিএনপির সরকার পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এর আগের তিনটি সরকারের সময় মার্শাল ল আইনে জারি যাবতীয় অধ্যাদেশ ও আদেশকে বৈধতা দিয়ে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে।
পরবর্তীতে অবশ্য এই সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল বলে ঘোষণা করেছিল হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর আবারও টালমাটাল পরিস্থিতিতে পড়ে বাংলাদেশের রাজনীতি। ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ।
চার বছর পর ১৯৮৬ সালে তৃতীয় আর তার ১৭ মাস পর ১৯৮৮ সালে আয়োজিত হয় চতুর্থ সংসদ নির্বাচন। ২৫১টি আসন নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় পার্টি।
এরশাদের শাসনামলে প্রথমে সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ পর্যন্ত সামরিক সরকারের আমলে নেওয়া আদেশ ও কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়া হয়।
অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে স্বীকৃতি দেয়া হয় রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে।
সেই সংশোধনীতে হাই কোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ, বেঙ্গলির পরিবর্তনে বাংলা ও ঢাক্কার পরিবর্তে ঢাকার মতো বানানেরও কিছু পরিবর্তন আনা হয়। যদিও হাইকোর্টের বিকেন্দ্রীকরণ পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ে বাতিল হয়ে গিয়েছিল।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
এবার দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি
বাংলাদেশে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেলে রাজনৈতিক দল 'ইচ্ছেমতো' সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা পায়। আর সেখান থেকে দলগুলোর মধ্যে 'কর্তৃত্ববাদী' হয়ে ওঠার প্রবণতা তৈরি হয় বলে মন্তব্য করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
এবিষয়ে ১৯৭৩, ২০০১ আর ২০০৮ সালের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, "যার ফলে জাতীয় সংসদ আর সক্রিয় বা প্রাণবন্ত থাকে না। একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হয়"।
ফলে অতীত ইতিহাস থেকে এবারের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হওয়া বিএনপি যদি শিক্ষা নেয় এবং "দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখার অতীতের যে অভ্যাস সেখান থেকে তারা যদি সরে আসেন তাহলে আমরা নতুন কিছু দেখবো" বলে মনে করেন মি. আহমদ।