জলাবদ্ধতার ‘অভিশাপমুক্ত’ হচ্ছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বন্দরনগর ও বাণিজ্যিক রাজধানী। যে নগরীতে সাগর, নদী ও পাহাড়ের অপূর্ব এক মিলন ঘটেছে। শহরের একদিকে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশি, অন্যদিকে কর্ণফুলী নদীর প্রবাহ আর পাহাড়ের সবুজে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে এই নগরীকে। সৃষ্টিকর্তার নিজ হাতে সাজানো এই নগরীতে এক অভিশাপের নাম জলাবদ্ধতা।

চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নামের অভিশাপ একদিনে সৃষ্টি হয়নি। মূলত নব্বইয়ের দশক থেকে অপরিকল্পিত নগরায়ন, পাহাড় কাটা, প্রাকৃতিক জলাধার ও বহু খাল ভরাটের ফলে এই সমস্যার সূত্রপাত ঘটে। তবে ২০০৯ সালের দিকে অতি জোয়ার ও বর্ষার প্রভাবে শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ও দৃশ্যমান জলাবদ্ধতা প্রকাশ পেতে শুরু করে।

নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন করতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) একটি প্রকল্প হাতে নেয়। ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কিমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ বছরের ৯ এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষর করে সিডিএ। এরপর ২৮ এপ্রিল প্রকল্পের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

শুরুর দিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনায় বাধা ও আইনি জটিলতাসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়। সব জটিলতা কাটিয়ে ধীরে ধীরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। বর্তমানে প্রকল্পের অগ্রগতি ৯৩ শতাংশ। আশা করা হচ্ছে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের পূর্ত কাজ শেষ করা হবে।

এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ছোটবড় সাড়ে পাঁচ হাজার স্থাপনা উচ্ছেদ, ২ হাজার ৫০০ কাঠা ভূমি অধিগ্রহণ, ১৬৪ দশমিক ৩ কিলোমিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ, ৩৫টি ব্রিজ, ৮০টি কালভাট, ছয়টি রেগুলেটর, ২১টি সিলট ট্রেপ এবং ২১ দশমিক ২ কিলোমিটার নতুন ড্রেন নির্মাণ করা হয়। এছাড়াও, ৪৪ দশমকি ১৪ কিলোমিটার ড্রেনের কাজ সম্প্রসারণ, ৫৮ দশমিক ৩৮ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, ১৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার নতুন ফুটপাত এবং ৩৫৩টি ক্রস ড্রেন নির্মাণ করা হয়।

ইতোমধ্যে প্রকল্পের সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে নগরবাসী। ২০২৩ সালে যেখানে নগরীতে ১২১টি জলাবদ্ধতার স্থান চিহ্নিত করা ছিল। প্রকল্পের কাজ এগিয়ে যাওয়ার ফলে ২০২৫ সালে তা কমে ১৭টিতে নেমে আসে। বর্তমানে মাত্র চার থেকে পাঁচটি স্থানে সাময়িক পানি জমার ঘটনা ঘটছে। সবার আন্তরিক প্রচেষ্টার ফলে তা সম্ভব হয়েছে।

চলতি বছরের ৬ জুলাই থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত ৭ দিনে চট্টগ্রামে ১ হাজার ৫৫৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। যেখানে সারা বাংলাদেশে ২ হাজার ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ৬ জুলাই ১ দিনের রেকর্ড বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৪১২ দশমিক ৮ মিলিমিটার। যা গত ৪৩ বছরের তুলনায় বেশি। এমন রেকর্ড বৃষ্টিপাত হওয়ার পরেও চট্টগ্রাম শহরে উল্লেখযোগ্য কোথাও জলাবদ্ধতা হয়নি।

তবে ভিন্নকারণে নগরীর কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এলাকাগুলো হলো- আগ্রাবাদ কমার্শিয়াল এলাকা, সিএন্ডবি ও অক্সিজেন-কুয়াইশ এলাকা। এসব এলাকার জলাবদ্ধতা স্থায়ীভাবে সমাধানের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের কাছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে সুপারিশও করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা অনুযায়ী রাস্তা উঁচু না করায় আগ্রাবাদ কমার্শিয়াল ও ব্যাংকিং এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। এ দুই এলাকায় প্রায় একদিন দুই থেকে আড়াই ফুট পর্যন্ত পানি জমে ছিল। এলাকার পানি বিলে যেতে না পারা, ক্রস কালভার্ট দখল করে স্থাপনা নির্মাণ এবং ড্রেন ও নালা দখল করে ঘরবাড়ি-দোকান নির্মাণের কারণে সিএন্ডবি ও আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট করে আবাসিক প্লট নির্মাণ করায় মূলত অক্সিজেন-কুয়াইশ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ১৬টি কুইক রিয়েকশন (কিউআর) টিম গঠন করেছে। প্রতিটি টিমে একজন প্রকৌশলী, সেনাসদস্য, সার্ভেয়ার, ফোরম্যান ও শ্রমিক রয়েছে। তারা দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে। নগরীর যে কোন জায়গায় পানিপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা দেখা গেলে তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। এছাড়াও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম বন্দর, চট্টগ্রাম ওয়াসা, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, কর্ণফুলী গ্যাসসহ প্রত্যেকটি সেবা সংস্থা আমাদের যথেষ্ট আন্তরিক সহকারে আমাদের সাহায্য করেছে। নগরীকে জলাবদ্ধতা মুক্ত করতে সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড নগরীর ৩৬টি খাল নিয়ে কাজ করছে। চট্টগ্রাম ওয়াসার মাস্টারপ্ল্যানে ৫৭টি এবং চট্টগ্রাম শহরে মোট ১৩০টির খাল রয়েছে। সে হিসেবে প্রকল্পের বাইরে আরো ৯৪টি খাল রয়েছে। এসব খাল সংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা না হলে চট্টগ্রাম নগরী পুরোপুরি জলাবদ্ধতা মুক্ত করা সম্ভব নয়।

জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে খাল পুনর্খনন, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক আধুনিকীকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতেও চট্টগ্রাম নগরী একইধরনের সমস্যার মুখোমুখি হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কারিগরি সুপারিশ বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার টেকসই সমাধানের পথ অনেকটাই সুগম হবে।

লেখক:লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী, ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ প্রকল্পের পরিচালক।

পূর্বকোণ/নুসরাত



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews