সরকার বদল হলেও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও হিংস্রতায় পরিবর্তন দেখা যায় না। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ছত্রছায়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে গ্যাংয়ের সদস্যরা। সাধারণ পথচারী থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য-কেউই রেহাই পান না তাদের হাত থেকে। আইনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছোট-বড় বেশির ভাগ অপকর্মের সঙ্গে কিশোর অপরাধীরা জড়িত। গত কয়েক বছরে রাজধানীসহ সারা দেশে গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে কয়েক হাজার মামলা হলেও বিচার ও শাস্তির নজির খুবই কম। প্রভাবশালীদের তদবিরের কারণে অধিকাংশ আসামি দ্রুতই জামিনে বেরিয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মূলত মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির না থাকায় নানা উদ্যোগ ও অভিযানের পরও গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, রাজধানীসহ সারা দেশে আড়াইশর বেশি কিশোর গ্যাং গ্রুপে অর্ধলাখের বেশি সদস্য রয়েছে। তাদের নেতৃত্বে থাকা গডফাদারদের সংখ্যাও অর্ধশতাধিক। ক্ষমতার পালাবদল হলেও এসব গডফাদাররা খোলস বদলে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে মিশে যায়। ছিনতাই, ডাকাতি, খুন, মাদকবাণিজ্য, জমিদখল ও ইভটিজিংসহ সব ধরনের অপরাধ করে যাচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। বিভিন্ন সময়ে গ্যাংয়ের সাধারণ সদস্যরা গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে গডফাদাররা। অতীতে গডফাদার হিসাবে ১৬ কাউন্সিলরের নাম এলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরাধীদের পূর্ববর্তী রেকর্ড বিবেচনায় নিয়ে জামিন দেওয়াসহ বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও কঠোর হলে গ্যাংভিত্তিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি কিশোরদের সঠিকভাবে গাইড করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, সমাজ ও অপরাধ গবেষক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের অনেকেই যুক্ত ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেসব গডফাদার বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। গ্যাংয়ের মদদদাতা ও নেপথ্য শক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হলে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুর বুদ্ধিজীবী রোড বেড়িবাঁধ এলাকায় কিশোর গ্যাং আরমান-শাহরুখ গ্রুপের দ্বন্দ্বে কুপিয়ে ইমনের পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়। একই সময়ে রাজধানীর আদাবরে ফিল্মিস্টাইলে এক কুরিয়ারকর্মীকে কুপিয়ে সর্বস্ব লুটে নেয় একটি কিশোর গ্যাং। এর আগে ৩ এপ্রিল ঢাকার বাইরে কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়ে স্ত্রীকে ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলা ও ছুরিকাঘাতের শিকার হন এক পুলিশ দম্পতি। ৪ এপ্রিল নোয়াখালীর সদর উপজেলায় ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের মারধরে নিহত হন বাবা সেলিম হোসেন।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা সারা দেশের কিশোর গ্যাং সদস্যদের তালিকা করে ২০২৪ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করে। সেই প্রতিবেদনে সারা দেশে ২৩৭-এর মতো কিশোর গ্যাংয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতেই আছে ১৮৪টির বেশি। আইন ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এতদিনে গ্যাংয়ের সংখ্যা আড়াইশ ছাড়িয়েছে, যেখানে সদস্য সংখ্যা অর্ধলাখের বেশি হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া প্রতিবেদনে সারা দেশে থাকা কিশোর গ্যাংয়ের ইন্ধনে প্রায় অর্ধশতাধিক গডফাদার থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন সময়ে গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে গডফাদাররা। ঢাকা মহানগরীতে গডফাদার হিসাবে ২১ কাউন্সিলরের নাম উঠে আসে, যদিও আওয়ামী লীগ আমলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি ঢাকায়, এরপর চট্টগ্রামে। ঢাকা মহানগরীতে ১২৭টি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ৩৮২ জন। চট্টগ্রাম মহানগরে ৫৭টি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ৩১৬ জন। খুলনা মহানগরে ৫টি গ্রুপে সদস্য রয়েছে ৩৫ জন। গাজীপুর মহানগরে ৫টি গ্রুপে সদস্য সংখ্যা ৬৯ জন। বরিশাল মহানগরীতে গ্রুপের সংখ্যা উল্লেখ না থাকলেও সদস্য সংখ্যা ২০ জন বলা হয়।
র্যাব জানায়, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের ১ হাজার ৯৭৭ জন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে তারা। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমিপ) তথ্যে বলা হয়েছে, রাজধানীতে ১১৮টি কিশোর গ্যাং দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরেই সক্রিয় ১৬টি। ডিএমপির মিরপুর বিভাগে ৩২টি, তেজগাঁও বিভাগে ২৬টি এবং রমনা বিভাগে ৬টি গ্যাং সক্রিয়। থানা হিসাবে মোহাম্মদপুরে ১৬টি, পল্লবীতে ১৪টি, দারুস সালাম ও বনানীতে ৬টি করে গ্যাং রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্যে আরও দেখা গেছে, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য বেশি মোহাম্মদপুর, বসিলা ও আদাবরে। এই তিন এলাকা থেকে গত দেড় বছরে অন্তত ৪ হাজার কিশোর অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু গ্রেফতারের কয়েক মাস পরই জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। মোহাম্মদপুর এলাকায় সক্রিয় গ্যাংয়ের মধ্যে এলেক্স ইমন ও আরমান-শাহরুখ ছাড়াও পাটালি, লেভেল হাই, কবজিকাটা আনোয়ার, আর্মি আসলাম-নবী, ডাইলা, আকবর, গাঙচিল, টক্কর লওসহ মোট ১৬টি গ্রুপের তৎপরতা বেশি।
জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) এসএন নজরুল ইসলাম বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা গ্রেফতারের পর দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আসায় তাদের প্রতিরোধ করা কঠিন হচ্ছে। এক্ষেত্রে জামিন প্রক্রিয়া আরও কঠিন করাসহ অপরাধীদের পূর্ববর্তী রেকর্ড বিবেচনায় নিতে হবে। পাশাপাশি কিশোরদের সঠিকভাবে গাইড করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিকভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।