প্রতিদিনই খবর আসছে হাম বা হামের লক্ষণ নিয়ে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে, দেশ ব্যাপী হামের জরুরী টিকা দেয়ার পরও মৃত্যু থামছে না কেন? বাংলাদেশ বর্তমানে সাম্প্রতিক দশকগুলোর অন্যতম ভয়াবহ হাম (গবধংষবং) প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে ৭৫ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন সংক্রমণ রেকর্ড হয়েছে। আর ৬৬০-এর বেশি বাচ্চা হাম ও হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গিয়েছে বলে রিপোর্ট হয়েছে। অধিকাংশ আক্রান্ত ও মৃত শিশু পাঁচ বছরের কম বয়সী।
সরকার ইতোমধ্যে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে, বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড খুলেছে, নজরদারি বাড়িয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় চিকিৎসা ও প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবুও সংক্রমণ ও মৃত্যু পুরোপুরি থামছে না।
প্রশ্ন হলোÑকেন? হাম আসলে কতটা ভয়ংকর?
অনেকেই প্রথমে হামকে সাধারণ জ্বর-সর্দি ও গায়ে ফুসকুড়ির রোগ মনে করেন। বাস্তবে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগগুলোর একটি। একজন হাম রোগী গড়ে ১২-১৮ জন সুস্থ ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। এজন্য একটি সমাজে অন্তত ৯৫% মানুষের পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভাইরাসের সংক্রমণ চেইন ভেঙে যায়।
হামের জটিলতার মধ্যে রয়েছে :
নিউমোনিয়া
ডায়রিয়া
অপুষ্টি বা স্বল্প বৃদ্ধি
অন্ধত্ব
মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনকেফালাইটিস)
দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া
মৃত্যু
বিশেষত অপুষ্ট শিশু, নবজাতক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন শিশুদের জন্য হাম অত্যন্ত বিপজ্জনক।
কেন এত মৃত্যু হচ্ছে?
১. বহু শিশুর টিকা না পাওয়া-
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হলো “ইমিউনিটি গ্যাপ” বা রোগ প্রতিরোধে বড় শূন্যতা তৈরি হওয়া। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বিঘœ, ভ্যাকসিন ঘাটতি এবং কিছু এলাকায় শিশুদের টিকা না পাওয়ার কারণে বিপুল সংখ্যক শিশু হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষাহীন থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, আক্রান্তদের বড় অংশই একেবারে টিকা না পাওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকা পাওয়া শিশু। একটি হাম প্রাদুর্ভাব হঠাৎ তৈরি হয় না। কয়েক বছর ধরে জমে থাকা অরক্ষিত শিশুদের মধ্যেই এ ধরনের বিস্ফোরণ ঘটে।
২. হাম শনাক্ত করতে দেরি হওয়া-
বাংলাদেশের বহু পরিবার এখনও হামকে সাধারণ জ্বর বা ভাইরাল ইনফেকশন ভেবে বাড়িতে চিকিৎসা করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়Ñ
প্রথমে জ্বর
পরে কাশি
সর্দি
চোখ লাল হওয়া
এসব উপসর্গকে সাধারণ ঠান্ডাজনিত রোগ মনে করা হয়। ফুসকুড়ি ওঠার পর রোগ ধরা পড়ে। ফলে চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয় এবং রোগী ইতোমধ্যে অনেককে সংক্রমিত করে ফেলে।
৩. অত্যধিক জনসংখ্যার ঘনত্ব-
ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কামরাঙ্গীরচর, মিরপুরসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে হাম দ্রুত ছড়িয়েছে। একই বাড়িতে অনেক মানুষ বসবাস, গণপরিবহন ব্যবহার এবং স্কুল-মাদ্রাসায় ঘন সংস্পর্শ ভাইরাস ছড়াতে সহায়তা করে।
৪. নবজাতক ও ছোট শিশুদের ঝুঁকি-
বর্তমান প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তদের একটি বড় অংশ ৯ মাসের কম বয়সী শিশু, যারা এখনও নিয়মিত হাম টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি। এদের সুরক্ষা নির্ভর করে আশেপাশের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। যখন সমাজে সংক্রমণ বেড়ে যায়, তখন এই শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।
৫. অপুষ্টি ও ভিটামিন-এ ঘাটতি-
অপুষ্ট শিশুদের মধ্যে হাম মারাত্মক আকার ধারণ করে। বাংলাদেশের অনেক দরিদ্র এলাকায় শিশুদের অপুষ্টি এখনও একটি বাস্তব সমস্যা। ভিটামিন-এ ঘাটতি থাকলে হামের জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়। এজন্য বিশেষজ্ঞরা ভিটামিন-এ সরবরাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
৬. হাসপাতালের ওপর অতিরিক্ত চাপ-
যখন সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশী জটিল রোগী একসাথে হাসপাতালে আসে, তখন চিকিৎসা ব্যবস্থা চাপে পড়ে।
বেড সংকট
চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি
আইসোলেশন সুবিধার সীমাবদ্ধতা
অক্সিজেন ও অন্যান্য সরঞ্জামের চাপ
এসব কারণে গুরুতর রোগীদের যথাসময়ে সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
টিকাদান শুরু হওয়ার পরও কেন সংক্রমণ চলছে?
এটি একটি স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা। কারণÑ
প্রথমত- টিকা নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। সাধারণত কয়েক সপ্তাহ সময় লাগে।
দ্বিতীয়ত- এই টিকাদান শুরু হওয়ার আগেই লক্ষ লক্ষ শিশু ভাইরাসের সংস্পর্শে চলে এসেছে।
তৃতীয়ত- যেসব শিশু ইতোমধ্যে সংক্রমিত বা আক্রান্ত হয়েছে, তারা আরও অনেককে সংক্রমিত করছে।
চতুর্থত- হাম অত্যন্ত সংক্রামক। তাই সামান্য কয়েক শতাংশ অরক্ষিত মানুষ এখনও আছে যাদের কারনে ভাইরাস ছড়িয়ে যাওয়া থামছে না।
তবে আশার কথা হলো, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মতে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর সংক্রমণের হার কমার ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
সরকারের এখন কী করা উচিত বলে বিশেষজ্ঞরা ?
১. মিসড চাইল্ড” খুঁজে বের করা- যে শিশুরা কখনও টিকা পায়নি বা অসম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে তাদের তালিকা তৈরি করতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও গ্রামে বিশেষ অভিযান প্রয়োজন।
২. বাড়ি বাড়ি টিকাদান - অনেক পরিবার টিকাকেন্দ্রে আসে না।
স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, বিশেষ করেÑ
বস্তি
চরাঞ্চল
দুর্গম গ্রাম
ভাসমান জনগোষ্ঠী
৩. ভিটামিন-এ কর্মসূচি জোরদার করা-
হাম আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত ভিটামিন-এ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এটি মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
৪. দ্রুত শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিং - প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে রিয়েল-টাইম রিপোর্টিং ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। যেখানে সংক্রমণ বেশি, সেখানে জরুরি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি -
শিশু ওয়ার্ড বৃদ্ধি
অতিরিক্ত অক্সিজেন ব্যবস্থা
প্রশিক্ষিত জনবল
অস্থায়ী আইসোলেশন ইউনিট গড়ে তুলতে হবে।
৬. ভুল তথ্য মোকাবিলা- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা সম্পর্কে গুজব বন্ধে।
ধর্মীয় নেতা
শিক্ষক
চিকিৎসক
জনপ্রতিনিধি সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
৭. নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পুনর্গঠন- শুধু জরুরি ক্যাম্পেইন নয়, দীর্ঘমেয়াদে নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর করতে হবে। কারণ প্রাদুর্ভাব শেষ হলেও নতুন শিশু জন্ম নিতে থাকবে।
জনগণের কী করা উচিত?
১. টিকা সম্পূর্ণ করতে হবে
হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো টিকা। কোনো শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে কিনা তা যাচাই করতে হবে।
২. জ্বর-ফুসকুড়ি হলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে, শিশুরÑ জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া, শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৩. আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখতে হবে- হাম রোগীকে অন্যান্য শিশু থেকে দূরে রাখতে হবে। বিশেষ করেÑ
নবজাতক
অপুষ্ট শিশু
গর্ভবতী নারী এর সংস্পর্শ এড়াতে হবে।
৪. পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে-
মায়ের দুধ
ডিম
মাছ
দুধ
শাকসবজি
ফলমূল খাওয়ানো জরুরি।
৫. গুজবে কান দেওয়া যাবে না- হাম টিকা নিরাপদ এবং বহু দশক ধরে ব্যবহৃত একটি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশুকে এই টিকা দেওয়া হয়েছে।
উপসংহার : বাংলাদেশে বর্তমান হাম প্রাদুর্ভাব কেবল একটি সংক্রামক রোগের বিস্তার নয়; এটি গত কয়েক বছরের টিকাদান ঘাটতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, অপুষ্টি, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং দেরিতে শনাক্তকরণের সম্মিলিত ফল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত ভ্যাকসিন ব্যর্থতার নয়, বরং পর্যাপ্ত সংখ্যক শিশুর টিকা না পাওয়ার সংকট।
দেশব্যাপী সরকারের জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ শিশুকে সুরক্ষার আওতায় এনেছে এবং সংক্রমণের গতি কমার কিছু ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে। তবে এই সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী, গণমাধ্যম, ধর্মীয় নেতা এবং সাধারণ জনগণÑসকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
হাম প্রতিরোধের মূলমন্ত্র এখনও একই: প্রত্যেক শিশুর সময়মতো পূর্ণ টিকাদান নিশ্চিত করা। এই একটি পদক্ষেপই শত শত শিশুর জীবন বাঁচাতে পারে এবং ভবিষ্যতের মহামারি প্রতিরোধ করতে পারে। তাই সরকারের উদ্যোগ ও সদিচ্ছার প্রতি আস্থা রেখে সকলকেই ধৈর্যের সাথে টিকা নেয়া ও দ্রুত চিকিৎসা নেয়া নিশ্চিত করতে হবে।
আহনাফ হক সাইহান
ঢাকা মেডিকেল কলেজ,
ইমেইল: [email protected]