যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে সৌদি আরবের সঙ্গে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় ভবিষ্যতে সৌদি আরব নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ (এনরিচমেন্ট) সক্ষমতা অর্জনের পথ খুলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে চুক্তিটি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইসরাইল।

বুধবার (২২ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইট এবং সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান ‘১২৩ চুক্তি’ নামে পরিচিত পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এবং একটি দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা (সেইফগার্ডস) চুক্তিতে সই করেন।

মার্কিন প্রশাসন চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ না করলেও বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, যৌথ মার্কিন-সৌদি সমীক্ষা শেষে সৌদি আরবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের পথ তৈরি করবে এই কাঠামো। চুক্তিটি এখন মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

এক বিবৃতিতে ক্রিস রাইট বলেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করবে এবং দুই দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে। একই সঙ্গে এতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের পারমাণবিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র বিস্তার রোধের মানদণ্ড বজায় রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্ভাব্য সমালোচনার জবাবে বলেন, এমন কোনো চুক্তি করা হবে না যা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি করে। তার ভাষায়, ‘বিশ্বের কোনো দেশের সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্র এমন চুক্তি করবে না, যা পারমাণবিক বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ায়।’

তবে চুক্তিতে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) অতিরিক্ত প্রোটোকল অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এই প্রোটোকল থাকলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বিস্তৃত পরিদর্শন ও নজরদারির সুযোগ থাকত। ফলে বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চুক্তির মেয়াদ হবে ৩০ বছর এবং সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানি অংশ নেবে।

অস্ত্র তৈরির আশঙ্কা

পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরব যদি নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে ভবিষ্যতে তা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান অতীতে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও একই পথে হাঁটবে।

লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পারমাণবিক বিশেষজ্ঞ আলেকজান্ডার বোলফ্রাস বলেন, এটি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের নীতিতে একটি ‘বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন’। তার মতে, সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক নজরদারি নিশ্চিত না করেই সংবেদনশীল প্রযুক্তি হস্তান্তরের পথ তৈরি করা হচ্ছে।

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকের শর্ত শিথিল

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো শর্ত এতে রাখা হয়নি।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ এবং পরে জো বাইডেন প্রশাসন সৌদি আরবকে পারমাণবিক প্রযুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছিল। তবে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন সেই শর্ত থেকে সরে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

মামদানি চাইলেও কেন নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করতে পারবেন না? আইন কী বলছে

মামদানি চাইলেও কেন নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করতে পারবেন না? আইন কী বলছে

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক ড্যান শাপিরো বলেন, ‘এই চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক হাতিয়ার বিনা শর্তেই সৌদি আরবকে দিয়ে দিয়েছে।’

তার মতে, এতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কৌশলগত লক্ষ্য বাস্তবায়ন আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

কংগ্রেসে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের কয়েকজন আইনপ্রণেতা চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে সৌদি আরব এই সক্ষমতাকে সামরিক কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান ব্র্যাড শারম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচির বিরোধিতা করছে, অন্যদিকে সৌদি আরবকে একই ধরনের সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ দিচ্ছে। তার ভাষায়, ‘পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, এই চুক্তি থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলো বিপুল অর্থ আয় করবে।’

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস এই চুক্তির অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হতে পারে। সৌদি আরবের পরিকল্পিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।

চুক্তিটি এমন সময়ে হলো, যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল দাবি করছে, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন থেকে বিরত রাখাই তাদের লক্ষ্য। যদিও তেহরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews