ঢাকায় রোমানিয়ার স্থায়ী দূতাবাস না থাকায় ভিসাপ্রত্যাশী বাংলাদেশী নাগরিকদের যেতে হচ্ছে সুদুর ভারতে। সেখানে যাওয়ার পরও ফেইক ভিসাসহ নানা ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। এতে অনেকে প্রতারিত ও নিঃস্ব হচ্ছেন।

বিগত সময়ে ভিসা প্রত্যাশীদের হয়রানি কমাতে রোমানিয়া সরকার ঢাকার কাকরাইলে অস্থায়ী কন্স্যুলেট অফিস স্থাপন করে ভিসা দেয়ার কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। কিন্তু ওই সময়ের বিএমইটির দুর্নীতিবাজ ডিজি শহীদুল হক ও তার প্রতিষ্ঠান এবং কিছু এজেন্সির সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের সদস্যদের প্রতি ভিসার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দাবির কারণে শেষমেষ রোমানিয়া সরকার ঢাকা থেকে তাদের অফিস গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। এর পর থেকেই মূলত রোমানিয়াগামীদের কপালে নতুন করে শুরু হয় দুঃখ-দুর্দশা। চার বছর ধরেই অব্যাহত রয়েছে এ অবস্থা।

ভুক্তভোগী যাত্রী এবং রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা নয়া দিগন্তের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, সরকার যদি নতুন করে আবারো রোমানিয়া সরকারকে অনুরোধ করে অস্থায়ী কন্স্যুলেট অফিসটি ঢাকায় খোলার ব্যবস্থা করতে পারেন তাহলে রোমানিয়াগামী শত শত শ্রমিককে ভিসার স্টিকার লাগানোর জন্য আর ভারতে যেতে হবে না। এতে একদিকে তাদের যেমন অর্থ সাশ্রয় হবে তেমিন কর্মীদের নানামুখী প্রতারিত হওয়ার সংখ্যাও কমে আসবে। এখন বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রয়েছে কি-না তা বিদেশগামী শ্রমিক এবং রিক্রুটিং এজেন্সীর মালিকরা জানার অপেক্ষায়। সরকার এই বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে রোমানিয়ার শ্রমবাজারে আরো বেশি বেশি লোক যাওয়ার আগ্রহ দেখাবে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশ্লেষকরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকায় রোমানিয়ার কোনো পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী দূতাবাস বা নিয়মিত ভিসা প্রদানকারী কন্স্যুলেট অফিস নেই। ২০২২ সালে সীমিত সময়ের জন্য ঢাকার কাকরাইলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর প্রধান ভবনের ষষ্ঠ তলায় অস্থায়ী অফিস খুলে রোমানিয়ার ভিসা প্রসেসিংয়ের কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো। নির্ধারিত সময়ের পর তারা কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়। বর্তমানে ঢাকা বা বাংলাদেশ থেকে সরাসরি রোমানিয়ায় নিয়মিত ভিসা প্রসেসিং বা স্টিকার লাগানোর কোনো সুযোগ নেই।

গত সপ্তাহে ব্রাক্ষণবাড়িয়া ওভারসিসের স্বত্বাধিকারী ও খাদেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এন এইচ খাদেম দুলাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যারা ইউরোপের সাথে ব্যবসা করছি তারা রোমানিয়ার ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজ ভারতে করাতে গিয়ে নানাভাবে হয়রানি হচ্ছি। কখনো কখনো প্রতারিতও হচ্ছি। রোমানিয়ার শ্রমবাজারটি সম্ভাবনাময় হলেও রোমানিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে ভিসাটি ঠিক আছে কি নাই সেটি যাচাই করার জন্য সত্যায়ন প্রয়োজন। দূতাবাসে একক চাহিদাপত্রের বিপরীতে এই ব্যবস্থা না থাকার কারণে আমাদের প্রতিনিয়ত জাল ভিসার যন্ত্রণাসহ নানা সমস্যা ফেস করতে হয়। শুধু যে আমরাই সমস্যায় পড়ছি তা কিন্তু নয়। ঢাকায় রোমানিয়ার দূতাবাস না থাকায় রোমানিয়ার কোম্পানি থেকে অনলাইনে আসা ভিসার স্টিকার নিতে আমাদের কর্মীদের যেতে হচ্ছে ভারতে। ভারতে যেতে এক দিকে যেমন ভিসা পেতে সমস্যা, তেমনি সেখানে যাওয়া, থাকা-খাওয়ার খরচ করা ছাড়াও একজন কর্মীকে কখনো কখনো জাল ভিসার খপ্পরেও পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এর আগে ঢাকায় রোমানিয়া সরকার অস্থায়ী কন্স্যুলেট অফিস খুলে ভিসা দেয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এতে কর্মীরা যেমন সুবিধা পেয়েছিল সেভাবে আমরাও ভিসা প্রসেসিংয়ের কাজগুলো সুন্দরভাবে করতে পারতাম। কী কারণে এবং কোন কোন কর্মকর্তার কারণে ঢাকার অস্থায়ী অফিসটি রাখা গেলো না সেটি খতিয়ে দেখা উচিত এবং নতুন করে আবারো যাতে ঢাকায় রোমানিয়ার কন্স্যুলেট অফিস খোলা যায় সে ব্যাপারে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আমি অনুরোধ জানাচ্ছি। এক প্রশ্নের উত্তরে খাদেম দুলাল নয়া দিগন্তকে বলেন, শুধু ভিসা লাগানোর সমস্যা হচ্ছে না, এই শ্রমবাজারটি বেকায়দায় পড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে কর্মীরা রোমানিয়ায় যাওয়ার পরপরই কোম্পানি থেকে পালিয়ে ইতালি চলে যাচ্ছে। যারা পালানোর চিন্তা নিয়ে যাচ্ছে তাদের আগে সেটি পরিহার করতে হবে। এরজন্য রোমানিয়াগামী কর্মীর পরিবারের কাছ থেকে শক্ত অঙ্গীকারনামা নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে এই শ্রমবাজারে আমাদের অনক লোক বৈধ প্রক্রিয়ায় যেতে পারবে এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, যখন রোমানিয়ার অস্থায়ী ভিসা অফিস ঢাকায় খোলা হয়েছিলো তখন বেশ কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের সম্বন্বয়ে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কর্মীর ভিসা ঠিক থাকার পরও প্রতি ভিসার বিপরীতে ওই সময়ের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকার মনোনীত ডিজি শহীদুল হক এক লাখ টাকা করে ঘুষ নিতেন, যা রোমানিয়ার ভিসা প্রদানকারী ছয় সদস্যের দলের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিল। পরে প্রতিনিধি দলটি ঢাকা ছাড়ার আগে ঘুষ দাবির বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবহিত করে গিয়েছিলেন। এরপরই তারা তাদের সরকারের নির্দেশে অফিস গুটিয়ে চলে যান। তখণ থেকেই বাংলাদেশী কর্মীদের ভারতে গিয়ে ভিসা নিতে হচ্ছে।

অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনিতেই মধ্যপ্রাচ্যসহ অনেক দেশের শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে আছে। ইউরোপের শ্রমবাজারে অসংখ্য কর্মীর যাওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু বিএমইটিতে গড়ে উঠা ভিসা প্রসেসিং সিন্ডিকেটের অপতৎরতা বন্ধ করতে না পারলে বৈধ শ্রমবাজার হুমকির মধ্যে পড়তেই থাকবে। তাদের অভিযোগ, বিএমইটিতে যারা ‘প্রাইজ পোস্টিং’ নিয়ে আসছেন, তাদের টার্গেট থাকে, যেকোনো মূল্যে তাদের লগ্নি করা ‘পুঁজি’ আগে তুলতে হবে। এই প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে শ্রমবাজারের বারোটা বেজে যাচ্ছে।

সর্বশেষ জনশক্তি কর্মসংস্থান ব্যুরোর পরিচালক (বহির্গমন) তানজিলুর রহমান একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের কাছে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, অনেক টাকা খরচ করে এসেছি, চলে যাওয়ার জন্য নয়। আগে আমার লগ্নি করা টাকা তুলতে হবে।’ তার এমন বক্তব্য যেকোনোভাবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কানে যাওয়া মাত্রই তাকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে তানজিলুর রহমান দুই মাসের ট্রেনিংয়ে রয়েছেন। তার কাজ অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে করছেন পরিচালক অর্থ ও প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শ্রমবাজারের স্বার্থে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসব অনিয়ম দুর্নীতি থেকে যেকোনো মূল্যে বেরিয়ে আসতে হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews