আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও তাকওয়া অর্জন সিয়ামের মূল লক্ষ্য। প্রতি বছর আমরা রমাদান পাই, দীর্ঘ এক মাস সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থেকে সিয়াম পালন করি। কিন্তু এর মধ্যে কতজনই বা সিয়ামের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারি! বর্তমান সময়ে সিয়াম অনেকটা প্রথাসিদ্ধ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। শুধু না খেয়ে থাকাকেই অনেকে সিয়াম মনে করি। অথচ সিয়াম কেবল না খেয়ে সারা দিন থাকার নাম নয়।
রসুল (সা.) বলেছেন, ‘কিছু সিয়াম পালনকারী আছে এমন, যাদের সিয়ামের বিনিময়ে ক্ষুধা ছাড়া আর কিছুই ভাগ্যে জোটে না। কিছু সালাত আদায়কারী আছে এমন, যাদের রাত জাগরণ ছাড়া আর কিছুই জোটে না।’ অর্থাৎ এমন রোজাদার যে রোজা রেখেও মিথ্যা বলে, গিবত করে, মানুষকে কষ্ট দেয় এবং অন্যায় ও পাপাচারে লিপ্ত থাকে, সে দিনভর উপোস করলেও বস্তুত তার সিয়াম খুব বেশি উপকার বয়ে আনে না। আরেক হাদিসে রসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি রোজা রেখে মিথ্যা বলা ও সে অনুযায়ী আমল বর্জন করতে পারেনি, তার এই পানাহার পরিত্যাগ করায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই (বুখারি)।
মহান আল্লাহ আমাদের রমাদান দান করেছেন জীবন পরিবর্তনের বিশেষ সুযোগ হিসেবে। তাই রমাদানে কেবল শারীরিক উপবাস থেকে সিয়াম পালন নয়, এর সঙ্গে আত্মিক ও নৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সব পাপপঙ্কিলতা থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা উচিত। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, তুমি যখন রোজা রাখবে, তখন তোমার কান, চোখ, মুখও যেন রোজা রাখে (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা)। অর্থাৎ শুধু মুখ দিয়ে খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকাই যথেষ্ট নয়; চোখকে হারাম থেকে, কানকে গুনাহ থেকে এবং জবানকে মিথ্যা ও কটূক্তি থেকে বিরত রাখাও সিয়ামের অপরিহার্য অংশ।
সিয়ামের মূল দর্শনের দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে এই বিষয়টা আরও স্পষ্টত উপলব্ধ হয়। সিয়াম শব্দের অর্থ বিরত থাকা। পৃথিবীতে মানুষ সাধারণত যত অপরাধ করে, তার মূলে থাকে দুটি প্রবৃত্তি ক্ষুণ্নিবৃত্তি ও যৌনবৃত্তি। এই দুই প্রবৃত্তির নিয়ন্ত্রণই সিয়ামের মূল কথা। একজন মানুষের সামনে খাবার আছে, তীব্র ক্ষুধা আছে, কেউ দেখছে না, চাইলেই সে খেতে পারে; কিন্তু সে খাচ্ছে না। এই যে নিজের ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করা, এটাই আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশিক্ষণ। এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য হলো, একজন মুমিন যখন রমাদানে দিনের বেলা আল্লাহর ভয়ে নিজের জন্য বৈধ খাবার ও কাজ বর্জন করতে শিখবে, তখন বছরের বাকি সময় সে আল্লাহর ভয়ে নিষিদ্ধ ও হারাম কাজগুলো বর্জন করার শক্তি অর্জন করতে পারবে।
নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘সিয়াম ঢালস্বরূপ (বুখারি)।’ ঢাল যেমন যোদ্ধাকে শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করে, সিয়াম তেমনি মানুষকে তার কুপ্রবৃত্তির তাড়না থেকে রক্ষা করে। সিয়াম থেকে এই আত্মনিয়ন্ত্রণ যখন অর্জিত হয়, তখন জীবনে অন্যায়ের সুযোগ সামনে এলেও আল্লাহর ভয়ে মানুষ তা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারে। সিয়াম মূলত আমাদের সেই মানসিক শক্তি তৈরি করে দেয়, যা দিয়ে আমরা প্রলোভন জয় করতে পারি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা সিয়ামের এই অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বা বার্তাটি উপলব্ধি করতে পারছি না। সিয়াম এখন কেবলই একটা সামাজিক আচার বা আনুষ্ঠানিকতায় রূপান্তরিত হয়ে গেছে। ফলে, আমরা রমাদানের কাক্সিক্ষত ফলাফল পাচ্ছি না।
সিয়ামের প্রকৃত ফায়দা অর্জন করতে হলে প্রথমে এর অন্তর্নিহিত আহ্বান উপলব্ধি করতে হবে। এরপর সামগ্রিক জীবনে তার প্রতিফল ঘটাতে হবে। হৃদয়ের ব্যাধিগুলো চিহ্নিত করতে হবে। ঘৃণা, প্রতিহিংসা, ক্ষমতার দম্ভ এবং অন্যের সম্পদ গ্রাসের যে মানসিকতা আমাদের অন্তরে বাসা বেঁধেছে, সেগুলোকে এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সমূলে উৎপাটন করতে হবে। নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। রমাদান হলো নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সুবর্ণ সুযোগ। এ সুযোগ পেয়েও যারা নিজেকে পরিশুদ্ধ ও গুনাহমুক্ত করতে পারবে না, তাদের ব্যাপারে নবীজি (সা.) কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সে ব্যক্তি ধ্বংস হোক, যার কাছে রমাদান এলো, তারপর তা শেষ হয়ে গেল, অথচ তার গুনাহ ক্ষমা করা হলো না (তিরমিজি)।’
সুতরাং সিয়াম যেন কেবল প্রথাগত না খেয়ে থাকা না হয়। বরং এটি যেন হয় এমন এক প্রশিক্ষণ, যা আমাদের সামগ্রিক জীবনে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সিয়ামের প্রকৃত হাকিকত বোঝার এবং সে অনুযায়ী আমল করে রমাদানকে সার্থক করার তাওফিক দান করুন।
জুমার মিম্বর থেকে
গ্রন্থনা : নুরুল ইসলাম তানঈম