শুনতে অনেকটা অবিশ্বাস্য মনে হলেও একথা সত্য যে, প্রাইভেট কোচিং-এর সূচনা হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ সূচিত হবার অনেক পূর্বে। এর একটি সঙ্গতকারণও রয়েছে। মানুষ স্বভাবগতভাবেই কম-বেশি জ্ঞান-পিপসু। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই মানুষ প্রথমত তার জীবন ও চারপাশের জগত সম্পর্কে জানতে চায়, বুঝতে চায়। এই জানা বোঝা সবার একরকম হয় না। তাই যারা বেশি বোঝেন বা বেশি জানেন বলে প্রতীয়মান হয়, সাধারণ মানুষ জ্ঞানলাভের জন্য স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের শরণাপন্ন হতে পারে। আর এভাবেই প্রাচীনকালে মানুষ কোন না কোনো বিদ্বানের কাছে গিয়ে নিজের জ্ঞান-পিপাসাকে মিটানোর প্রয়াস পেয়েছে। এই সংস্কৃতিকে আমরা গুরুগৃহ সংস্কৃতি বলতে পারি। আর এই গুরুগৃহ সংস্কৃতি বিবর্তিত হয়েই আজকের দিনে হয়তো গৃহশিক্ষক সংস্কৃতিতে রূপ লাভ করেছে। প্রাচীনকালের গুরুগৃহের কার্যক্রম এবং আজকের দিনের গৃহশিক্ষকদের কার্যক্রমকে আমরা একইসাথে প্রাইভেট কোচিং নাম দিতে পারি, যদিও এই দুই যুগের কোচিং-এর মধ্যে লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও পদ্ধতিতে অনেক ক্ষেত্রে অনেক অমিল পাওয়া যাবে।
আজকের দিনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা বিকশিত হয়েছে, সমৃদ্ধ হয়েছে নানাভাবে। এইসঙ্গে প্রাইভেট কোচিং-এর পরিমাণও বেড়ে চলছে। ব্যক্তি পর্যায়ে বিভিন্ন শিক্ষক কর্তৃক পরিচালিত কোচিং এবং কোচিং সেন্টার নামক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরিচালিত কোচিং ক্যান্সারের মতো অশুভ প্রভাব নিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিরাজ করছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বাভাবিক পড়ালেখা ব্যহৃত হচ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে শিক্ষা ব্যয়। সন্তানের পড়ালেখা করাতে অভিভাবকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। কোচিং করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সংবাদপত্র এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এসংক্রান্ত অনেক অশুভ ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু এতকিছুর পরেও কোচিং বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না। দায়িত্বশীল মহল একে যেন একটি প্রয়োজনীয় বিকল্প হিসেবেই গ্রহণ করছে বলে মনে হয়। কিন্তু এই বিকল্প ব্যবস্থা আমাদের মূলধারার শিক্ষাকে কলুষিত করে চলছে এবং শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পর্যাপ্ত শিক্ষা পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই জনস্বার্থেই কোচিং বাণিজ্য অবৈধ ঘোষণা করে সব ধরনের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করা প্রয়োজন।
আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে গজিয়ে ওঠা বিভিন্ন কোচিং সেন্টার এবং শিক্ষকদের বাসায় কোচিং নামক যে জ্ঞান বিতরণ চলছে তা জ্ঞান ব্যবসার-ই নামান্তর। এধরনের সেন্টারগুলো এক ধরনের বিপনী বিতান, যেখানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাস্টমার হিসেবে গ্রহণ করা হয়, কখনও কখনও তাদের নানাভাবে জিম্মি করে নিপীড়নও করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রদানের অন্তরালে বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচার, কিংবা প্রশিক্ষণের অত্যন্ত নিবিড় কেন্দ্র হিসেবেও কিছু কোচিং সেন্টার কাজ করে চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অধিকাংশ স্কুল এখন হয়ে উঠেছে কোচিং-এর ফাঁদ। শিক্ষকদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ তাদের কর্মরত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একটি বিশেষ ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তারা তাদের ব্যক্তিগত কোচিং-এ শিক্ষার্থী যোগাড় করেন। মূল ব্যবস্যা তাদের এই প্রাইভেট প্রাকটিস। কেউ কেউ হয়তো বিষয়টিকে অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করতে পারেন। চিকিৎসকগণ যেমন প্রাইভেট প্রাকটিস করেন, শিক্ষকদের তেমনটি করলে ক্ষতি কী? এক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, ডাক্তার রোগীর সম্পর্ক এবং শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক কিন্তু এক পর্যায়ের নয়। চিকিৎসককে কোনো রোগীর অনুকরণীয় আদর্শ ভাবার আবশ্যকতা নেই। কিন্তু একজন শিক্ষককে প্রকৃতভাবে তাঁর শিষ্যদের শিক্ষা দিতে হলে শিষ্যদের মনের মধ্যে ঢুকতে হয়। তাঁর কাছে আদর্শ ব্যক্তি হয়ে উঠতে হয়। নতুবা তার কোনো জ্ঞানই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের অন্তরে ঠিকমত প্রবেশ করে না। যেসকল শিক্ষক কেবল অর্থ উপার্জনের বাসনা থেকে শিক্ষার্থীদের অনেক রকম কৌশলে প্রাইভেট কোচিং-এ আসতে বাধ্য করেন, তাদেরকে শিক্ষার্থীরাও আদর্শ শিক্ষা হিসেবে সম্মান করতে পারে না। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এ ধরনের শিক্ষকের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যবিক্রেতার মতো। আর সার্বিকভাবে এ ধরনের বাস্তবতার শিকার হচ্ছে আমাদের শিক্ষক সমাজ। তবে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পেয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের ভালো শিক্ষকদের নিকট স্বেচ্ছায় কোচিং করতে যায়। এ বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ভালো কাজ করছেন বলেই মনে হয়। তবে এক্ষেত্রে তিনি তার নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অধিকারকে কতটা গুরুত্ব দিচ্ছেন, কর্মস্থলে অর্থাৎ তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তিনি কতটা ভালো দায়িত্ব পালন করছেন তাও বিবেচনায় আনা দরকার। প্রকৃতপক্ষে প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ নিজ নিজ দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করলে কোনো শিক্ষার্থীরই প্রাইভেট কোচিং-এ যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। প্রতিষ্ঠানের শ্রেণীকক্ষে সকল শিক্ষার্থীদের সমানভাবে পাঠদান সম্ভব না হলে প্রয়োজনে যেকোনো কারণে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই বিশেষ ব্যবসস্থায় এগিয়ে নেবার সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। তাদের জন্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিশেষ কোচিং চালু করা যায়। কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবকদের চাপে এরকম ব্যবস্থা চালু থাকলেও কার্যত অনেকক্ষেত্রেই তা হয়ে ওঠে লোক দেখানো ব্যাপার। অধিকাংশ শিক্ষকই সেখানে আন্তরিক থাকেন না। এমনকি শিক্ষার্থীদের এসব স্কুল কোচিং, কলেজ কোচিং-এ আসতে শিক্ষকগণ অনেক ক্ষেত্রে অনুৎসাহিত করেন বলে অভিযোগ আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা উৎসাহিতবোধ করেন তাদের ব্যক্তিগত কোচিং-এ যেতে। উদ্দেশ্য একান্তই আত্ম-স্বার্থকেন্দ্রিকÑ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়ে জ্ঞান ব্যবসা করা। শিক্ষকগণ যদি তাদের সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্তরিকভাবে পাঠদান করেন তাহলে কোনো শিক্ষার্থীরই আলাদা কোচিং করার প্রয়োজন হবার কথা নয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠাগুলোকে যথাযথভাবে কার্যকর ভূমিকায় আনতে পারলেই কোচিং বাণিজ্য এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ. ন. ম এহসানুল হক মিলন অতীতে যখন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তখন পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধসহ আরও অনেক বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি সাধন করেছিলেন। বর্তমান দায়িত্ব প্রাপ্তির পূর্বেও এদেশের বেশিরভাগ মানুষই ধরে নিয়েছিলেন যে, তিনি এই দায়িত্ব পেতে যাচ্ছেন। আর এর পিছনের বাস্তবতা হলো শিক্ষায় যে ব্যাপক দুরবস্থা এতদিনে তৈরি হয়েছে তার প্রতিকারের জন্য দরকার বেশকিছু সাহাসী উদ্যোগ। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে সাধারণ মানুষের তেমনটিই প্রত্যাশা আছে বলে মনে হয়। সম্প্রতি কোচিং সেন্টার বন্ধ করার বিষয়ে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তবে যেসকল কারণে কোচিং ব্যবসা ব্যাপকতা লাভ করেছে, সেসব বাস্তবতাকে আমলে নিয়েই এই অশুভ বাণিজ্য বন্ধ করা প্রয়োজন।
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ,
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]