ভারতের 'ধুরন্ধর' সিনেমার রণবীর সিংয়ের বাস্তবেই রয়েছে পাকিস্তান 'কানেকশন'

ছবির উৎস, Noel Parsons/ Getty

ছবির ক্যাপশান,

ভারতীয় ফিল্ম তারকা রণবীর সিং (ডানে) এবং তার ঠাকুমার ভাই স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক, যিনি ১১টি দেশে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন

    • Author,

      বন্দনা

    • Role,

      বিবিসি সংবাদদাতা

  • ৪ ঘন্টা আগে

  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বলিউড তারকা রণবীর সিং অভিনীত 'ধুরন্ধর' ছবিটি গত বছর সিনেমা হলগুলিতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এবার পর্দায় এসেছে 'ধুরন্ধর পার্ট ২'। আগের মতো এই ছবির পরিচালকও আদিত্য ধর।

এই ছবির একটা দৃশ্য সাড়া ভারত জুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে, যে দৃশ্যে রণবীর সিংকে রহমান ডাকাতের ভাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করা অভিনেতা অক্ষয় খান্না জিজ্ঞেস করেন, "কোথা থেকে আসছেন?"

উত্তরে রণবীর বলেন, "খেরোটাবাদ, কোয়েটা, নাম- হামজা আলি মাজারি।"

এই ছবিতে একজন ভারতীয় গুপ্তচরের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রণবীর সিং, যিনি পাকিস্তানে গিয়ে সেদেশের নাগরিকের ছদ্মবেশে বসবাস করতে শুরু করেন।

এ তো গেল পর্দার গল্প। বাস্তবেও কিন্তু রণবীর সিং পরিবার ও তার পূর্বপুরুষরা পাকিস্তানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। কিন্তু সেটা কীভাবে?

এই সম্পর্ক আজকের নয়। ১৯৪০ সালে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে একটি খ্রিস্টান পরিবার বাস করতো। যে গ্রামে এই পরিবারটি থাকত, সেই গ্রাম অধুনা পাকিস্তানে।

এই পরিবারেরই এক সদস্য ছিলেন যুবক স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক। পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি হওয়ার পরে তিনি ১১ টি দেশে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হয়ে কাজ করেছেন।

এই মার্টিন বার্ক-এর বোন চাঁদ বার্ক, হিন্দি ছবিতে একাধিক পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। চাঁদ বার্ক সম্পর্কে রণবীর সিংয়ের ঠাকুমা।

বার্ক পরিবারের ছবিতে রণবীর সিংহের ঠাকুমা চাঁদ বার্ক (একদম ডানে) এবং স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক (বাম দিক থেকে চতুর্থ)

ছবির উৎস, Noel Parsons

ছবির ক্যাপশান,

বার্ক পরিবারের ছবিতে রণবীর সিংহের ঠাকুমা চাঁদ বার্ক (একদম ডানে) এবং স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক (বাম দিক থেকে চতুর্থ)

চাঁদ বার্ক ওরফে পাঞ্জাবের 'ড্যান্সিং লিলি'

স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক সম্পর্কে আমার আরও আগ্রহ বাড়ল, যোগাযোগ হল তার লন্ডন নিবাসী কন্যা নোয়েল পারসন্সের সঙ্গে।

সম্পর্কে রণবীর সিংয়ের ঠাকুমার দাদা স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক পাঞ্জাবের নানকানা সাহেবের কাছে মার্টিনপুর গ্রামে ১৯০৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন।

বিবিসিকে নোয়েল পারসন্স বলছিলেন, "দেশভাগের সময় আমদের বলা হয়েছিল যে কোনো এক দেশ বেছে নিতে।

"এটি বাবার মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তার মনে এতটাই সংশয় তৈরি হয় যে তিনি অবিভক্ত ভারতে চাকরি ছেড়ে দিয়ে লন্ডনে চলে আসেন," বলছিলেন মিজ. পারসন্স।

অন্যদিকে দেশভাগের সময়ে রণবীর সিংয়ের ঠাকুমা বম্বে অর্থাৎ অধুনা মুম্বাই শহরে চলে আসেন।

'সিনেমাজি' নামে একটি ডকুমেন্টেশন প্রজেক্ট ভারতের পুরোনো দিনের ফিল্মের সঙ্গে যুক্ত বহু দুষ্প্রাপ্য আর্কাইভ ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের স্মৃতি সংরক্ষণের কাজের সঙ্গে যুক্ত।

সিনেমাজির সহ-প্রতিষ্ঠাতা আশা বাত্রা জানিয়েছেন, "চাঁদ বার্ক হিন্দি ও পাঞ্জাবি ছবিতে অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রথমে তিনি লাহোরে নির্মিত ছবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।"

"তার নাচের পারদর্শিতার কারণে তাকে পাঞ্জাবের ডান্সিং লিলি নামে ডাকা হতো।"

১৯৪৬ সালে স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক পাঞ্জাবের প্রথম ইলেকশনস পিটিশনস কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন

ছবির উৎস, Noel Parsons

ছবির ক্যাপশান,

১৯৪৬ সালে স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক পাঞ্জাবের প্রথম ইলেকশনস পিটিশনস কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন

দেশভাগের যন্ত্রণা

রণবীর সিংয়ের পরিবারের গল্প অবিভক্ত ভারতের একাধিক অঞ্চল ও ভারতের বাইরে একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত।

১৯৪৬ নাগাদ যখন দেশভাগের কথা উঠেছিল, তখন স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক একজন বিচারক হিসেবে পাঞ্জাবের প্রথম নির্বাচন পিটিশনস কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন।

তার কন্যা নোয়েল পারসন্স জানিয়েছেন, যখন পাকিস্তান গঠন নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছিল, তখন কমিশনের কাছে যারা দাবি পেশ করছিলেন, তাদের মধ্যে সব রাজনৈতিক দলের নেতারাই ছিলেন।

তার আত্মজীবনী 'আ লাইফ অফ ফুলফিলমেন্ট'-এ স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক লিখেছেন, "ওই সময়ে নিরপেক্ষ থাকার জন্য আমি একটি কৌশল অবলম্বন করেছিলাম।"

"আমি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলাম যে দেশভাগের পরে আমি কোনো মতেই সরকারি চাকরিজীবী হতে চাই না। অবসর নেওয়াই আমার পক্ষে সম্মানজনক পদক্ষেপ বলে মনে করেছিলাম," লিখেছিলেন তিনি।

মি. বার্ক লিখেছিলেন, "যার ফলে ভারতীয় সিভিল সার্ভিস থেকে সময়ের আগেই অবসর নেওয়া প্রথম এশীয় হিসেবে আমার নাম রয়ে গেল।

"এর ফলে যেটা হলো, আমি আমার নতুন স্বাধীন রাষ্ট্র পাকিস্তানে শুধু একজন বেকারই নয়, বরং সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একজন হয়ে পড়লাম। যেখানে ইংরেজ আমলে আমি ভারতের সিভিল সার্ভিসে জজ ছিলাম," নিজের বইতে লিখেছিলেন তিনি।

এই দ্বন্দ্বের মাঝেই স্যামুয়েল মার্টিন বার্ক নিজের পরিবারকে নিয়ে ব্রিটেন চলে এলেন। তার ভাই ও বোনেরা কানাডা চলে গেলেন।

শুধুমাত্র এক বোন চলে গেলেন বম্বে, যার নাম আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, চাঁদ।

বাবা স্যামুয়েল মার্টিন বার্কের সঙ্গে কন্যা নোয়েল পারসন্স

ছবির উৎস, Noel Parsons

ছবির ক্যাপশান,

বাবা স্যামুয়েল মার্টিন বার্কের সঙ্গে কন্যা নোয়েল পারসন্স

পাকিস্তান ত্যাগ করেও কীভাবে সেদেশের রাষ্ট্রদূত?

মি. বার্কের জীবন নিয়ে যে ধোঁয়াশা রয়েই যায় তা হল, পাকিস্তান ত্যাগ করেও ১১টি দেশে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হওয়ার ব্যাপারটা।

তার কন্যা বিবিসিকে জানিয়েছেন, বিভাজনের সময়ে পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান মি. বার্কের একপ্রকার 'গডফাদার' ছিলেন। উনিই স্যামুয়েল বার্কের কাছ থেকে পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রণালয় গঠন করার জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন।

সেই সূত্রেই স্যামুয়েল বার্ক প্রথম লন্ডনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হলেন ও পাকিস্তানের দূতাবাস স্থাপন করলেন।

অন্যদিকে তার বোন চাঁদ বার্ক ভারতে এসে হিন্দি ছবিতে কাজ শুরু করলেন।

স্যামুয়েল ও চাঁদ বার্কের বাবার নাম ছিল জনাব খইরুদ্দিন। শোনা যায়, তিনি বার্ক নামে শায়েরি লিখতেন। নোয়েল জানিয়েছেন, পরবর্তীতে তার পরিবার খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।

২০০৯ সালে প্রবীণ সাংবাদিক সাজিদা মোমিন ১০৩ বছর বয়সী স্যামুয়েল মার্টিন বার্কের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময়ে তিনি স্যামুয়েল বার্কের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন গল্প বলছিলেন।

"স্যামুয়েল ক্রিকেট খেলতে খুব ভালোবাসতেন। নোয়েল আমাকে বলেছিলেন যে, অবিভক্ত ভারতে একটি ম্যাচে তার বাবা পাটিয়ালার মহারাজাকে আউট করে দিয়েছিলেন।"

"কিন্তু আম্পায়ার এমন ভঙ্গি করলেন যেন উনি কিছুই দেখেননি। কারণ আম্পায়ার পাটিয়ালার মহারাজাকে সমীহ করে চলতেন।"

"ওই আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন স্যামুয়েল বার্ক। যদিও মহারাজা আম্পায়ারের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন যে আম্পায়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন না।"

"স্যামুয়েল মহম্মদ আলি জিন্নাহ ও লিয়াকত আলি খানের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলেন". জানিয়েছেন সাজিদা মোমিন।

রাজ কাপুর

ছবির উৎস, Film Heritage Foundation

ছবির ক্যাপশান,

রাজ কাপুর

চাঁদ বার্ককে সুযোগ করে দেন রাজ কাপুর

নোয়েল কি তার পিসি ও রণবীরের ঠাকুমা চাঁদের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ফোনে তিনি বলেন, "অবশ্যই ছিলাম, শি ওয়াজ মাই আন্ট!"

চাঁদ বার্কের পুরোনো ছবি নিয়ে বসে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে যে তার গলার স্বর পাল্টে আসছিল, সেটা আমি ফোনের এপার থেকে না দেখেই বুঝতে পারছিলাম।

আশা বাত্রা জানিয়েছেন যে দেশভাগের পর অনেক বছর চাঁদকে পর্দায় দেখা যায়নি। কিন্তু রাজ কাপুর তাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন।

"আপনি যদি 'বুট পালিশ' ছবিটি দেখে থাকেন, তবে ওই ছবিতে নির্দয়, লোভী ও হিংস্র নারী চরিত্রটিকে ভোলা অসম্ভব। ওই নারী চরিত্রটি দুটি অনাথ বাচ্চার উপর মানসিক ও দৈহিক নির্যাতন চলিয়েছিলেন।"

এই চরিত্রটির অভিনেত্রী ছিলেন চাঁদ বার্ক। তিনি পরে সুন্দর সিং ভাবনানিকে বিয়ে করেন। এবং এই চাঁদ বার্কের নাতি হলেন আজকের রণবীর সিং।

রণবীর সিং

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

রণবীর সিং

বার্ক পরিবারের সঙ্গে রণবীর সিংয়ের সম্পর্ক

সাজিদার কথায়, ২০০৯ সালে যখন তিনি স্যামুয়েল মার্টিন বার্কের সঙ্গে দেখা করেছিলেন সেটা ছিল তার ১০৩তম জন্মদিন। ভারতের বহু আইএএস অফিসার তাকে শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন, কারণ তিনি অবিভক্ত ভারতের সবথেকে দীর্ঘায়ুসম্পন্ন সিভিল সার্ভেন্ট।

ধুরন্ধর ও বার্ক পরিবারের কথায় আসা যাক। এক ভাই ভারতীয় জজ হয়েও পাকিস্তানের নামী কূটনীতিবিদ হলেন, এক বোন হয়ে উঠলেন অভিনেত্রী, যিনি রাজ কাপুর, নার্গিস, নিম্মি প্রদীপ কুমার, প্রাণ, মনোজ কুমারের মতো বলিউড সিনেমার বিখ্যাত সব ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করেছেন।

আবার এই পরিবারেই কয়েক প্রজন্ম পরে সময়ের ফেরে রণবীর সিং হয়ে ওঠেন বলিউডের জনপ্রিয় হিরো।

কিন্তু স্যামুয়েল মার্টিন বার্কের ব্রিটেন নিবাসী কন্যা কি ভারতের রণবীর সিংয়ের কথা জানেন?

আমার প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই নোয়েল জানালেন, "জানি, কিন্তু ওর সঙ্গে কখনও আলাপ-পরিচয় হয়নি।"

হয়তো এভাবেই দেশভাগের ক্ষত বুকে নিয়ে দুই দেশে বসবাসকারী একদা একই পরিবারের বংশধররা ধীরে ধীরে একে অন্যের চেয়ে দূরে সরে যেতে থাকেন।

ধুরন্ধরের সিকুয়েলের গল্প, অভিনয় ও গানগুলি প্রথমটির মতই জনপ্রিয় হয়েছে।

কিন্তু অনেকেই এই ছবিটির বিষয়ে বলেছেন, যে এটি একটি প্রোপাগান্ডা মুভি। যদিও বক্স অফিসে এই সমালোচনার রেশ পড়েনি।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews