শুরুতে যে আশার আলো তিনি জ্বালিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা নিভে গেল ব্যর্থতার অন্ধকারে। মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ে অধ্যায়ের সমাপ্তি যেন তার কোচিং জীবনেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
গুয়াদালাহারায় শনিবার স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বেই বিদায় নিতে হয়েছে দুইবারের চ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকে। ম্যাচ শেষে বিয়েলসা নিজের ব্যর্থতার দায় স্বীকার করেন। অবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, "আমি এই হতাশার জন্য দায়ী। আমার সময়টা উরুগুয়ান ফুটবলে কিছুই রেখে যায়নি।"
প্রথমার্ধে কিংবদন্তি গোলরক্ষক ফার্নান্দো মুসলেরার ভুলে গোল হজম করে উরুগুয়ে। এরপরই বিয়েলসা তাকে বদলি করেন। ৪০ বছর বয়সী মুসলেরা গত মার্চে অবসর ভেঙে ফিরেছিলেন বিয়েলসার অনুরোধেই। কিন্তু তিনিই ইতিহাসে প্রথম গোলরক্ষক যিনি এক বিশ্বকাপে তিনটি ভুলে গোল হজম করলেন। এটাই সম্ভবত তার ১৩৭তম ও শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। তার বীরত্বেই ২০১০ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে উঠেছিল উরুগুয়ে।
গোলরক্ষকের এমন ভুলের পর পরের রাউন্ডে যেতে পারা অনেক কঠিন। উরুগুয়ের জন্যও হয়েছে সেটাই। বিয়েলসা জানান, মুসলেরাকে বদলি করা তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করার জন্য নয়, বরং তা বজায় রাখার জন্য। একইভাবে অধিনায়ক ফেদেরিকো ভালভার্দেকেও পরে তুলে নেন তিনি আক্রমণে ধার বাড়াতে।
কাতার বিশ্বকাপের পর উরুগুয়ের দায়িত্ব নেন বিয়েলসা। শুরুটা ছিল দুর্দান্ত—আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে হারিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার বাছাইপর্বে গোলের ঝড় তুলেছিল উরুগুয়ে। কিন্তু ২০২৪ কোপা আমেরিকার পর থেকে সবকিছু বদলে যায়।
গত নভেম্বরে মাউরিসিও পচেত্তিনোর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৫-১ গোলের লজ্জাজনক হার, তারও আগে গত মার্চে ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ভাগ্যজোরে ড্র- সবকিছুতেই যেন ছিল পতনের প্রতিধ্বনি। এসময় তার বিয়েলসার দলের খেলায় আক্রমণাত্মক ফুটবলের ছিটেফোঁটাও ছিল না।
৭০ বছর বয়সী বিয়েলসার রঙিন ক্যারিয়ারের এই অধ্যায় উরুগুয়ের জন্য হতাশাজনক। তার পতনের গল্পটা আসলে একাধিক স্তরে গড়ে উঠেছে—কেবল মাঠের কৌশল নয়, সম্পর্ক, মানসিকতা আর সময়ের পরিবর্তনও রেখেছে বড় ভূমিকা।

প্রথমেই বলতে হয় খেলোয়াড়দের মধ্যে স্থবিরতা। ফেদেরিকো ভালভার্দে ছাড়া বেশিরভাগ প্রতিভা—বেন্টানকুর, উগার্তে, পেলিস্ত্রি, নুনেজ—ক্লাব পর্যায়ে প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারেনি। ফলে জাতীয় দলেও ছন্দ আসেনি তাদের খেলায়।
বিয়েলসার হাই-প্রেসিং, আক্রমণাত্মক ফুটবল একসময় বিপ্লবী ছিল। এখন তা মূলধারায় চলে এসেছে, প্রতিপক্ষ সহজেই মানিয়ে নিচ্ছে। এটিও তার পতনের অন্যতম কারণ, বলছেন বিশ্লেষকরা।
আরও একটি কারণ বিশ্বকাপের আগে কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ না খেলা। নতুন সিস্টেমে ঝুঁকেছিলেন তিনি। কিন্তু সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথমার্ধেই তা ভেঙে পড়ে, আবার পুরনো ৪-৩-৩ ফরমেশনে ফিরতে হয় তাকে।
গণমাধ্যমে খবর আসে, খেলোয়াড়দের সঙ্গে সম্পর্কটাও স্বাভাবিক নয় বিয়েলসার। দলটির কিংবদন্তি ফুটবলার লুইস সুয়ারেজেও অভিযোগ তোলেন এ বিষয়ে। অবসরের সময় তিনি সরাসরি বলেন, বিয়েলসার আচরণে উষ্ণতা নেই, খেলোয়াড়দের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৫-১ গোলে হারের পর বিয়েলসা নিজেকে “toxic perfectionist” বলে বর্ণনা করেন।

বিয়েলসার আচরণও সময়ের সঙ্গে বেশ অদ্ভুত ঠেকেছে বিশ্লেষকদের। হাইড্রেশন ব্রেককে সংস্কৃতির ক্ষতি বলা, অফিসিয়াল ফটোশুটে অংশ নিতে অস্বীকৃতি— এসকিছু তার স্বকীয়তা বজায় রাখলেও আধুনিক খেলোয়াড়দের কাছে তা অচেনা ও দূরত্ব সৃষ্টিকারী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিয়েলসা আগেই জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপের পর তিনি সরে দাঁড়াবেন। কিন্তু সেই ঘোষণা দলকে নতুন উদ্দীপনা দিতে পারেনি। ইতিহাস বলে- উরুগুয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বিয়েলসার অধ্যায় সম্ভবত শেষ এখানেই।