গত কয়েক বছর ধরেই আম মৌসুমে ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন চালানো হতো আমের রাজধানী খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেনটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ছেড়ে রাজশাহী, সরদহ, আড়ানী, আব্দুলপুর ও ঈশ্বরদী হয়ে ঢাকায় যেত আম নিয়ে।
একইভাবে কুরবানির ঈদ উপলক্ষে রাজশাহী অঞ্চল থেকে কম খরচে গবাদিপশু বহনে চালানো হতো ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন। তবে এবার ম্যাঙ্গো কিংবা ক্যাটল স্পেশাল কোনো ট্রেনই থাকছে না।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে, অব্যাহতভাবে লোকসান হওয়ায় এবার আর ম্যাঙ্গো ও ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন তারা চালাবে না।
কর্তৃপক্ষ আরও বলছেন, ট্রেনে আম ও গবাদিপশু পরিবহণ অনেক সাশ্রয়ী হলেও চাষি ও খামারিরা সেই সুযোগ নেয়নি। ফলে এক টানা পাঁচ বছর লোকসান করেছে রেল।
পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের বাণিজ্যিক দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে প্রথমবারের মতো ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন চালু করা হয়। ওই বছরেই কুরবানির ঈদ উপলক্ষে ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন চালু করে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। উদ্দেশ্য ছিল প্রান্তিক আমচাষি, বাগান ব্যবসায়ী ও খামারিদের উৎপাদিত পণ্য কম খরচে রাজধানীতে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।
চাষি ও খামারিরা অবশ্য তুলে ধরছেন ভিন্ন যুক্তি। তাদের মতে, বাগান বা বাড়ি থেকে স্টেশন পর্যন্ত, আবার স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে আম বা পশু নেওয়ার ক্ষেত্রে পোহাতে হতো বাড়তি ঝক্কি-ঝামেলা। ট্রেনের ভাড়া কম হলেও পরের ধাপগুলিতে হতো বাড়তি খরচ। সে কারণে ট্রেনের চেয়ে সড়কেই বেশি আস্থা রেখেছেন আম চাষি, বাগান ব্যবসায়ী ও পশু খামারিরা। ফলে রেলওয়ের এ স্পেশাল সার্ভিসের ট্রেনগুলো পর্যাপ্ত মালামাল না পেয়ে অনেকটাই ফাঁকা যাতায়াত করত।
জানা গেছে, গত পাঁচ বছর ধরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রতি কেজি আম এক টাকা ৪৭ পয়সা এবং রাজশাহী থেকে এক টাকা ৪৩ পয়সা ভাড়ায় ট্রেনে করে ঢাকায় আম নিয়ে যেতেন চাষিরা। একই ভাবে কুরবানির ঈদ উপলক্ষে কম খরচে কুরবানির পশু পরিবহণ করা হতো।
রেলওয়ের বাণিজ্যিক দপ্তরের তথ্য মতে, ২০২০ সালে ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেনে আয় হয়েছে ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ৫৩৬ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ৫৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ২০২১ সালে আয় হয়েছে ২৬ লাখ ৩০ হাজার ৯২৮ টাকা। ব্যয় হয়েছে ৫৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ২০২২ সালে আয় হয়েছে দুই লাখ ১২ হাজার ১৭৪ টাকা। আর ব্যয় ১২ লাখ ৪০ টাকা। ২০২৩ সালে আয় হয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৫০২ টাকা। আর ব্যয় হয়েছে ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা। যদিও ২০২৪ সালে শুধু ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন চালু ছিল।
গত ৫ বছরে এসব স্পেশাল ট্রেন থেকে রেলওয়ে আয় করেছে প্রায় অর্ধকোটি টাকা। এর বিপরীতে জ্বালানি তেল, স্টাফদের বেতন ও অন্যান্য সহায়কখাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই কোটি টাকার বেশি। এ ক্ষেত্রে লোকসান হয়েছে প্রায় দেড় কোটি টাকা।
এ বিষয়ে রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদ সাধারণ সম্পাদক সেকেন্দার আলী বলেন, রেলওয়ে রাষ্ট্রীয় সংস্থা। লাভ-লোকসানের বিষয় এটি নয়। চাষি, ব্যবসায়ী ও খামারিদের স্বার্থে এই ট্রেন চালু করা হয়েছিল। কিন্তু পণ্য স্টেশনে নিয়ে যাওয়া, ট্রেনে তোলা, ঢাকায় নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া; সব মিলিয়ে বাড়তি ব্যয় হতো। আসলে এই উদ্যোগ খুব বেশি পরিকল্পনা করে নেওয়া হয়নি। চালুর সময় রেলওয়ে ব্যবসায়ীদের এ বিষয়ে কোনো আলোচনাও করেনি। ফলে উদ্যোগটি সফল হয়নি। তাই বলে ট্রেনগুলি বন্ধ করে দেওয়াও ঠিক নয়।
এ বিষয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ফরিদ আহমেদ বলেন, আম চাষি, বাগান বাগানি ও খামারিদের অনীহার কারণে ট্রেনগুলি পরিচালনার খরচ উঠেনি। এ কারণে ম্যাঙ্গো ও ক্যাটল স্পেশাল ট্রেন না চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামীতে যদি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয় তখন ট্রেনগুলি আবার চালু করার কথা ভাবা যেতে পারে।