আধুনিক রাষ্ট্রে সাংবিধানিকভাবে তিনটি অঙ্গ স্বীকৃত- আইনসভা বা জাতীয় সংসদ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। সেই সাথে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সংবাদমাধ্যমকে এ মর্যাদা অর্জন করতে হয়েছে। নাগরিক আস্থাই এর ভিত্তি। তবে যে দেশে গণতন্ত্র দুর্বল, সেখানে গণমাধ্যম নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে থেকেও যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারে না। তখন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। কোনো না কোনো মাত্রায় ব্যত্যয় ঘটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন? উত্তর এক কথায় দেয়া মুশকিল। এ জন্য একগুচ্ছ কারণ বিদ্যমান। একটি কারণ সংবাদমাধ্যমের করপোরেট মালিকানা।
বাংলাদেশে গত এক দশকে গণমাধ্যমের মালিকানার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। মিডিয়া এখন স্রেফ একটি ব্যবসায়। কোনো মহৎ মিশন নয়। দেশে নব্বই দশকের শেষ দিকে যখন করপোরেট মিডিয়ার আবির্ভাব, ঠিক তখন থেকে সংবাদমাধ্যমের এই হাল।
দীর্ঘ দিন ধরে মিডিয়ার স্বাধীনতা এবং বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা শব্দ যুগল জোরেশোরে উচ্চারিত হয়ে আসছে। প্রশ্ন উঠেছে, আমাদের দেশে গণমাধ্যম কী গণমানুষের কথা বলতে পারছে?
সামাজিক বিবর্তন ও রাজনৈতিক মেরুকরণে সংবাদপত্রের যে বিশেষ ভূমিকার কথা গত শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত বলা হতো, এখন আর সেভাবে বলা হয় না। এখন কোনো ব্যক্তি বা একক সংস্থা নয়, রেডিও, টিভি বা সংবাদপত্রের মালিক হচ্ছেন কোনো দলীয় সমর্থক কিংবা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এসব ব্যবসায়ী ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক স্বার্থে সংবাদপত্র আর টিভি চ্যানেল চালু করছেন। এর মধ্যে আরেকটি প্রবণতা লক্ষ করার মতো, ইদানীং বিভিন্ন মিডিয়া হাউজের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। পত্রিকাগুলোর আধেয়তে, এমনকি আধেয়র গণ্ডি ছাড়িয়ে দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারে, মানুষের হাতে হাতে বিলি করা লিফলেটে। এটি সাংবাদিকতার অবক্ষয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে; যা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদা ও জনআস্থা প্রকট করে তুলছে। এমন বাস্তবতায় মুক্তবাজার অর্থনীতিতে নষ্ট রাজনীতিক বা দুষ্ট ব্যবসায়ীদের মিডিয়া মালিক হওয়া ঠেকানো যাচ্ছে না।
আজকের নিবন্ধে আমরা মালিকপক্ষ কীভাবে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অন্তরায় হয়ে উঠেছেন, তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করব। গণমাধ্যমের মালিকানার ধরন পাল্টে যাওয়া যে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার অন্তরায় তা টাইমস মিডিয়া লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে আজাদের কথায় স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, ‘আমার ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানে ৭৫ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন। তাদের স্বার্থ আমাকে আগে দেখতে হয়। তারপরে সৎ সাংবাদিকতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বলেন, গণতন্ত্র বলেন, এটি আমার কাছে সেকেন্ডারি; ফান্ডামেন্টাল হলো এদের প্রটেকশন দেয়াটা’। (প্রথম আলো, অনলাইন সংস্করণ, ৯ মে ২০২৬)
রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ জার্নালিজম কনফারেন্স-২০২৬’-এর শেষ দিনের দ্বিতীয় সেশনে এ কথা বলেন এ কে আজাদ। এ সেশনে আলোচনার বিষয় ছিল ‘মিডিয়া সেলফ রেগুলেশন ইন বাংলাদেশ : প্রফেশনাল ওভারসাইট, অ্যাকাউন্টেবিলিটি অ্যান্ড গ্রিভেন্স রেডরেসাল’। এ কে আজাদ বলেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তারা (সাংবাদিক) স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। কেন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না? তার মূল অন্তরায় হচ্ছি আমি।’
এ কে আজাদ বলেন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করতে হলে দীর্ঘ সময় ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন হয়। কোনো দুর্নীতির তথ্য প্রকাশের আগে সাংবাদিকদের সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিতে হয়। আর তখন থেকে চাপ শুরু হয়। তিনি বলেন, যার বিরুদ্ধে সংবাদ হবে, প্রথম ফোনটা আসে আমার কাছে; যেন কোনোভাবে সংবাদটি প্রকাশ করা না হয়। এ কে আজাদের অভিযোগ, সরাসরি চাপ দিয়ে কাজ না হলে অনেক সময় প্রভাবশালী মহল, গোয়েন্দা সংস্থা কিংবা সরকারের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদেরও ব্যবহার করা হয়।
এমন পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উত্তরণ সম্ভব, এমন প্রশ্নের জবাবে এ কে আজাদ বলেন, যদি আপনারা আমাকে প্রটেকশন দিতে পারেন যে আমি ব্যবসায়িকভাবে কোনো হয়রানির শিকার হবো না, আমাকে গ্রেফতার করা হবে না, আমার কলকারখানা চালাতে বাধাগ্রস্ত করা হবে না, এ নিশ্চয়তা পেলে আমি তো আর আপনাদের গলা টিপে ধরব না, সাংবাদিকদের হাত চেপে ধরব না।
এ কে আজাদের বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট, ব্যবসায়িক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে তিনি তার মিডিয়া হাউজের সাংবাদিকদের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা থেকে বিরত রাখেন। এটি তার সরল স্বীকারোক্তি। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রধান অন্তরায়গুলোর একটি করপোরেট ও ব্যক্তিমালিকানার স্বার্থ। বর্তমানে দেশের বেশির ভাগ শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও টেলিভিশন চ্যানেল বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানাধীন। ফলে গণমাধ্যমগুলো মালিকের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে নিরপেক্ষতা হারায় এবং এতে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রধানত বাংলাদেশে গণমাধ্যমের সাথে মালিকানার সম্পর্ক পেশাদরত্বের নয়। সংবাদমাধ্যমগুলোতে মালিকানার হস্তক্ষেপ অনেক বেশি প্রত্যক্ষ। নিজের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে কি না, মালিকরা তা বুঝে নিতে চান। অথচ গণমাধ্যমের সাথে মালিকের আদর্শ সম্পর্ক হওয়া উচিত পেশাদরত্বের। অর্থাৎ গণমাধ্যমে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে মালিকের সর্বনিম্ন বা একেবারে হস্তক্ষেপ থাকবে না। সাংবাদিকরা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীনভাবে নিতে পারবেন। এর মানে এই নয় যে, মালিকরা সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ত হতে পারবেন না। সংবাদ পরিবেশন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া প্রয়োজনবোধে অন্য সিদ্ধান্তে মালিকপক্ষ নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপ করতে পারবে। প্রকৃত বাস্তবতায় মালিক বিনিয়োগ করবেন, লাভের অংশ যেভাবে পাওয়া উচিত পাবেন। কিন্তু সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত- কোনটা নিউজ হবে, কোনটা হবে না, কীভাবে পরিবেশিত হবে- এসব সিদ্ধান্ত সাংবাদিকদের হাতে থাকতে হবে। তবে এ কথাও ঠিক যে- এমন নয় যে, বিশ্বের প্রসিদ্ধ গণমাধ্যমে মালিকানার হস্তক্ষেপ নেই। জটিল পরিস্থিতিতে সেখানেও মালিকপক্ষ হস্তক্ষেপ করে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব মিডিয়ার মালিকানার খবর কিন্তু অতটা জানা যায় না। তারা তাদের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত এত বেশি মুক্তভাবে নেন যে, এর পেছনে মালিক আছেন- তা-ও বোঝা যায় না। অন্য দিকে আমাদের দেশে গণমাধ্যমের সাথে মালিকানার সম্পর্ক স্বায়ত্তশাসনের নয়। আর দশটা পণ্যের মতো মালিক মিডিয়া ব্যবসায়ও মিলিয়ে ফেলেন। এর কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পুঁজিবাদের বিকাশের যে ইতিহাস, সেভাবে বাংলাদেশে পুঁজির বিকাশ ঘটেনি। ফলে বুর্জোয়া মোরালিটি বলে যে একটি কথা আছে, তা এখানকার পুঁজিপতিদের মানসিকতায় নেই। দেশীয় পুঁজিপতিদের মধ্যে এটি অনুসৃত হয় না বললেই চলে। তাদের মন-মানসিকতা সামন্ত প্রভুর মতো।
বাংলাদেশে যারা ধনিক-বণিক শ্রেণী, তাদের প্রায় সবাই দুর্বৃত্তায়নের মাধ্যমে পুঁজির মালিক হয়েছেন। এদের বিরুদ্ধে দুর্বৃত্তপনার এন্তার অভিযোগ আছে। মূলত অনিয়মের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা পুঁজির মালিক হন। সেই তারা যখন গণমাধ্যমের মালিক হন, তখন সাংবাদিকতার পরিবেশ দেয়ার চেয়ে ব্যবসায়িক ও ব্যক্তি স্বার্থ তাদের কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। তাদের ইচ্ছার কাছে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা সমাহিত করতে হয়।
বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পূর্ব বা পরও ব্যবসায়ীরা সংবাদপত্রের মালিক ছিলেন। সে সময় পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সত্তর-আশির দশক পর্যন্ত সাংবাদিকতা ছিল অনেকটা রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক। লক্ষণীয় যে, আমাদের দেশে নব্বইয়ের পর বিশ্বায়নের যুগে সংবাদমাধ্যমের ধরন পাল্টেছে। এক ধরনের বস্তুনিষ্ঠতাসহ ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ, যা কোনো দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করে, এমন সাংবাদিকতা দেশে চালুর প্রচেষ্টা দেখা গেছে। কিন্তু বেশি দিন তা স্থায়িত্ব পায়নি। দ্রুত প্রতিস্থাপিত হয় করপোরেট বা ধনিক-বণিক শ্রেণীর স্বার্থনির্ভর সাংবাদিকতায়। এতে করে মালিকপক্ষের প্রভাব স্পষ্ট হতে শুরু করে। গণমাধ্যমে রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক সাংবাদিকতা, মালিকের স্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার ভেতর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এক ধরনের চেষ্টা দেখা গেছে। ফলে এ কথা বলা যায়, মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি, রুচি, অতীত ইতিহাস, ধনী হয়ে ওঠার ধরন ইত্যাদি নানা কিছুর প্রভাব পড়েছে সংবাদপত্রের সংবাদ পরিবেশনায়। যেমন- ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা পর দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে স্বদেশে নিয়ে গেছে। একটা সময় পর তারা ধীরে ধীরে সিস্টেমে দাঁড়িয়েছে, পুঁজি আহরণের নিয়ম দাঁড় করিয়েছে। এক ধরনের নীতিবোধ তাদের মধ্যে কাজ করে। দুর্ভাগ্য, বাংলাদেশে এর কোনো বালাই নেই। পরিণতিতে করপোরেট মিডিয়ার প্রায় সব মালিক নিজের স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে গণমাধ্যম খুলে বসছেন। তাই প্রকৃত বাস্তবতায় বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করতে হলে গণমাধ্যমের মালিক-সম্পাদকীয় নেতৃত্বের সম্পর্ক যথাযথ জায়গায় নিতে হবে। এ জন্য গণমাধ্যমকর্মী, মালিক বা পাঠক-দর্শক-শ্রোতারও একটা দায় আছে।
সত্যি হলো— যথাযথ সুস্থ পরিবেশ না থাকায় দেশে গণমাধ্যম ব্যবসায় কেউ কেউ উন্নতি করলেও সামগ্রিকভাবে স্বাধীন মিডিয়ার বিকাশ ঘটেনি। অতীতের কোনো সরকার সুস্থধারার গণমাধ্যম বিকাশের পথ সুগম করেনি। আবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে গত দেড় দশকে ফ্যাসিবাদী জমানায় বিচ্যুতির মাত্রা আকাশ ছুঁয়েছিল। তাই গণমাধ্যমের মালিকানায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কালো টাকার অনুপ্রবেশ নিরুৎসাহিত করতে হবে রাষ্ট্রকে। এ খাতের সমস্যা উত্তরণে আর্থিক সাফল্য এবং বিশ্বাসযোগ্য ও দায়িত্বশীল তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হলে মালিকানার কাঠামো নিয়েও ভাবতে হবে। কারণ, বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশনের দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য মালিকানার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দু-একটি বাদে বাংলাদেশে অর্থনৈতিকভাবে সংবাদপত্র শিল্প কখনোই স্বাবলম্বী ছিল না। তবু গত তিন দশকে দেশে গণমাধ্যমের বিস্তৃত সত্যি বিস্ময়করভাবে বেড়েছে। এই বিস্তারের সাথে সাথে প্রবলভাবে সংবাদমাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব পড়েছে। অনেক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ব্যবসায়িক সুরক্ষায় গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেতে সরকারের সমর্থনে সংবাদ পরিবেশনে সম্পাদকীয় নীতিতে প্রভাব বিস্তার করছে। এতে সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা কমেছে। সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে। তাই এ কথা বলা অসঙ্গত হবে না, দেশে গণতন্ত্র শক্তিশালী (অর্থাৎ-গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার এখতিয়ার) না হলে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন-আকাঙ্ক্ষা সোনার পাথর বাটি হয়েই থাকবে। থাকবে অধরা।
লেখক: সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত