পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠা ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে আতঙ্কের রাত কাটিয়েছেন লাখো মানুষ। ধসে পড়া ভবন, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া এবং সম্ভাব্য আফটারশকের শঙ্কায় অনেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করেন।
বুধবার কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। যদিও হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনও প্রকাশ হয়নি, তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ পরিস্থিতির চিত্র।
কারাকাসের বাসিন্দা ও সাংবাদিক নিকোল কোলস্টার জানান, ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সময় তিনি নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন। হঠাৎ ভবন কাঁপতে শুরু করলে তিনি জানালাগুলো কাঁপতে দেখেন এবং দ্রুত নিজেকে নিরাপদ রাখতে দরজা ও একটি পাথরের দেয়ালের মাঝখানে আশ্রয় নেন।
বিবিসিকে তিনি বলেন, “আমার জীবনে অনুভব করা এটিই সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প। এটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে আমি ভেবেছিলাম ভবনটি আমার ওপর ভেঙে পড়বে।”
সপ্তম তলায় অবস্থিত তার অ্যাপার্টমেন্টে বেশ কিছু সময় অবস্থান করার পর প্রতিবেশীদের চিৎকার শুনে তিনি বাইরে বের হন। তার ভাষ্য, ভূমিকম্পের এক ঘণ্টা পরও বহু মানুষ রাস্তায় অবস্থান করছিলেন এবং সম্ভাব্য আফটারশকের আশঙ্কায় কেউই ঘরে ফিরতে সাহস পাচ্ছিলেন না।
কোলস্টার আরো জানান, রাজধানীর অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পালোস গ্রান্দেসে বহু মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন, কেউ কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেকের উদ্বেগ ছিল তাদের পোষা প্রাণীদের নিয়ে, যাদের সবাই সময়মতো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে পারেননি।
এদিকে পালোস গ্রান্দেস এলাকার আরেক বাসিন্দা মারিয়া এলিস জানান, ভূমিকম্পে তার অ্যাপার্টমেন্টের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। তিনি বলেন, এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে পড়েছে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং মোবাইল নেটওয়ার্কও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
অনেক বাসিন্দাকে ভবনের বেজমেন্ট থেকে দ্রুত গাড়ি সরিয়ে নিতে দেখা গেছে। তাদের আশঙ্কা, পরবর্তী কোনো আফটারশক ভবনগুলোর আরো ক্ষতি করতে পারে।
নিকোল কোলস্টার জানান, তার বাসার কাছেই একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে সাহায্যের জন্য মানুষের আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরো স্পষ্ট করে।
ভেনিজুয়েলার জন্য বড় ধরনের ভূমিকম্প নতুন নয়। ১৯৬৭ সালে ৬ দশমিক ৬ মাত্রার এক ভূমিকম্পে কারাকাসে ২০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। সে সময় পালোস গ্রান্দেস ও আলতামিরার মতো অভিজাত এলাকার বহু ভবন ধসে পড়ে।
তবে ১৯৬৭ সালের সেই ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা থাকা অনেক বাসিন্দার মতে, এবারের ভূমিকম্প ছিল আরো ভয়াবহ।
পূর্ব কারাকাসের ৫৬ বছর বয়সী বাসিন্দা কোরো মার্টিনেজ রয়টার্সকে বলেন, “প্রচণ্ড বিকট শব্দ হচ্ছিল। ঘরের জিনিসপত্র, এমনকি ফ্রিজের ভেতরের সামগ্রীও ছিটকে পড়ে যায়। জীবনে এমন কিছু দেখিনি।”
অবসরপ্রাপ্ত ৮০ বছর বয়সী মারিয়া রোমেরোর ভাষায়, “এই ভূমিকম্পটি ছিল ভয়াবহ, এমনকি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পের চেয়েও খারাপ।”
উদ্ধারকর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত থাকায় ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের প্রকৃত চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়। কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য আফটারশকের বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে।
সূত্র: বিবিসি