আজ থেকে ১১৮ বছর আগের এক গ্রীষ্মের সকালে সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের আকাশ চিরে ধেয়ে এসেছিল এক রহস্যময় মহাজাগতিক বস্তু। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সেই তাণ্ডবে ওলট-পালট হয়ে গিয়েছিল ওই এলাকার পুরো ভূপ্রকৃতি। ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় এই ঘটনাটি ‘তুঙ্গুসকা ঘটনা’ নামে পরিচিত। ১৯০৮ সালের ৩০ জুন ঘটে যাওয়া সেই বিস্ফোরণে মাইলের পর মাইল বনাঞ্চল মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও সেখানে কোনো গর্ত সৃষ্টি হয়নি, এমনকি উদ্ধার করা যায়নি কোনো উল্কাপিণ্ডের অবশিষ্টাংশও। এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তোলা সেই রহস্য আজও পুরোপুরি উন্মোচন করা যায়নি। তবে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ২০৩০ সালের জুনে এই রহস্যেরই পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে পৃথিবীর বুকে।
গবেষকদের মতে, সেদিনের সেই রহস্যময় বস্তুটি সরাসরি মাটিতে আঘাত না করে ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উচ্চতায় বায়ুমণ্ডলেই বিশাল পরিমাণ শক্তি অবমুক্ত করেছিল, যা একটি মেটিওরিটিক এয়ারবার্স্ট বা বায়ুমণ্ডলীয় উল্কাবিস্ফোরণ ছিল। এর তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ২ হাজার ১৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকা লাখ লাখ গাছ একটি সুনির্দিষ্ট প্রজাপতি আকৃতির বিন্যাসে উপড়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে রাশিয়ার চেলিয়াবিনস্কের আকাশে ঘটে যাওয়া আরেকটি তুলনামূলক ছোট বায়ুমণ্ডলীয় বিস্ফোরণ বিজ্ঞানীদের এই ধারণাকে আরও জোরাল করে যে, এ ধরনের এয়ারবার্স্ট আগে যা ভাবা হতো তার চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরে এই বিস্ফোরণের পেছনে থাকা দানবীয় বস্তুটির সুনির্দিষ্ট পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করছেন। বস্তুটি আসলে কোনো গ্রহাণু নাকি ধূমকেতু ছিল, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক চলছে। তবে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এর পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, তুঙ্গুসকার বস্তুটি যদি পৃথিবীর সঙ্গে ৬১ বছরের কক্ষপথের সামঞ্জস্য থাকা কোনো মহাজাগতিক বস্তুপুঞ্জের অংশ হয়ে থাকে, তবে এর সঙ্গী বস্তুগুলো একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে আবার ফিরে আসতে পারে। সেই হিসাব অনুযায়ী, এ ধরনের কোনো বস্তু থাকলে তা ১৯৬৯ সালের জুনে একবার পৃথিবীর কাছাকাছি ফিরে এসেছিল এবং আগামী ২০৩০ সালের জুনে তা আবার ফিরে আসতে পারে। টেলিস্কোপের বর্তমান পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ‘নিও সার্ভেয়ার’ প্রযুক্তির মাধ্যমে এই ধরনের সম্ভাব্য মহাজাগতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কতা পাওয়ার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা, যাতে শত বছর আগের সেই ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি এড়ানো সম্ভব হয়।
বিডি প্রতিদিন/এনএইচ