সম্প্রতি ঢাকায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কর্তৃক আয়োজিত বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী প্রেরণ সংক্রান্ত আলোচনায় নিরাপদ ও স্বল্প অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী প্রেরণের বিষয় আলোচনা হয়। এতে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান নানা অনিয়ম, অতিরিক্ত ব্যয় এবং সীমিত সংখ্যক এজেন্সির আধিপত্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার বিদ্যমান কর্মী নিয়োগের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনার মাধ্যমে আরও স্বচ্ছ ও ন্যায্য নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে আইএলও।
মালয়েশিয়াকিনি ঢাকার বরাতে এমন সংবাদ জানিয়েছেন।
গত ৭ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি, শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং অভিবাসী শ্রমিকরা অংশ নেন।
বৈঠকে উপস্থাপিত প্রস্তাবনায় বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে বিদ্যমান শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল এবং এর ফলে বহু বাংলাদেশি কর্মী দেশে ও বিদেশে শোষণের শিকার হচ্ছেন, অপরদিকে এমন দুর্বল ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি অংশ বেশ লাভবান হয়েছে এবং হচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর এক প্রতিনিধি মালয়েশিয়ার সংবাদমাধ্যম মালয়েশিয়াকিনি’র কাছে তুলে ধরেন যে, মালয়েশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে আরও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে এবং সীমিত সংখ্যক এজেন্সি নির্বাচনের প্রথা বন্ধ করতে হবে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে সুযোগ দেওয়ার কারণে নিয়োগ ব্যয় বেড়েছে এবং অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত প্রমাণিত এজেন্সিগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করার সুপারিশও করা হয়। এছাড়া স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুধুমাত্র অনুমোদিত সরকারি হাসপাতালে সীমাবদ্ধ রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আলোচনায় শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থার ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। প্রস্তাবে অভিবাসী শ্রমিকদের আর্থিক লেনদেন পর্যবেক্ষণে ই-ওয়ালেট ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা যাচাই এবং বাংলাদেশের ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম আরও কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়।
উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ার জন্য সীমিত সংখ্যক বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। অভিযোগ ওঠে, ১ হাজার ৫০০-এর বেশি নিবন্ধিত এজেন্সির মধ্যে মাত্র ২৫ থেকে ১০০টি এজেন্সিকে শ্রমিক পাঠানোর অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়া সরকার নির্ধারিত প্রায় ৭৯ হাজার টাকা ব্যয়ের সীমা থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকদের কাছ থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়াও মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি না পাওয়ার অভিযোগে রয়েছে।
এসব নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এবং বেসরকারি মালয়েশিয়ান সংস্থা আপত্তি জানিয়ে আসছে। এমনকি, যে সিস্টেম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে সেটি পুনরায় চালু না করার দাবিও উঠেছে।
মালয়েশিয়ায় অভিযোগের প্রেক্ষিতে সে দেশের সংসদীয় কমিটি এবং দুর্নীতি দমন কমিশন ইতোমধ্যে কোনো অনিয়ম হয়নি মর্মে প্রতিবেদন দিয়েছে। কিন্তু ও মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পুলিশ, আদালত এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে বেশ কয়েকটি মামলা আছে। বাংলাদেশে সব মামলায় তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। ফলে এসব মামলা থাকায় বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করবে কিনা অনিশ্চয়তা রয়েছে। মামলাকারীদের একজন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মালয়েশিয়া প্রবাসী আলতাব খান ২০২৪ সালে পল্টন থানায় ১০৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তিনি সব অনিয়ম ও সিন্ডিকেটের শাস্তি দাবি করেছেন।
জানা গেছে, মালয়েশিয়ার সংসদীয় কমিটি তদন্ত করলেও বাংলাদেশে নবগঠিত জাতীয় সংসদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী
কমিটিতে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। তাছাড়া, বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্পর্কিত কেবিনেট কমিটিতেও বৈদেশিক কর্মসংস্থানে নিজ দেশের নাগরিক প্রেরণের প্রক্রিয়া, সমস্যা ও সমাধান নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি মর্মে জানা গেছে।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের ভূয়সী প্রশংসা মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য উপমন্ত্রীর
-6a0f247e3c177.jpg)
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বারবার এসব সমস্যার সমাধান করে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। তবে সীমিত সংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সি নির্ধারণের ১০ টি শর্ত মেনে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার নিকট প্রেরণ করেছে। তবে গত এপ্রিল মাসে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন এসব ইস্যু নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী, মানবসম্পদ মন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ফলপ্রসূ আলোচনার উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া শীঘ্রই কর্মী নিয়োগ শুরু করবে।
আইএলওর ফোরামেও এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। আলোচনার বিষয়ে আইএলওর সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার আসিফ আহমেদ তন্ময় সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা এক বিবৃতিতে বলেছেন, আলোচনাটি শুধু মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণ সম্পর্কে নয়; সার্বিকভাবে শ্রম অভিবাসনের একটি উন্নত শাসন ব্যবস্থা তৈরির জন্য মূল চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ আলোচনা করেছে।
তিনি বলেন, তার সংস্থা আশা করে যে, বিশদ প্রস্তাবটি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে ন্যায্য নিয়োগ, নিরাপদ অভিবাসন এবং শ্রম অভিবাসনের শাসনব্যবস্থা জোরদার করার জন্য ফলোআপ আলোচনা এবং সহযোগিতামূলক প্রচেষ্টায় অবদান রাখবে। আইএলও আলোচনায় প্রাপ্ত মতামত বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের নিকট তুলে ধরেছে কিনা, তা জানা যায়নি।