বাড়িতে পোষা বিড়াল থাকলে একটি দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। দুপুরে গরুর মাংস রান্না হয়েছে, পরিবারের সবাই খাচ্ছে, আর টেবিলের নিচে বসে আছে গোঁফওয়ালা ছোট্ট সদস্যটি। সে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন কয়েক মিনিট আগে থেকেই তার বিরুদ্ধে খাদ্য বঞ্চনার মামলা প্রস্তুত করছে। শেষে মায়া করে এক টুকরো বিফ তার প্লেটে চলে যায়। বিড়ালও মহা আনন্দে খেয়ে ফেলে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের কাছে সুস্বাদু এই খাবারটি কি বিড়ালের জন্যও সব সময় নিরাপদ?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিড়াল যেহেতু স্বাভাবিকভাবে মাংসাশী প্রাণী, তাই পরিমিত পরিমাণে এবং সঠিকভাবে প্রস্তুত করা গরুর মাংস তাদের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন আমরা নিজেদের জন্য রান্না করা মশলাদার, তেল-চর্বিযুক্ত বা অতিরিক্ত লবণ দেওয়া মাংস তাদের খাওয়াই।
বিশেষ করে পার্সিয়ান, র্যাগডল, ব্রিটিশ শর্টহেয়ার কিংবা মেইন কুনের মতো বিদেশি জাতের অনেক বিড়ালের পরিপাকতন্ত্র তুলনামূলক সংবেদনশীল হয়ে থাকে। ফলে অতিরিক্ত বিফ খাওয়ার পর তাদের কারও পেট খারাপ হতে পারে, কারও বমি শুরু হতে পারে, আবার কেউ কেউ অ্যালার্জির সমস্যায়ও ভুগতে পারে। এমনকি নিয়মিত বেশি পরিমাণে বিফ খেলে ওজন বেড়ে যাওয়া, হজমের সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ও লিভারের ওপর বাড়তি চাপও পড়তে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো চর্বি। আমরা যেসব গরুর মাংস খেতে পছন্দ করি, তার অনেক অংশেই বেশ ভালো পরিমাণে ফ্যাট থাকে। মানুষ হয়তো বলবে, “চর্বি না থাকলে স্বাদ কোথায়!” কিন্তু বিড়ালের শরীর সেই যুক্তি সব সময় মেনে নেয় না। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার তাদের অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, স্থূলতা এবং অন্যান্য বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অনেক মালিক আবার মনে করেন, বিড়াল যেহেতু বনে-জঙ্গলে শিকার করে খেত, তাই কাঁচা মাংসও নিশ্চয়ই ভালো। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। কাঁচা বিফে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া ও পরজীবী থাকতে পারে, যা বিড়ালকে অসুস্থ করার পাশাপাশি বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের জন্যও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আরেকটি বিষয় অনেকেই খেয়াল করেন না। মানুষের জন্য রান্না করা গরুর মাংসে সাধারণত পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ ও নানা ধরনের মসলা ব্যবহার করা হয়। এসব উপাদানের মধ্যে পেঁয়াজ ও রসুন বিড়ালের জন্য মোটেও নিরাপদ নয়। দীর্ঘদিন এমন খাবার খাওয়ানো হলে রক্তকণিকার ক্ষতি পর্যন্ত হতে পারে।
তাহলে কি বিড়ালকে কখনোই বিফ দেওয়া যাবে না? অবশ্যই যাবে। তবে সেটি হতে হবে পরিমিত পরিমাণে, ভালোভাবে সেদ্ধ বা রান্না করা, মসলাবিহীন এবং চর্বিমুক্ত। বিফকে মূল খাবার না বানিয়ে মাঝে মাঝে বিশেষ ট্রিট হিসেবে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো। বিড়ালের নিয়মিত খাদ্যতালিকায় তার বয়স ও শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত ক্যাট ফুড রাখা বেশি নিরাপদ।
বিফ খাওয়ার পর যদি আপনার বিড়াল অস্বাভাবিকভাবে অলস হয়ে যায়, বারবার বমি করে, ডায়রিয়ায় ভোগে অথবা খাবার খেতে না চায়, তাহলে দেরি না করে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে এক টুকরো মাংস দেওয়া দোষের কিছু নয়। তবে মনে রাখতে হবে, বিড়ালের ভালোবাসা পাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো তাকে তার শরীরের উপযোগী খাবার দেওয়া। কারণ আদরের পোষ্যকে খুশি করতে গিয়ে যদি সে-ই অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে সেই ভালোবাসার স্বাদ আর কারও কাছেই মধুর থাকে না।