মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর গত বছর এপ্রিল থেকে সারাবিশ্বে ৬০ থেকে ৭০টি দেশের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করার ফলে সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি আচমকাই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়। কারণ, বিশ্ব মোড়ল হিসাবে খ্যাত সবচেয়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি সারাবিশ্বকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাসন করছে। তার এই শুল্কনীতি বিভিন্ন দেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, যার মধ্যে আছে বাংলাদেশও। যেহেতু বাংলাদেশ এবছরই এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করবে বলে কথা রয়েছে এবং দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি বেসামাল আবস্থায়, এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুল্কনীতি গ্রহণ করার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভারসাম্য বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয় হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয বড় একক বাজার হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যা বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ১৮ শতাংশ।

দীর্ঘ ৯ মাসের আলোচনা ও দরকষাকষির পর বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি) স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর আরোপ করা বাড়তি শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়েছে। চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন বাজারে বাংলাদেশ ১ হাজার ৬৩৮ পণ্যের শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ, কৃষিজাত পণ্য, প্লাস্টিক, কাঠজাত পণ্যসহ অন্যান্য পণ্য। বিপরীতে বাংলাদেশে আমদানি করা ৬ হাজার ৭১০টি মার্কিন পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। এর মধ্যে অনেক পণ্যে শুল্ক ধাপে ধাপে হ্রাস পাবে, যা দেশের জন্য বিশেষভাবে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করবে। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যে কোনো ধরনের কোটা আরোপ করা যাবে না। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে যেসব অশুল্ক বাধা রয়েছে, সেগুলো দূর করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য যাতে প্রতিযোগিতায় পড়ে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে বাংলাদেশকে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে বাংলাদেশ। আমদানি হওয়া এসব পণ্য থেকে কাস্টমস শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক বাবদ বাংলাদেশ আদায় করেছে ৭৬২ কোটি টাকা। এর বাইরে মূল্য সংযোজন কর, অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম কর বাবদ আদায় করা হয় ১ হাজার ২২০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানিতে যা রাজস্ব আদায় হয় তার ৩৮ শতাংশ ছাড় দিতে হবে বাংলাদেশকে। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ সাড়ে তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানি করবে। এর মধ্যে থাকবে গম (পাঁচ বছর ধরে প্রতিবছর অন্তত ৭ লাখ টন), সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য (এক বছরে অন্তত ১২৫ কোটি ডলার বা ২৬ লাখ টন) এবং তুলা। সব মিলিয়ে বছরে আমদানি করা কৃষিপণ্যের মোট আনুমানিক মূল্য হবে সাড়ে তিন বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি ডলার। এতে বাংলাদেশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ঘাটতিতে পড়বে। শুধু তাই নয়, এই পণ্যগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধাও দিতে হবে। ফলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কোষাগার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং চারদিক থেকেই বাংলাদেশ ক্ষতির মুখে পড়ে যাচ্ছে। বড়ই পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও কৃষি পণ্য আমদানি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১২ জুন ২০২৫ তারিখে, একটি নন ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ পাল্টা শুল্ক থেকে বাঁচার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন করে কিছু পণ্য আমদানির কথা বলেছিল। উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। ইউএস সেনসাস ব্যুরোর হিসাবে, এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ২৫০ কোটি ডলার বেড়েছে। তার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বেড়েছে ১২৫ কোটি ডলারের মতো। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৮৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি হয়েছে ২২১ কোটি ডলারের পণ্য। এক বছরে বাণিজ্য-ঘাটতি ৬১৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশের পক্ষে। এই ঘাটতিটা কমানোর জন্য বাংলাদেশ গত জাতীয় বাজেটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানিযোগ্য বেশকিছু পণ্যে শুল্ক শূন্য করে দেয়। আরও কিছু পণ্যকে শুল্কমুক্ত তালিকায় যুক্ত করার চিন্তা করা হয়েছিল। বাংলাদেশ সাধারণত রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে গম আমদানি করে। এ দুই দেশের গম তুলনামূলক সস্তা হওয়া সত্ত্বেও টনপ্রতি ২০ থেকে ২৫ মার্কিন ডলার বেশি দামে যুক্তরাষ্ট্র থেকে গম আমদানি করা হচ্ছে। দেশটি থেকে গম আমদানিতে জাহাজ ভাড়াও বেশি। সান্ত¦নার কথা, যুক্তরাষ্ট্রের গমের খাদ্যমান বেশি। এ ছাড়া বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার পদক্ষেপ নিচ্ছে। দেশটি থেকে তুলা আমদানির প্রক্রিয়াও সহজ করছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি করতে হবে বাংলদেশকে।

২০০৫ সালে পহেলা জানুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে উন্নয়নশীল দেশের জন্য পোশাক রপ্তানি কোঠা উঠে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। আবার ২০১৩ সালে জিএসপি সুবিধা বাতিল হলে নতুন করে তৈরি হয় বাণিজ্য সংকট। সেই সংকটে বিভিন্নজন বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেন, বিশেষত রপ্তানিকারকরা আশঙ্কা করেন যে, পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কেটে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তার কারণে নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহ দেখাবে কিন্তু বাংলাদেশ দুটি সংকটমুহূর্তেই নিজেদের অবস্থানকে আরও শক্তভাবে ধরে রাখেন এবং ভিত্তিটা আরও মজবুত করেন। তাই মার্কিন শুল্কনীতিটা বাংলাদেশের জন্য একেবারে নতুন নয়।

বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কনীতিতে ব্যর্থ হয় তাহলে, বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারাবে। মার্কিনদের শর্ত পুরোপুরি মানলে ভারত ও চীন থেকে আমদানি-রপ্তানি কমে যাওয়ার ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য আরও জটিলতা ধারন করবে। সৃষ্ট এই জটিলতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একমাত্র বাজার, যার কাছ থেকে পণ্য কিনতে বাংলাদেশ বাধ্য হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মান ও দামÑ কোনোটাই বাছবিচার করার সুযোগ থাকছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য যদি ১০ টাকা হয়, আর সেই পণ্যই যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ১২ টাকায় বিক্রি করে, তবে তা যাচাই করার কোনো কার্যকর সুযোগ বাংলাদেশের হাতে নেই। এর ফলে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দেবে এবং পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রতিটি নাগরিকের ওপর। বিশেষত দারিদ্র্যশ্রেণির মানুষের ওপর এই প্রভাব আরও মারাত্মক হবে। যদিও বলা হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা তুলা দিয়ে পণ্য উৎপাদন করে আবার সেই পণ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করলে শুল্ক হবে শূন্য। কিন্তু এই সুবিধা বা প্রভাব হাতেগোনা কয়েকজনই ভোগ করবে এবং এর মধ্যে আছে নানাবিধ শর্ত। অন্যদিকে, কৃষিপণ্য, খাদ্যপণ্য এমনকি উড়োজাহাজ ক্রয়ের ক্ষেত্রেও অর্থ জোগান দিতে হবে জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত ভ্যাট ও করের টাকা দিয়ে। ফলে এই প্রক্রিয়ার সুফল সবাই ভোগ করতে না পারলেও, ক্ষতিকর প্রভাবটি সকলের ওপরই বর্তাবে।

তাই বাংলাদেশের নতুন সরকার এই জটিল সমীকরণ সহজেই মিলাবেন এই প্রত্যাশা সকলেরই। এই চুক্তির প্রাপ্তি ও এর পরিণতি নিয়ে যদি আলোচনা করার সুযোগ থাকে, তবে তা পুনরায় মূল্যায়ন করে দেখা যেতে পারে। কারণ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিÑ সবই এককভাবে বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। ব্যবসায়ীদেরও ভাবতে হবে বিশ্বের অন্য রাষ্ট্র কখনোই আমাদের মত এতো সস্তা শ্রম দিতে পারবে না। আমাদের দেশের হয়তো সাময়িক একটু অসুবিধা হবে, ভেঙ্গে পড়ার মতো কিছুই দেখছি না। মার্কিনীদেরও একটু সহনশীল হওয়া উচিত বাংলাদেশের প্রতি। কারণ, দেশটি এখনও অর্থনীতিতে স্বাবলম্বী নয়, দুর্বল ও উদীয়মান অর্থনীতির একটি দেশ, এই উদীয়মান অর্থনীতির দেশের ঘাড়ে খড়গ ঝুলিয়ে দিলে দেশটি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews