রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রাবিপ্রবি) স্থাপন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে আর্থিক অনিয়ম, ভুয়া বিল-ভাউচার, অতিমূল্যে ক্রয়, কমিশন বাণিজ্য এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কার্স দপ্তর এবং দ্বিতীয় সংশোধিত প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (পিডি) আবদুল গফুর। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলো বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন। অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের দশম সভায় বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে আবদুল গফুরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। সভার উপস্থিত সদস্যদের সম্মতিক্রমে তার বিরুদ্ধে আইসিটি-সংক্রান্ত অপরাধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড, প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্থিরতা সৃষ্টি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ আনা হয়। তবে পরে তিনি উচ্চ আদালতে আবেদন করলে হাইকোর্টের আদেশে ২ ফেব্রুয়ারি স্বপদে পুনর্বহাল হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আসবাবপত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে বাজারমূল্যের তুলনায় দুই থেকে তিনগুণ বেশি মূল্য দেখিয়ে বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকার একটি টেবিলের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এভাবে শুধু আসবাব ক্রয় খাতেই অন্তত ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সফরের নামে অর্থ উত্তোলন, ভবন নির্মাণ টেন্ডারে ঠিকাদারদের কাছ থেকে এক শতাংশ কমিশন গ্রহণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক নির্মাণের নামে ৩৭ লাখ টাকা এবং পরিকল্পিত বনায়নের নামে ৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।
রাবিপ্রবি স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্পের আওতায় একটি একাডেমিক ভবন, একটি প্রশাসনিক ভবন এবং ছাত্রছাত্রীদের জন্য পৃথক দুটি আবাসিক হল নির্মাণ কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব নির্মাণ কাজেও নানা অনিয়ম ও অর্থ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই পাহাড় কেটে নির্মাণ কাজ শুরুর অভিযোগও উঠেছে। এ ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলার অভিযুক্ত হন আবদুল গফুর। পরবর্তীতে হাইকোর্ট পাহাড় কাটায় নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকল্প পরিচালক আবদুল গফুর বলেন, প্রকল্পের তথ্য বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তিনি জানান, ২০১৩ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটির বর্তমান অনুমোদিত ব্যয় ১৬৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা হলেও এ পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ৮৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। অবশিষ্ট অর্থ এখনো ছাড় হয়নি। ফলে প্রকল্পের অর্থ লোপাটের অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়। তিনি আরও জানান, প্রকল্পে এর আগে তিনজন পরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দায়িত্বকালে প্রায় ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, যার মধ্যে ১০ কোটি টাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছে। বাকি অর্থ অভ্যন্তরীণ সড়ক, গ্যারেজ, ভূমি উন্নয়ন, মাস্টার প্ল্যান, ফটক নির্মাণ, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ক্রয় ও বনায়নসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় করা হয়েছে। অগ্রিম বিল উত্তোলনের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি আর্থিক বিধি অনুসরণ করে উপাচার্যের অনুমোদনক্রমে এসব অর্থ গ্রহণ ও পরবর্তীতে সমন্বয় করা হয়েছে। তার দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নের সব ব্যয় নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট মহলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।