সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁচি দিয়ে প্যাকেট কাটতে গিয়ে বিপাকে পড়লেন আদিব। কাঁচি দিয়ে সোজা করে কাটতে পারছেন না, বারবার মুচড়ে যাচ্ছে প্লাস্টিক বা সুতো। কম্পিউটারের মাউস ডান হাতে ধরলেও স্বস্তি নেই। আবার পরীক্ষার খাতায় লেখার সময় হাত ঘুরে কালির ওপর চলে গিয়ে লেখা লেপ্টে যাওয়ার ঘটনাও নতুন নয়।
আদিবের মতো বাঁহাতি মানুষদের কাছে এমন অভিজ্ঞতা খুবই পরিচিত। কারণ, চারপাশের বেশিরভাগ জিনিসপত্রই তৈরি করা হয়েছে ডানহাতিদের কথা মাথায় রেখে।
আজ ১৩ আগস্ট, আন্তর্জাতিক বাঁহাতি দিবস। বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ ডানহাতি হলেও বাকি প্রায় ১০ শতাংশ বাঁহাতি মানুষ নিজেদের স্বতন্ত্রতা নিয়ে আলাদা এক জগত তৈরি করেছেন।
১৯৭৬ সালের ১৩ আগস্ট ‘লেফটহ্যান্ডারস ইন্টারন্যাশনাল’ আন্তর্জাতিক বাঁহাতি দিবস পালনের উদ্যোগ নেয়। মূল লক্ষ্য ছিল ডানহাতি মানুষের উপযোগী করে তৈরি বিভিন্ন পণ্য ও ব্যবস্থাপনায় বাঁহাতিদের যেসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, সেগুলো তুলে ধরা।
কাঁচি, গিটার, চেয়ার-ডেস্ক থেকে শুরু করে কম্পিউটারের মাউস, নানা ধরনের দৈনন্দিন সরঞ্জাম ব্যবহারে বাঁহাতিদের অসুবিধার বিষয়টি এ দিবসের মাধ্যমে সামনে আনা হয়। একই সঙ্গে বাঁহাতি মানুষের বৈচিত্র্য ও স্বাতন্ত্র্য উদযাপনও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাঁহাতি হওয়া কোনো রোগ বা শারীরিক ত্রুটি নয়। এটি মানুষের স্বাভাবিক বৈচিত্র্যেরই একটি অংশ। জিনগত ও মস্তিষ্কের কার্যক্রমসহ বিভিন্ন বিষয় মানুষের কোন হাত বেশি ব্যবহার করবে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাঁহাতিদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের দুই অংশের কার্যক্রমের ধরন নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে বাঁহাতি হলেই একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই বেশি সৃজনশীল বা প্রতিভাবান হবেন, এমন সরল বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নেই।
তবে শিল্প, সংগীত ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে বাঁহাতিদের উপস্থিতি ইতিহাসে বেশ উল্লেখযোগ্য।
ক্রিকেট, টেনিস, বক্সিংসহ বিভিন্ন খেলায় বাঁহাতি খেলোয়াড়দের বিপক্ষে প্রতিপক্ষকে ভিন্ন কৌশল নিতে হয়। তাদের আক্রমণ বা বল করার কোণ ডানহাতি খেলোয়াড়দের তুলনায় আলাদা হওয়ায় অনেক সময় প্রতিপক্ষের জন্য তা বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
ক্রিকেটে বাঁহাতি ব্যাটার ও বোলারদের জন্য তাই আলাদা পরিকল্পনা করতে হয়। এ কারণে খেলাধুলায় বাঁহাতি খেলোয়াড়দের স্বাতন্ত্র্য বেশ স্পষ্ট।
বিশ্বের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল অনেক মানুষ বাঁহাতি হিসেবে পরিচিত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আলবার্ট আইনস্টাইন, আইজ্যাক নিউটন ও বিল গেটসের নাম উল্লেখ করা হয়। শিল্পকলায় ছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ও পাবলো পিকাসো।
রাজনীতিতে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও বাঁহাতি। খেলাধুলায় দিয়াগো ম্যারাডোনা, লিওনেল মেসি, ব্রায়ান লারা ও রাফায়েল নাদালের মতো তারকারাও বাঁহাতি হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের ক্রিকেটেও সাকিব আল হাসান ও মুস্তাফিজুর রহমান বাঁহাতি খেলোয়াড়দের অন্যতম পরিচিত মুখ।
একসময় বাঁহাতি শিশুদের ডান হাতে লিখতে বা খেতে বাধ্য করার ঘটনা ছিল অনেক বেশি। বাঁহাতি হওয়াকে অনেক সমাজে অস্বাভাবিকতা বা দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতো।
আধুনিক বিজ্ঞান ও শিক্ষা সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। বাঁহাতি হওয়া মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তাই এখন শিশুদের স্বাভাবিক হাত ব্যবহারে বাধা না দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাঁহাতিদের সুবিধার জন্য বর্তমানে বিশেষভাবে তৈরি কাঁচি, কিবোর্ড, গিটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জামও বাজারে পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক বাঁহাতি দিবস তাই শুধু বাঁহাতি মানুষের উদযাপনের দিন নয়। এটি মনে করিয়ে দেয়, মানুষের বৈচিত্র্যই পৃথিবীকে আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ করে। ডানহাতিদের জন্য তৈরি পৃথিবীতে বাঁহাতিরাও নিজেদের স্বাভাবিকতা ও দক্ষতা নিয়ে সমানভাবে এগিয়ে চলছেন।