২০০৮ সালের নির্বাচনের মতো ২০২৪ সালের নির্বাচনেও ভোট-পরবর্তী বিশেষ ‘মেকানিজম’ বা কারসাজি হয়েছে বলে দাবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও সাম্প্রতিক সময়ের আলোচিত টকশো ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির।

দৈনিক ইনকিলাব ডিজিটালকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ২০০৮ সালে যেমন নির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে ফলাফল নির্ধারণ করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই প্রক্রিয়ায় ‘লেজিটিমেট’ ভোটের ‘ইলিজিটিমেট’ ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে।

​জামায়াত সমর্থক এই আইনজীবী সম্প্রতি দৈনিক ইনকিলাবের সহকারী সম্পাদক মেহেদী হাসান পলাশকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নিয়োগ নিয়েও এক চাঞ্চল্যকর দাবি করেছেন তিনি দাবি করেছেন, আসিফ নজরুল শুরুতে উপদেষ্টা হিসেবে তালিকায় ছিলেন না; বরং অন্য যোগ্য ব্যক্তিদের প্রস্তাব করা হলেও তার বিশেষ ‘জেদ’ বা ‘গো’ ধরার কারণেই তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

​সাক্ষাৎকারে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির নিজেকে সেই সময়ের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দাবি করেন। তিনি জানান, আইন উপদেষ্টা পদের জন্য প্রাথমিকভাবে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল এবং হাসান আরিফের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। শাহরিয়ার কবিরের দাবি অনুযায়ী, তার নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেই এই দুই প্রবীণ আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল।

​তিনি বলেন, "ফিদা এম কামাল স্যার এই দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন এবং হাসান আরিফ সাহেবের নাম প্রস্তাব করেন। হাসান আরিফ সাহেব সম্মতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সন্ধ্যায় আসিফ নজরুল জেদ ধরলেন যে তিনিই আইন উপদেষ্টা হবেন।" শাহরিয়ার কবিরের মতে, আসিফ নজরুলের এই অনড় অবস্থানের কারণেই শেষ পর্যন্ত হাসান আরিফ বা ফিদা কামালের মতো প্রবীণদের পরিবর্তে তাকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

​সাক্ষাৎকারে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন এই আইনজীবী। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনের সাথে ২০২৪ সালের নির্বাচনের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তার মতে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে যেমন ভোট পরবর্তী ‘মেকানিজম’ ছিল, ২০২৪ সালেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।

​তিনি বলেন, ২০০৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া জানতেন যে তাকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং ফল কী হতে পারে। ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালেও নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই নির্দিষ্ট 'মেকানিজমের' মাধ্যমে সাজানো হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ব্যারিস্টার শাহরিয়ারের মতে, ২০০৮ সালেও ব্যালট বাক্স ছিনতাই বা সরাসরি কেন্দ্র দখলের চেয়ে নির্বাচনের ফলাফল গণনার সময় ম্যানিপুলেশন বা মেকানিজম বেশি কার্যকর ছিল।

সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ২০০৮ সালে বেগম খালেদা জিয়া জানতেন যে সেই নির্বাচনে তিনি জয়ী হবেন না। তবুও তিনি নির্বাচনে গিয়েছিলেন মূলত তার দুই ছেলে (তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো) কে বাঁচানোর জন্য এবং তাদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর সুযোগ করে দিতে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বেগম খালেদা জিয়া যখন নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন, ঠিক তারপরেই তার দুই ছেলেকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।

তিনি জানান যে, সেই সময় একটি মাইনাস-টু ফর্মুলা কাজ করছিল। সংস্কারপন্থী বা কিংস পার্টিকে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক দিয়ে দেওয়ার একটি ভয় ছিল। যদি বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে না যেতেন, তবে হয়তো তার দল ও প্রতীক অন্যের হাতে চলে যেত—এই আশঙ্কায় তিনি নির্বাচনে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।

ব্যারিস্টার কবিরের দাবি অনুযায়ী, সেই সময়কার পুরো পরিকল্পনাটি ছিল ভারতের ‘সাউথ ব্লক’-এর। তাকে অফার দেওয়া হয়েছিল যে ভারতের আধিপত্যবাদ মেনে নিলে এবং ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের ‘সেফ এক্সিট’ দিলে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনা হবে। কিন্তু খালেদা জিয়া ক্ষমতার চেয়ে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখেছিলেন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদ মেনে না নেওয়ার কারণেই তিনি বিরোধী দলে যাওয়া শ্রেয় মনে করেছিলেন।

তিনি বেগম খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং বলেন যে, ব্যক্তিগত স্যাক্রিফাইস (সন্তানদের বিষয়) থাকা সত্ত্বেও তিনি জাতীয় স্বার্থে ভারতীয় আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করেননি। এই কারণে তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তার গভীর সম্মানের কথা জানান।

সাক্ষাৎকারটিতে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির সংসদ নির্বাচন, গণভোট এবং বর্তমান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন যে, আসিফ নজরুল ১১ নভেম্বর বা ডিসেম্বরের দিকে (তার বক্তব্য অনুযায়ী) একই দিনে দুটি আলাদা আলাদা তফসিল ঘোষণা করেছিলেন—একটি গণভোটের জন্য এবং অন্যটি সংসদ নির্বাচনের জন্য। তার মতে, এই দুটি তফসিল চাইলে একটির মধ্যেই দেওয়া সম্ভব ছিল।

তিনি সংসদ নির্বাচনকে 'বৈধ নির্বাচনের অবৈধ ফলাফল' (ইলিজিটিমেট রেজাল্ট অফ আ লেজিটিমেট ইলেকশন) হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি দাবি করেন যে, নির্বাচনের মূল মেকানিজম বা ফলাফলের কারচুপি ভোট গণনার সময় করা হয়েছে। বর্তমান আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস এই নির্বাচন মেকানিজমের প্রক্রিয়ার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

তিনি বর্তমান সময়ের বিভিন্ন আইনি জটিলতা এবং অধ্যাদেশ সংক্রান্ত সমস্যার জন্য আসিফ নজরুলকে দায়ী করেছেন। তার মতে, আসিফ নজরুল এবং তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল যা যা করেছেন, জাতি এখন তার ফল ভোগ করছে।

​নিজের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির জানান, তিনি ছাত্র জীবনে ‘ছাত্র মৈত্রী’ এবং পরবর্তীকালে কিছুকাল ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত ছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি কোনো দলীয় রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নৈতিকভাবে সমর্থন করেন।

​কেন তিনি জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান সবথেকে স্পষ্ট।" তিনি আরও দাবি করেন যে, জামায়াতে ইসলামী একটি মধ্যমপন্থী দল এবং তারা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের তত্ত্বে বিশ্বাসী, যা তাদের লিবারেল ডেমোক্রেটিক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।

​ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির ১৯৭২ সালের সংবিধানের সমালোচনা করে বলেন, এই সংবিধান দেশের মানুষকে প্রকৃত স্বাধীনতা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে একটি মধ্যমপন্থী এবং আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। তিনি মনে করেন, আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষমতা নিজেদের হাতেই রাখতে হবে।

​শেখ হাসিনার পদত্যাগ পরবর্তী পরিস্থিতি এবং সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্পর্কেও তিনি ইতিবাচক মন্তব্য করেন। আসিফ নজরুলের কিছু মন্তব্যের বিরোধিতা করে তিনি বলেন, সেনাপ্রধান সেদিন দেশের মানুষের প্রাণ বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন। ৩ থেকে ৫ই আগস্টের সময়কার কঠিন পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর বিচক্ষণতা না থাকলে দেশে আরও বড় রক্তপাত হতে পারতো বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

​ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি দেশের বর্তমান আইনি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আইন উপদেষ্টার নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন নিয়ে তার দেওয়া তথ্যগুলো নতুন করে আলোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, "আসিফ নজরুল সাহেবকে জিজ্ঞাসা করবেন, শাহরিয়ার কবির যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে যে তার উপদেষ্টা হওয়ার কথা ছিল না, তিনি জেদ করে জোর করে হয়েছেন—তা সত্য কি না।"



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews