নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল রোধ, সিন্ডিকেট ভাঙতে, দুর্নীতি দমন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) দায়িত্ব পালনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতা বদলাতে বলেছেন তিনি। গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে চার দিনব্যাপী ‘জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন-২০২৬’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

সম্মেলন উদ্বোধনকালে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টামণ্ডলী, মন্ত্রী পরিষদ সচিব, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানরা, অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভাগীয় কমিশনাররা এবং জেলা প্রশাসকরা উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সকাল ১০টা ২০ মিনিটের দিকে বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিজ দপ্তর থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আসেন।

কর্মকর্তাদের উদ্দেশে পেশাদারিত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু পদোন্নতি কিংবা পছন্দের জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার মানসিকতাই জনপ্রশাসনকে দুর্নীতিপরায়ণ এবং অপেশাদার করে তোলার অন্যতম কারণ। পদোন্নতি বা পছন্দের পোস্টিংয়ের জন্য পেশাদারিত্বের সঙ্গে আপস করলে তা জনপ্রশাসনের দক্ষতা ও নিরপেক্ষতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। রাষ্ট্রের প্রয়োজনে যেকোনো সময় দেশের যেকোনো স্থানে কাজ করার মানসিকতা থাকতে হবে। সততা, মেধা ও দক্ষতাই হবে জনপ্রশাসনে নিয়োগ, বদলি কিংবা পদায়নের মূলনীতি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের প্রতি আমার বিশেষ আহ্বান, জনপ্রশাসনের প্রতিটি পদকে গুরুত্বপূর্ণ ও অনিবার্য ভাবুন। দেশের যেকোনো স্থানে, যেকোনো সময় জনপ্রশাসনের যেকোনো পদে দায়িত্ব পালনে নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখুন। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী জনপ্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, জনগণের সামনে প্রমাণিত হয়েছে, জনরায়ের প্রতিফলন ঘটে এমন সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা করা জনপ্রশাসনের পক্ষে সম্ভব। অপরদিকে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে প্রমাণিত হয়েছে জনপ্রশাসনের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনা না করাও সম্ভব। ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি জবাবদিহিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও জনকল্যাণমুখী শাসন ব্যবস্থার প্রত্যাশায় থাকা সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে বর্তমান সরকার। স্বাভাবিকভাবেই জনগণ সরকারের প্রতিটি কাজের মাধ্যমে তাদের আকাক্সক্ষার একটি বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চাইবে। আর বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকরাই জনগণের সঙ্গে সরকারের প্রধান সেতুবন্ধ। আপনাদের সততা, কর্মদক্ষতা ও দায়বদ্ধতার ওপর সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের সাফল্য পুরোটাই নির্ভর করছে। সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল বিভাজিত জনপ্রশাসন এবং অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে বর্তমান সরকারকে কাজ শুরু করতে হয়েছে। আপনাদের সহযোগিতায় সেই পরিস্থিতির অনেকখানি আমরা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছি এই আড়াই মাসে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দুর্নীতি ও লুটপাটের মহারাজত্ব কায়েম হয়েছিল। রাষ্ট্র ও জনগণকে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে ভয়ানক ঋণের ফাঁদে। অপরদিকে বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিও নতুন সরকারের সামনে একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে হয়তো এই মুহূর্তে পৃথিবীর কোনো দেশই রক্ষা পায়নি। বাংলাদেশও আক্রান্ত হয়েছে। তবে জনগণের ভোগান্তি না বাড়িয়ে আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করছি কীভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা যায়। আপনাদের সহযোগিতায় সেই চেষ্টা আমরা অব্যাহত রেখেছি। ঠিক এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই কিন্তু বর্তমান সরকার দেশের আবহমান কালের ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের আলোকে একটি ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকার দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন মান উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে।

ডিসিদের জনগণের সেবায় নিবেদিত থাকার আহ্বান রাষ্ট্রপতির : রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জেলা প্রশাসকদের জনগণের সেবায় আরও নিবেদিত হয়ে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরকারের প্রতিনিধি হলেও সর্বোপরি তারা জনগণের সেবক, বিষয়টি সবসময় মনে রাখতে হবে। গতকাল সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে জেলা প্রশাসক সম্মেলন-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান। রাষ্ট্রপতি মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতির জন্য চিরন্তন প্রেরণার উৎস। তিনি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমসহ জাতীয় নেতাদের অবদানও স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, জেলা প্রশাসক সম্মেলন সরকারের নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন।

 মাঠপর্যায়ের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে মতবিনিময়ের মাধ্যমে কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও সেবামুখী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। তিনি সরকারি কর্মসূচি ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি জেলা প্রশাসকদের সাধারণ মানুষের অভিযোগ শুনে দ্রুত সমাধান দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সহজ ও মানসম্মত সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

রাষ্ট্রপতি বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জ্বালানিসংকট মোকাবিলা, বাজার মনিটরিং জোরদার এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার ও অপচয় রোধের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, গুজব, অপতথ্য ও অনলাইন অপরাধ দমনে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করতে হবে।

রাষ্ট্রপতি ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, নারী ও শিশু সুরক্ষা, যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের সব স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক সৈয়দা নূরমহল আশরাফী এবং চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। পরে রাষ্ট্রপতি কয়েকটি ফটোসেশনে অংশ নেন। রাষ্ট্রপতি আশা প্রকাশ করেন, জেলা প্রশাসকরা তাদের মেধা ও নিষ্ঠা দিয়ে দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews