প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন দীর্ঘ প্রবাসজীবন কাটিয়ে দেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত স্বরণকালের বৃহৎ সমাবেশ ও সংবর্ধনা সভায় ১৬ মিনিট ব্যাপী ভাষণে জাতির উদেশ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ দিয়েছিলেন। এর মধ্যে একটি মেসেজ মানুষের মধ্যে সাড়া জাগিয়েছিল। সেটি হচ্ছে, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’। আমি যেহেতু একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, সেহেতু আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর উক্ত পরিকল্পনা কাজে লাগিয়ে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ বলতে একটিমাত্র পরিকল্পনাকে বুঝানো হয়নি, বরং বহুবিধ পরিকল্পনার সমন্বয়ে সামস্টিক অর্থে বুঝানো হয়েছে। বহুবিধ প্ল্যানের আওতায় যে কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে এর অন্যতম হচ্ছে, ১. ফ্যামিলি কার্ড, ২. কৃষকদের জন্য স্মর্ট কৃষক কার্ড, ৩. নিম্ন আয়ের লোকদের জন্য টিসিবি কার্ড, ৪. বয়স্কদের জন্য বয়স্কভাতা, ৫. মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ইত্যাদি। এসব ডিজিটাল আর্থিক সেবাসমূহ যদি আর্থিক অর্ন্তভুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্তকরণপূর্বক বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অনেক দ্রুত গতিশীল করা যাবে ফলশ্রুতিতে নিম্মোক্ত সুবিধাসমূহ অর্জন করা সম্ভব হবে। ১। ডিজিটালাইজেশন প্রয়োগ করার ফলে দুর্নীতি কমবে। ২। মানুষের আয় বাড়বে ফলে মোট দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ৩। আমদানির উপর চাপ কমবে। ৪। মানুষের সঞ্চয়ে উৎসাহ বাড়বে। ৫। বিনিয়োগ বাড়বে। ৬। অর্থনীতি দ্রুত উন্নত ও শক্তিশালী হবে। ৭। কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ৮। অর্থনীতি ডিজিটালাইজড হবে। ৯। প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে ভাতা পৌছাঁবে। ১০। বাস্তবায়ন সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়ন করা সম্ভব হবে। ১১। সম্পৃক্ত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে বহুবিধভাবে রুলিং হবে। ১২। সরকারের উপর জনগনের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। ১৩। সুবিধাভোগীরা নিরাপদে থাকবে। ১৪। সুবিধাভোগী নিজের অলসতা পিছনে রেখে নতুন কাজে উদ্যোগী হবে। ১৫। সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরী হবে। ১৬।আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্প খরচে আর্থিক সহায়তা পারে ইত্যাদি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি মানে, সবাইকে ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং, ঋণ, সঞ্চয়, বীমা ইত্যাদি অন্তর্ভূক্তিকে বুঝানো হচ্ছে। এটাই আধুনিক অর্থনীতির সবচেয়ে কার্যকর এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য সেবা পদ্ধতি।

প্রাথমিক করনীয় ঃ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষে একজন কার্ড হোল্ডারকে তার সুবিধামত নিকটস্থ ব্যাংকে হিসাব খুলতে হবে। হিসাব খোলার সময় ব্যাংকের প্রথানুযায়ী সংশ্লিস্ট সুবিধাভোগীর সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত যেমন কেওয়াইসি (নৌ ইউর কাস্টমার), ভোটার আইডি কার্ড, ছবি, তার আর্থিক/সামাজিক অবস্থা, লেনদেনের ইতিহাস, সততা, বিশ^স্ততা, ন্যায়পরায়ণতা ইত্যাদি যাচাই বাছাই করবে এবং যথা নিয়মে উহা সংগ্রহপূর্বক সংরক্ষণ করবে। সরকার এর পক্ষ থেকে প্রতি মাসে যে ভাতা দেয়া হবে, তা সুবিধাভোগীকে নগদ না দিয়ে তার সংশিষ্ট ব্যাংকের সঞ্চয় হিসাবে জমা হবে। সরকার কর্তৃক প্রতি মাসে যে ভাতা দেয়া হাবে, তা সুবিধারভোগীর জন্য নিঃসন্দেহে আর্থিক অনেক বড় সুবিধা। এই সুবিধা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে যদি বিতরণ করা হয় সেক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ে এর ভ্যালু যোগ হয়ে সুবিধাভোগীদেরকে আরও অধিকতর আর্থিক সুবিধা প্রদান করা সম্ভব হবে। এতে বিভিন্ন পর্যায়ে উৎপাদন বাড়বে, বেকারত্ব কমবে, আয় বাড়বে, সঞ্চয় বাড়বে,আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে ইত্যাদি। এ লক্ষ্যে আমার দীর্ঘ দিনের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা থেকে যে জ্ঞান অর্জন করেছি, সেই আলোকে কিছু পরামর্শ সংশিষ্টদের অবগতির জন্য উপস্থাপন করছি।
মডেল-১ ঃ সংগৃহীত তথ্য উপাত্ত যদি ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় সে ক্ষেত্রে ব্যাংক সংশ্লিস্ট সুবিধাভোগীর অবস্থানুযায়ী তার অনুকূলে মাসিক ভাতার বিপরীতে স্বল্প সুদে ৩/৬/৯/১২ গুণ ঋণ/অগ্রিম মঞ্জুর করা হবে। সুবিধাভোগী এ ঋণের অর্থ আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে (সেটা হতে পারে মৎস্য ও পশুপালন খামার, কৃষিপণ্য উৎপাদন, ক্ষুদ্র ব্যাবসা, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র যানবাহন, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি যা ব্যাংক কর্তৃক নির্দেশিত থাকবে) বিনিযোগ করবে যা ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। যে খাতের বীপরীতে ব্যাংক ঋণ দিবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যথানিয়মে তা তদারকি করবে। বিনিয়োগ হতে সুবিধাভোগী যে মুনাফা প্রাপ্ত হবে, তা সে ভোগ করতে পারে কিংবা ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারে। যদি বিনিয়োগকৃত মুনাফা হতে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয় সেক্ষেত্রে মাসিক যে ভাতা তার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে, তা ঋণ হিসাব সমন্বয় করা হবে না এবং ঐ জমাকৃত অর্থের বিপরীতে ব্যাংক নির্ধারিত হারে সুদ প্রদান করবে। এতে সুবিধাভোগীর অনুকূলে ফোর্স সঞ্চয় তৈরি হবে। আর যদি বিনিয়োগকৃত মুনাফা হতে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধ করা না হয় সেক্ষেত্রে মাসিক নির্ধারিত ভাতা ব্যাংক কিস্তি আদায় করবে। এক্ষেত্রে উৎপাদিতব্য পণ্য বা সেবা সামগ্রী সুবিধাভোগী নিজে ভোগ/ব্যবহার করবে, অতিরিক্ত বা বানিজ্যিকভাবে উৎপাদিত পন্য বা সেবা উন্মুক্তভাবে বিক্রি না করে প্রথমে শুধুমাত্র অপর কার্ড হোল্ডারদের কাছে বিক্রি বা বিনিময় প্রস্তাব করবে। যেক্ষেত্রে অতিরিক্ত পণ্য বা সেবা সামগ্রী কার্ড হোল্ডারদের কাছে বিক্রি করা সম্ভব না হলে অবশিষ্ট বা অবিক্রীত অতিরিক্ত পণ্য বা সেবাসামগ্রী কার্ড হোল্ডার উন্মুক্তভাবে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করবে। উদ্দেশ্য একটাই কার্ড হোল্ডারদেরকে সাংগঠনিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা যা আত্মউন্নয়ন এর জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

মডেল-২ ঃ সংগৃহীত তথ্য উপাত্ত যদি ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, সেক্ষেত্রে কার্ড হোল্ডারকারীগণ স্থানীয়ভাবে থানাভিত্তিক সকল কার্ড হোল্ডারগণের সমন্বয়ে একজন উদ্যোক্তা নির্বাচন করবে যিনি ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। এক্ষেত্রে একজন কার্ড হোল্ডার শুধুমাত্র একজনকে উদ্যোক্তা নির্বাচন করতে পারবে এবং সংশিষ্ট প্রত্যেক কার্ডহোল্ডার এই সংগঠনের দায়/সম্পদ সমানভাবে ভোগ করবে। প্রত্যেক সদস্যের তাদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কায়িক/মেধাশ্রম প্রয়োগ করার সুগোগ থাকবে এবং এর বিনিময়ে তারা দৈনিক/মাসিক ভিত্তিতে আর্থিক মজুরী/সম্মানী প্রাপ্য হবেন। এই সংগঠনের মোট সদস্যের মাসিক ভাতা গুণিতক করে যে টাকার অংক দাঁড়াইবে ব্যাংক এর বিপরীতে কেস টু কেস এর ভিত্তিতে তার ৩/৬/৯/১২ গুণ এই উদ্যোক্তার অনুকূলে ঋণ/অগ্রিম মঞ্জুর করবে। প্রত্যেক সদস্য এর গ্যারান্টর থাকবে এবং সকল সদস্যের মাসিক ভাতা উদ্যোক্তার ঋণের জামানত হিসেবে লিয়েন থাকবে। মঞ্জুরীকৃত ঋণের মাধ্যমে উদ্যোক্তা সকল সদস্যের সম্মতি নিয়ে আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ইত্যাদি বিভিন্ন খাতে (সেটা হতে পারে মৎস্য ও পশুপালন খামার, কৃষিপণ্য উৎপাদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র যানবাহন, বাজারজাতকরণ ইত্যাদি) বিনিযোগ করবে যা ব্যাংকের কাছে গ্রহনযোগ্য হতে হবে। যে খাতের বিপরীতে ব্যাংক ঋণ দিবে সেখাতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিয়মিত তদারকি করবে যাতে ঋণের অর্থ অন্যত্র সরানো বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে ভোগ করার সুযোগ না থাকে। বিনিযোগ হতে যে লাভ/ক্ষতি হবে তা সকল সদস্য সমানভাবে ভোগ/বহন করবে। বিনিয়োগ করা প্রকল্প হতে যে মুনাফা হবে, তা দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধিত করা যেতে পারে অথবা উক্ত মুনাফা প্রকল্পে পুনঃবিনিয়োগ করা যেতে পারে অথবা সদস্যদের মধ্যে বণ্টন করা হতে পারে। যদি মুনাফা হতে কিস্তি পরিশোধ করা হয়, সেক্ষেত্রে মাসিক যে ভাতা, কার্ড হোল্ডারদের ব্যাংক হিসাবে জমা হবে, তা হতে ঋণ হিসাব সমন্বয় করা হবে না এবং ঐ জমাকৃত অর্থের বিপরীতে ব্যাংক নির্ধারিত হারে সুদ প্রদান করবে। এতে সুবিধাভোগীর অনুকূলে ফোর্স সঞ্চয় তৈরি হবে। উল্লেখ্য, প্রকল্প থেকে উৎপাদিতব্য পণ্য বা সেবা সামগ্রী বিক্রির প্রয়োজন হলে তা প্রথমে সদস্যদের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নির্ধারিত হারে বিক্রির প্রস্তাব দিবে। অবশিষ্ট বা অবিক্রিত/অতিরিক্ত পণ্য বা সেবাসামগ্রী উদ্যোক্তা উন্মুক্তভাবে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করবে।

মডেল দুটির সুবিধাঃ ১। মানুষের আয় বাড়বে, ফলে দেশে মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ২। খাদ্য এবং নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, ফলে আমদানির উপর চাপ কমবে। ৩। মানুষের সঞ্চয়ে উৎসাহ বাড়বে। ৪। বিনিয়োগ বাড়বে। ৫। অর্থনীতি দ্রুত উন্নত এবং শক্তিশালী হবে। ৬। কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ৭। কার্ড হোল্ডারগণ অতিরিক্ত পণ্য/সেবা সামগ্রী নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করার ফলে সামগ্রিকভাবে স্বাবলম্বী হবে। ৮। এতে কার্ড হোল্ডারদের মধ্যে বৃহৎ জোট তৈরি হবে এবং এই জোট বড় উদ্যোক্তা গঠনে সহায়ক হবে। ৯। সম্পৃক্ত অর্থ অর্থনীতিতে বহুবিধভাবে রুলিং হবে। ১০। সুবিধাভোগী নিজের অলসতাকে পিছনে রেখে নতুন কাজে উদ্যোগী হবে। ১১। সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ১২। আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে স্বল্প খরচে আর্থিক সহায়তা পাবে। ১৩। কারিগরি এবং সাধারণ জ্ঞানের বিকাশ ঘটবে। ১৪। দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। ১৫। মানব সম্পদের উন্নয়ন হবে। ১৬। সমবায় গঠন করা সম্ভব হবে। ১৭। একটি অটোমেটিক ডাটাবেজ তৈরি হবে যা জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকৃত তথ্য প্রকাশে সমৃদ্ধ হবে। ১৮। নারীর ক্ষমতায়ন শক্তিশালী হবে। ১৯। প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা বাড়বে ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়বে। ২০। উৎপাদনশীল ও স্বনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে। ২১। ব্যাংকের ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে। ২২। ব্যাংক ঋণ/ কিস্তির টাকা আদায় নিরাপদ থাকবে। ২৩। ব্যাংক কর্তৃক স্থাবর সম্পত্তি জামানত নেয়ার প্রয়োজন হবে না, সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভাতাই জামানত হিসাবে গণ্য হবে।
লেখকঃ ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড সিইও (অবসরপ্রাপ্ত), রূপালী ব্যাংক পিএলসি.
ইমেইলঃ [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews