গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সকলেরই আশা ছিল, হাসিনার দেড় দশকের বেশি সময় ধরে প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের যেসব কাঠামো দলীয়করণের মাধ্যমে ভেঙে হাসিনা প্রশাসনে পরিণত করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার সেই রাষ্ট্র কাঠামো মেরামত করে প্রকৃত ও পেশাদার রাষ্ট্র কাঠামোতে পরিণত করতে সক্ষম হবে। এই রাষ্ট্র কাঠামো এবং এতে কর্মরতরা হবে, জনগণের সেবক। সরকার আসবে যাবে, রাষ্ট্রযন্ত্র তথা প্রশাসন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার এ কাজটি করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। প্রশাসনযন্ত্র সেই পুরণো কাঠামো ও নিয়মেই চলছে। কর্মরতরা দলবাজি, তেলবাজি, তোষামোদীর অপসংস্কৃতিতে রয়ে গেছে। আগামী জাতীয় সংষদ নির্বাচনের আর মাত্র ৩৩ দিনের মতো বাকি। অথচ প্রশাসন সেই পুরণো ধারা বজায় রেখে শিথিল হয়ে পড়েছে। সকল শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারিদের মধ্যে কাজের গতি কমে গেছে। সচিব থেকে শুরু করে প্রশাসনের সকলেই খোশগল্প করে সময় পার করছে। তারা নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রশাসনের যে নিয়মিত ও স্বাভাবিক কাজ সব ফেলে নির্বাচনে কে হারবে, কে জিতবে, কোন দল ক্ষমতায় আসবে, এ নিয়ে সিনিয়র-জুনিয়র আমলারা খোশগল্পে মেতে আছে। তারা কর্মস্থলে আসে এবং গুল্পগুজব করে বাসায় চলে যায়। অনেকে কোন দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা বেশি, তা অনুমান করে তদবিরবাজিতে নেমেছে। তদবির করে পদপদবি বাগিয়ে নেয়ার কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে, যাতে সেই দলের অনুগত হতে পারে। পুলিশ প্রশাসনেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রশাসনের কোনো সংস্থাই এখন কাজ করছে না।

নির্বাচন সামনে রেখে সবকাজ ফেলে আমলাদের ভবিষ্যতের সরকার আসার অপেক্ষার অপসংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। অথচ পুরনো এই অপসংস্কৃতি ভেঙে প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে নতুন বন্দোবস্ত করার প্রত্যয় নিয়েই গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এ কাজটি করবে, মানুষের মধ্যে এ প্রত্যাশা জন্মেছিল। শুধু তাই নয়, হাসিনা সরকার লুটপাট ও অর্থপাচার করে অর্থনীতিকে যে তলানিতে নিয়ে গিয়েছিল, সরকার তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করে মানুষের জীবনযাপনকে স্বস্তিদায়ক করবে, এ আশাও করেছিল। দৃশ্যত, সরকার এ কাজগুলো করতে সক্ষম হয়নি। বরং অর্থনীতি দিন দিন খারাপ হয়েছে। আমদানি-রফতানি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পোৎপাদনে স্থবিরতা, শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, বিনিয়োগ শূন্যতা, বেকারত্ব বৃদ্ধি, মানুষের আয় কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতিসহ অর্থনীতির সব সূচক নিম্নমুখী হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও নাজুক অবস্থায় রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো সক্ষম হয়ে উঠতে পারেনি। প্রশাসনও তথৈবচ অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় কর্মকর্তা-কর্মচারিরা আরও ঢিলা হয়ে গেছে। নিয়মিত রুটিন কাজ বাদ দিয়ে তারা গল্প করে অলস সময় পার করছে। জনসেবার লক্ষে গঠিত রাষ্ট্রের মূল চালিকা শক্তি প্রশাসন যদি স্থবির হয়ে পড়ে, তাহলে জনগণের দুর্ভোগ সীমাহীন হয়ে পড়ে। জনগণ এখন সেই দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। তাদের দুর্ভোগ নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেই। এর মূল কারণ হচ্ছে, পুরো প্রশাসন এখন রুটিন কাজ ফেলে নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ সচিব থেকে শুরু করে প্রশাসনের সবাই রাষ্ট্রের কর্মচারি, যেকোনো পরিস্থিতিতে জনগণের সেবা করাই তাদের একমাত্র কাজ। জনগণের কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তারা কী দুর্ভোগে আছে, সেদিকে খেয়াল রেখে তা নিরসনের উদ্যোগ নেয়া। আগামীতে কোন সরকার ক্ষমতায় আসবে, সেদিকে তাকিয়ে থাকা নয়। রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র এখন চরম গ্যাস সংকট চলছে। শীতকালীন শাক-সবজি থেকে শুরু করে সবধরনের পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। সাধারণ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এ ব্যাপারে সরকার ও প্রশাসন যেন নির্বিকার হয়ে রয়েছে। কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। অন্যদিকে, জনগণ কষ্টে থাকলেও তাদের ট্যাক্সের পয়সায় তারা ঠিকই নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। মাস শেষ না হতেই বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। কীভাবে আরও বেশি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়, এ নিয়ে ব্যস্ত। যে জনগণের সেবায় রাষ্ট্র তাদের নিয়োগ দিয়েছে, সেই জনগণের সেবায় তাদের কোনো মন নেই। নির্বাচন সামনে রেখে তারা এখন সব দায়িত্ব ফেলে রেখে গল্প করা নিয়ে ব্যস্ত। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নির্বাচনের অজুহাতে জনসেবা প্রদান কিংবা রুটিন কাজে শৈথিল্য প্রদর্শনের কোনো সুযোগ নেই। রুটিন কাজ না করে ফেলে রাখা একধরনের অপরাধ। রাষ্ট্রের কর্মচারীরা সরকারের স্থায়ী অংশ। কে ক্ষমতায় আছে বা কে আসবে, সেদিকে তাকিয়ে থাকা তাদের কাজ নয়। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে আমলাদের প্রায় সকলে কাজকর্ম ফেলে আগামী নির্বাচন নিয়ে খোশগল্পে মেতে আছে। আর ক্ষমতায় কোন দল আসতে পারে, তা অনুমান করে গুরুত্বপূর্ণ পদপদবি বাগিয়ে নেয়ার জন্য তদবিরে ব্যস্ত।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ইতিহাসের সেরা নির্বাচন করতে চান। সেটা তিনি করতে পারেন। তবে দেশের অর্থনীতিকে তিনি কি অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন, তা বিবেচ্য বিষয়। অর্থনীতিবিদরা ইতোমধ্যে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দেশের অর্থনীতি যে জায়গায় রেখে যাচ্ছেন, তা আগামী সরকারের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়াবে। একটি ভঙুর অর্থনীতির উপর দাঁড়িয়ে আগামী সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে। এর উপর রয়েছে, এ বছরই দেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হবে। দাতা সংস্থাসহ উন্নয়নসহযোগী দেশগুলো থেকে আমদানি-রফতানি বাণিজ্যসহ সহজ ঋণ সুবিধা পাওয়ার পথ কঠিন হবে। ভঙুর অর্থনীতির পক্ষে এ চাপ সহ্য করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। সার্বিক অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে কয়েক সপ্তাহ আগে দেশের সব ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘের উচ্চপ্রতিনিধিদের সাথে এক বৈঠকে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা আরও পাঁচ বছর পিছিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেছেন। এ থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কতটা শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উদ্যোগ ও পথ তৈরি করার জন্য যে শক্তিশালী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন এবং যারা এ কাজটি করবে, তারাই এখন অনেকটা শুয়েবসে সময় কাটাচ্ছে। বিষয়টি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, জনগণ গোল্লায় যাক, আমাদের সুযোগ-সুবিধার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না। মাস গেলে বেতন-ভাতা পেতে কোনো সমস্যা হয় না। কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এমন স্বার্থপর প্রবণতার প্রশাসন থাকলে, সে দেশের জনগণের দুর্ভোগ কোনোদিনই কমবে না। গণতান্ত্রিক দেশের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে, সরকার আসবে-যাবে, প্রশাসনে কর্মরতরা তাদের ওপর অর্পিত জনগণের সেবার মৌলিক দায়িত্ব যথারীতি পালন করে যাবে। অন্যদিকে, যারা ক্ষমতায় আসবে, জনগণকে দেয়া তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ করবে। দেখা যাচ্ছে, প্রশাসনে কর্মরতরা চিরায়ত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী জনগণের সেবার কাজ বাদ দিয়ে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের সুনজরে থাকার জন্য বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কে ক্ষমতায় আসবে এ নিয়ে গবেষণায় মেতে আছে। হাসিনার পতনের পর মানুষ যে আশা করেছিল, প্রশাসন কোনো দলীয় লেজুরবৃত্তির হবে না, হবে জনবান্ধব, সে আশা যে পূরণ হয়নি, তা বোঝা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের এ আকাক্সক্ষা পূরণে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews