ইতিহাস কেবল ধুলোপড়া নথিপত্র বা মৃত অতীতের কোনো হিমশীতল কঙ্কাল নয়। একটি জীবন্ত জাতির স্পন্দন, তার আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল তন্তুগুলো গাঁথা থাকে এই ইতিহাসের শরীরে। যখন কোনো জাতি তার রক্তাক্ত ও গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে স্মরণ করে, তখন সে মূলত ভবিষ্যতের জন্য একটি মানচিত্র আঁকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মানচিত্রটি কে আঁকবে? কার তুলিতে নির্ধারিত হবে কোন রংটি উজ্জ্বল থাকবে আর কোনটি মুছে যাবে চিরতরে? রাষ্ট্র যখন তার একক এবং নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই সামষ্টিক স্মৃতিকে নিজের মতো করে সাজাতে চায়, তখন তা আর নিছক আর্কাইভের বিষয় থাকে না। সম্প্রতি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা অনুষ্ঠানে আমরা ঠিক এমনই এক অনাকাক্সিক্ষত, অস্বস্তিকর অথচ সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের পরিবার ও আহত যোদ্ধাদের সম্মান জানানোর মতো একটি ভাবগম্ভীর মঞ্চ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ক্ষোভ, হট্টগোল আর প্রতিবাদে পরিণত হলো, তা আমাদের রাষ্ট্রকাঠামো, মনস্তত্ত্ব এবং ইতিহাস নির্মাণের রাজনীতি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সেই দিনটির দিকে একটু ফিরে তাকানো যাক। জুলাই-আগস্টের সেই অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থান, যার প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি স্লোগান এবং প্রতিটি আত্মদান এ দেশের মানুষের হৃদয়ে এখনো দগদগে ক্ষতের মতো জীবন্ত, তাকে উপজীব্য করেই নির্মিত হয়েছিল একটি প্রামাণ্যচিত্র। উপস্থিত দর্শকরা, যাদের অনেকেই সেই অভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ শিকার, যারা নিজেদের সন্তান, ভাই বা স্বজনকে হারিয়েছেন, তারা অপেক্ষা করছিলেন পর্দায় নিজেদের সেই পরম আরাধ্য ত্যাগের একটি নির্মোহ, সৎ এবং মহিমান্বিত প্রতিচ্ছবি দেখার জন্য। কিন্তু প্রামাণ্যচিত্রটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গোটা হলরুমে নেমে আসে এক ভয়াবহ অবিশ্বাস এবং তার পরপরই ফেটে পড়ে তীব্র ক্ষোভ। ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চারপাশ। শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি, চরম বিশৃঙ্খলা। মঞ্চের সামনে উপস্থিত বিদেশি অতিথিদের অনেকেই এই আকস্মিক হট্টগোলে দৃশ্যত বিব্রত বোধ করেন এবং কেউ কেউ নীরবতা পালন করে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। কেন এমন হলো? কারণ, দর্শকদের কাছে মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত এই ভিজ্যুয়াল দলিলে অত্যন্ত সুকৌশলে কিছু ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করা হয়েছে। যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে গোটা জাতি এক কাতারে এসে দাঁড়িয়েছিল, যে ৩ আগস্টের এক দফা ঘোষণা পুরো আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে পতন নিশ্চিত করেছিল এবং সর্বোপরি, যে তরুণের বুক পেতে দেওয়া আত্মদানÑ শহীদ আবু সাঈদের সেই আইকনিক দৃশ্য, গোটা দেশের ঘুমন্ত বিবেককে চাবুক মেরে জাগিয়ে তুলেছিল, তার সবকিছুই সেখানে রহস্যজনকভাবে অনুপস্থিত।
মনে রাখতে হবে, গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কোনো একক দলের নয়। এটি রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গৃহিণী থেকে শুরু করে দিনমজুরÑ সবার সম্মিলিত ত্যাগের ফসল। যখন তারা দেখে যে, তাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া, তাদের নিজেদের ঘামে-রক্তে লেখা ইতিহাসকে এত দ্রুত, এত নির্লজ্জভাবে অস্বীকার করা হয়েছে তখন তাদের পক্ষে চুপ করে থাকাটা কঠিন। এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ তাই কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, এটি একটি সচেতন প্রত্যাখ্যান। মানুষ রাষ্ট্রকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছে যে, ইতিহাসকে আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বদলে দেওয়া যাবে না।
অবশ্য, এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের যিনি শীর্ষ ব্যক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তার ভূমিকাটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছিলেন এবং অকপটে সবার সামনে স্বীকার করে নেন যে, প্রদর্শিত তথ্যচিত্রটিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তা সংশোধনের এবং বাদ পড়া বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। তার এই স্বীকারোক্তি এবং ত্বরিত পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে কিছুটা শান্ত করলেও, একটি মৌলিক এবং গভীরতর প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। রাষ্ট্রের এমন একটি সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে, বিদেশি কূটনীতিক এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রদর্শনের আগে, কীভাবে এত বড় ঐতিহাসিক বিকৃতি ঘটল? কারা এই বয়ান তৈরির নেপথ্যে কাজ করেছেন? তাদের রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক উদ্দেশ্য কী ছিল? রাষ্ট্রপ্রধানের নির্দেশনায় হয়তো একটি নির্দিষ্ট প্রামাণ্যচিত্র সংশোধিত হবে, কিন্তু যে বলয়টি এই ধরনের বিকৃত বয়ান উৎপাদনের সাহস দেখিয়েছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে কি না, তা নিয়ে ঘোর সংশয় রয়েই যায়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও গভীরভাবে বুঝতে হলে আমাদের সমাজবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক আলোচনার দ্বারস্থ হতে হবে। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী মরিস হালবাখস তার ‘কালেক্টিভ মেমোরি’ বা সামষ্টিক স্মৃতি তত্ত্বে দেখিয়েছেন যে, কোনো জাতির স্মৃতি কখনো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক বা নিরপেক্ষভাবে গড়ে ওঠে না। এটি অত্যন্ত জটিল সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। যে গোষ্ঠী বা শ্রেণি রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে, তারাই নির্ধারণ করে দেয় কোন ঘটনাটি মানুষ মনে রাখবে আর কোনটি ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে। পাঠ্যপুস্তকের পাতায় কার নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকবে, রাষ্ট্রীয় আর্কাইভে কোন ছবিটি সযতেœ সংরক্ষিত হবে, আর কোন নামটি মুছে ফেলার জন্য সব ধরনের রাষ্ট্রীয় কলকব্জা ব্যবহার করা হবেÑ এ সবই মূলত একটি আধিপত্য বিস্তারের খেলা। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত যেকোনো প্রামাণ্যচিত্র বা আর্কাইভ আসলে সেই আধিপত্যশীল শ্রেণির বয়ান প্রতিষ্ঠারই একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু আধুনিক যুগে, যখন তথ্যের প্রবাহ অবারিত এবং সাধারণ মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অজস্র ভিজ্যুয়াল প্রমাণ সংরক্ষিত আছে, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে পুরনো কায়দায় ইতিহাস মুছে ফেলা বা নতুন করে লেখা আর সম্ভব নয়। মানুষের জীবন্ত স্মৃতি যখন রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া মেকি স্মৃতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, তখনই তৈরি হয় বিস্ফোরণ। সম্মেলন কেন্দ্রের হট্টগোল মূলত সেই স্মৃতি-লড়াইয়েরই একটি দৃশ্যমান রূপ।
এই ঘটনার পর সুশীল সমাজের একাংশ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন যে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্রমশ অসভ্য এবং অসহিষ্ণু হয়ে যাচ্ছে। তাদের মতে, মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তা প্রকাশের একটা শালীন ভাষা বা পদ্ধতি থাকা উচিত। বিদেশি অতিথিদের সামনে এমন ধাক্কাধাক্কি বা স্লোগান রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করেছে বলে তারা মনে করেন। আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তিটি অত্যন্ত মার্জিত এবং গ্রহণযোগ্য মনে হলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গভীরতর বিশ্লেষণ আমাদের ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি, শালীনতা বা ভদ্রতা তখনই কাজ করে, যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণ মানুষের কথা শুনতে প্রস্তুত থাকে। যখন একটি সমাজ তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে অনুধাবন করে যে, নিয়মতান্ত্রিক পথে হেঁটে, চিঠি লিখে, সংবাদ সম্মেলন করে বা টেবিলে বসে আলোচনা করে তাদের যৌক্তিক আপত্তির কোনো সুরাহা হবে না, তখন তারা বাধ্য হয়েই এমন পথ বেছে নেয়, যা সরাসরি দৃশ্যমান এবং যা দ্রুততম সময়ে নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম।
এই ধরনের প্রকাশ্য এবং উচ্চকিত প্রতিবাদ আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন উচ্ছৃঙ্খলতা নয়। হট্টগোল বা চিৎকার করা অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবাদের মূল লক্ষ্য নয়, বরং এটি একটি অবরুদ্ধ সমাজে মূল বার্তাটি পৌঁছে দেওয়ার একটি মরিয়া মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। এটি প্রাতিষ্ঠানিক বধিরতার একটি বড় প্রমাণ। যখন রাষ্ট্রের শোনার কান বন্ধ হয়ে যায়, যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোÑ যেমন সংসদ, গণমাধ্যম বা বিচারব্যবস্থা, তাদের স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সাধারণ মানুষকে চিৎকার করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে হয়। মিলনায়তনের সেই ধাক্কাধাক্কি মূলত মানুষের সেই অবদমিত হতাশারই বহিঃপ্রকাশ, যেখানে তারা মনে করেছে যে, এখনই তীব্র এবং দৃশ্যমান প্রতিবাদ না জানালে এই বিকৃত ইতিহাসই একদিন চিরস্থায়ী রাষ্ট্রীয় সত্যে পরিণত হবে। তারা কেবল একটি প্রামাণ্যচিত্রের বিরোধিতা করেনি, তারা মূলত সেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিরোধিতা করেছে, যা সত্যকে গিলে খেয়ে একটি মিথ্যা বয়ানকে তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল।
পরিশেষে একথা বলা অত্যন্ত জরুরি যে, ইতিহাসের গতিপথকে জোর করে পাল্টে দেওয়ার চেষ্টা সবসময়ই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। সত্য কখনো চিরকাল চাপা থাকে না। আজকের এই ডিজিটাল যুগে, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের হাতে তথ্য যাচাই করার সুযোগ রয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বয়ান প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা কেবল বোকামিই নয়, এটি একটি আত্মঘাতী প্রবণতা। গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। এই ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠা সাধারণ মানুষের রক্তে লেখা। একে যদি সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়, তবে তা কেবল বীর শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবমাননাই হবে না, বরং ভবিষ্যতের প্রজন্মের কাছে রাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে। অতএব, গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস যখন সরকারিভাবে তুলে ধরা হবে, তখন তা সঠিকভাবে তুলে ধরতে হবে; কোনো অবস্থাতেই ইতিহাসের কোনো অধ্যায় বিকৃত বা মুছে ফেলা যাবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintuanowar.com



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews