আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। গত ১০ বছরে ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে) এর পরিমাণ ৮ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। প্রতিবছর গড়ে ৬৮৩ কোটি ডলারের বেশি পাচার হয়।
গত বৃহস্পতিবার এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে জিএফআই। সেখানে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের এই চিত্র উঠে আসে। এতে জানানো হয়, এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অর্থ পাচার হওয়া ১০টি দেশের একটি হলো বাংলাদেশ। মূলত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে অর্থ পাচারের কৌশলকে এখানে তুলে আনা হয়েছে। জিএফআই প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন জানিয়েছে, গত এক দশকে শুল্ক ফাঁকি এবং পণ্যের মূল্যে মিথ্যা ঘোষণার (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং) মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশের বাজারে চলে গেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের পুঞ্জীভূত বাণিজ্য ‘ভ্যালু গ্যাপ’ এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলারে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতি নিয়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রতিবেদন দিয়েছিল। তাতে বলা হয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। ওই সময়ের বাজারদরে (প্রতি ডলারের দাম ১২০ টাকা) এর পরিমাণ ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আর্থিক খাতের রাঘববোয়াল (ক্রীড়নক), আমলা ও মধ্যস্বত্বভোগীরা এই পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন।
বাণিজ্যিক তথ্য বিশ্লেষণ করে জিএফআই বলছে, বাংলাদেশের এ অবৈধ অর্থপ্রবাহের একটি বড় অংশই সম্পন্ন হচ্ছে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের মাধ্যমে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে অর্থপাচারের ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে আমদানির ব্যয় বাড়িয়ে দেখিয়ে (ওভার-ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানি আয় কমিয়ে প্রদর্শন করে (আন্ডার-ইনভয়েসিং) দেশ থেকে ডলার সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।
সংস্থাটির তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই এ ধরনের অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেনদেনের শিকার, যা সরাসরি দেশের কর রাজস্ব এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাণিজ্য মূল্যের এই বিশাল ব্যবধানের দিক থেকে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।
জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৬৮৩ কোটি ডলার পাচার হয়, যা মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান। যার বড় অংশই বাণিজ্যের মূল্য কারসাজির (মিথ্যা ঘোষণা) মাধ্যমে হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট পাচার হওয়া অর্থের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ২৮০ কোটি ডলার উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোয় গেছে। বাংলাদেশ বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের ঝুঁকি বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের অর্থ পাচার উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য বড় বাধা। এতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ দুর্বল হয়, কর রাজস্ব কমে যায় এবং জনসেবা ও অবকাঠামো বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংকুচিত হয়।
জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুসারে, বড় অর্থনীতির দেশগুলোর বাণিজ্য বেশি হওয়ায় সেখানে অবৈধ অর্থের প্রবাহ বা পাচার বেশি দেখা যায়। যেমন এক দশকে চীনে ৬.৯৬ ট্রিলিয়ন ডলার, থাইল্যান্ডে ১.১৮ ট্রিলিয়ন ও ভারতে ১.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার। মোট বাণিজ্যের বার্ষিক হিসাবে চীনের প্রায় ২৫ শতাংশ ও ভারতের প্রায় ২২ শতাংশ এভাবে অর্থ পাচার হয়।
পাচার ঠেকাতে শুল্ক ব্যবস্থাপনা জোরদার, আঞ্চলিক চুক্তির মাধ্যমে তথ্য বিনিময় বৃদ্ধি, মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে স্বচ্ছতা বাড়ানো ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের সুপারিশ করেছে জিএফআই।