টানা ১২ দিন ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টা জবাব দিচ্ছে ইরানও। ছোট ছোট কিন্তু নিখুঁত হামলা চালিয়ে ইরান ক্ষতিসাধন করছে মার্কিন স্বার্থের। এতে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ইরান কি নিজের সক্ষমতায় হামলা চালাচ্ছে? নাকি এর পেছনে হাত আছে অন্য কোন পরাশক্তির? মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধে সন্মুখ সারিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র থাকলেও পেছনে রয়েছে আরো অনেক পক্ষই। ইরানকে সহযোগিতা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে।
বিশেষত উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র স্থাপনাগুলোতে ইরানের ড্রোন হামলায় রাশিয়া কোনো ধরনের লক্ষ্যবস্তুর তথ্য বা উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা। সিআইএ স্থাপনায় হামলার ক্ষেত্রে রাশিয়ার সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি বলে জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চারজন ব্যক্তি জানিয়েছেন। তবে হামলার কার্যকারিতা, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ এবং ইরানকে রাশিয়ার সার্বিক কারিগরি সহায়তার কারণে এই সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সাধারণভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন অবকাঠামোতে ইরানের হামলার ক্ষেত্রে রাশিয়া লক্ষ্যবস্তুর তথ্যসহ অন্যান্য সহায়তা দিয়েছে বলে এর আগে রয়টার্স ও অন্যান্য গণমাধ্যমে খবর এসেছে এবং মার্কিন কর্মকর্তারাও তা স্বীকার করেছেন। তবে সিআইএ স্থাপনায় হামলায় রাশিয়ার সহায়তার বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা সম্প্রদায়ের অনুসন্ধানের খবর এবারই প্রথম প্রকাশ পেল।
গত মার্চে অন্তত দুটি সিআইএ স্থাপনায় হামলা চালানো হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর একটি ছিল সৌদি আরবের রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসে অবস্থিত সিআইএ স্টেশন এবং অপরটি পূর্ব ইরাকে অবস্থিত। কিছু সূত্র জানিয়েছে যে আরও কয়েকটি সিআইএ স্থাপনা আক্রান্ত হয়েছে, তবে বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। একটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপির বরাতে অঞ্চলের একজন কর্মকর্তা জানান, আঞ্চলিক সিআইএ স্থাপনাগুলোকে চিহ্নিত করার কাজে রাশিয়া সম্ভবত ভূমিকা রেখেছিল। গোয়েন্দা প্রতিবেদন সম্পর্কে অবহিত উপসাগরীয় অঞ্চলের দুজন পশ্চিমা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রিয়াদের হামলায় রাশিয়া কর্তৃক উন্নত করা ইরানের ‘শাহেদ’ ড্রোনের দুটি সংস্করণ ব্যবহার করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। একটি ড্রোন দূতাবাসের বাইরের স্পর্শকাতর অংশে ছিদ্র করে এবং দ্বিতীয়টি সেই ছিদ্র দিয়ে ভেতরে ঢুকে বিস্ফোরিত হয়।
এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ইরানকে রাশিয়ার সহায়তা পুরোনো হলেও, স্পর্শকাতর সিআইএ স্থাপনাকে টার্গেট করা এটিই নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরান যুদ্ধ শেষ করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন ওয়াশিংটনের কার্যক্রম ব্যাহত করতে মস্কো আরও গভীরে যেতে প্রস্তুত। চলতি সপ্তাহে জর্ডানের মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই সেনা নিহতের পর ইরানকে রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুর তথ্য দেয়ার উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। হোয়াইট হাউস এ বিষয়ে মন্তব্যের আবেদন সিআইএ-র কাছে পাঠালেও সিআইএ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। জাতিসংঘে ইরানের মিশন, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সৌদি সরকারও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। আঞ্চলিক দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা জানান, রাশিয়া ইরানকে তাদের শাহেদ ড্রোন টার্গেটে পৌঁছানোর ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। আরেকটি সূত্র জানায়, রাশিয়া ইরানকে ‘কোমেটা-এম’ নামক স্যাটেলাইট (উপগ্রহ) নেভিগেশন সিস্টেম সরবরাহ করে শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। যা ইরানের নিজস্ব প্রযুক্তির চেয়ে অনেক বেশি নিখুঁত এবং জ্যাম করে আটকে দেয়া কঠিন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল গত মার্চে প্রথম কোমেটা-এম সরবরাহের খবর প্রকাশ করলেও ক্রেমলিন তা ভুয়া খবর বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল। বিদেশে সিআইএ-র স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে প্রধান কার্যালয় থাকে, যেগুলোকে ‘স্টেশন’ বলা হয়। এছাড়া সিআইএ নিরাপদ বাড়ি, লজিস্টিক হাব এবং নজরদারি কেন্দ্র পরিচালনা করে, যেগুলোর অবস্থান কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়। আক্রান্ত স্থাপনার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে একটি সূত্র বলেছে, সংখ্যাটি একের বেশি কিন্তু বারোটির কম। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা খতিয়ে দেখছেন যে রিয়াদ দূতাবাসে হামলার জন্য ইরান রাশিয়ার তথ্যের ওপর নির্ভর করেছিল কি না।
তবে এ নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। কেউ কেউ সতর্ক করে বলেছেন যে ইরান হয়তো সামগ্রিকভাবে মার্কিন দূতাবাসকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছিল এবং দুর্ঘটনাবশত তা সিআইএ স্টেশনে গিয়ে আঘাত করে। আবার কিছু বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এত স্পর্শকাতর তথ্য সংগ্রহ করার সামর্থ্য ও আগ্রহ রাশিয়া ছাড়া খুব কম দেশেরই রয়েছে। সিআইএ-র সাবেক স্টেশন প্রধান ও আন্ডারকভার অপারেশন অফিসার ড্যানিয়েল হফম্যান বলেন, রাশিয়া ও ইরানের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারিত্বের কারণে সিআইএ স্থাপনায় হামলায় মস্কোর সাহায্য করাটা মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। তারা উভয়ই নিজ নিজ প্রভাবের অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানো বা পুরোপুরি নির্মূল করার বিষয়ে একই স্বার্থ বহন করে।