মানুষ সাধারণত বিপদে পড়ে, যখন তার যাওয়ার জায়গা থাকে না। আমার যাওয়ার জায়গা থাকলেও আমি যেতে পারছি না। কারণ, ডানে গেলেও বিপদ, বাঁয়ে গেলেও বিপদ। মাঝখান দিয়ে বিকল্প কোনো রাস্তা দেখছি না। বলছিলাম স্কারবরো সাউথওয়েস্টের আসন্ন প্রাদেশিক উপনির্বাচনের কথা।

একসময় এই আসনে আমাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া বেশ সহজ ছিল। প্রার্থী ছিলেন ডলি বেগম। তিনি যখন এনডিপি করতেন, আমরা তাঁকে ভোট দিয়ে প্রাদেশিক পার্লামেন্টে পাঠিয়েছি। পরে তিনি লিবারেল পার্টিতে গিয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাচনে দাঁড়ালেন, সেখানেও আমরা তাঁকে ভোট দিয়ে পার্লামেন্টে পাঠিয়েছি। তখন দল নিয়ে আমাদের মাথাব্যথা ছিল না। এনডিপির রং কমলা, লিবারেলের রং লাল, এসব রঙের হিসাব করার সময়ও ছিল না। আমাদের কাছে প্রার্থী ছিলেন ডলি বেগম। আমরা একজন সাহসী বাঙালি কন্যার জয় দেখতে চেয়েছিলাম। ফলে দল বদলালেও ভোটারের ভালোবাসার ঠিকানা খুব একটা বদলায়নি।

কিন্তু এবারের পরিস্থিতি একেবারে অন্য রকম। লিবারেল পার্টির মনোনয়ন জিতে মাঠে এসেছেন তরুণ ব্যবসায়ী আহসানুল হাফিজ। অন্যদিকে প্রগ্রেসিভ কনজারভেটিভ পার্টির মনোনয়ন জিতে এসেছেন ডা. নূর তরুণ। দুজনই পরিচিত, দুজনই সজ্জন এবং দুজনই কমিউনিটির জন্য কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। দুজনই কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়েছেন।

কমিউনিটি সেন্টারের স্বপ্ন অবশ্য আমাদের নতুন নয়। বিগত বছরগুলোতে ডজন ডজন বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা সেই স্বপ্ন দেখিয়েছেন। স্বপ্ন দেখতে দেখতে এখন গোটা টরন্টোকেই বাংলাদেশিদের কমিউনিটি সেন্টার বলে মনে হয়। রাস্তায় হাঁটলে মনে হয় নিজেদের রাস্তা, তাই হাতের টিস্যু যেখানে সেখানে ফেলে দিই। পার্কে গেলে মনে হয় নিজেদের উঠান, তাই পানির বোতল আর চায়ের কাপ ঘাসের ওপর ছুঁড়ে ফেলি। পার্কিং লটে গেলে মনে হয় পৈতৃক সম্পত্তি, তাই গাড়িটি যেভাবে ইচ্ছা রেখে নিশ্চিন্তে কেনাকাটা করি। ড্যানফোর্থে ফুটপাতে জট পাকিয়ে আমরা এমন আড্ডা দিই, যেন পথচারীরাই সেখানে অনধিকার প্রবেশ করেছে। গোটা শহরকে যখন আমরা এভাবে আপন করে নিয়েছি, তখন আলাদা একটি কমিউনিটি সেন্টার দিয়ে আর কী করব?

যাক, বলছিলাম উপনির্বাচনে আমার বিপদের কথা। আজকাল ঘর থেকে বের হতেও ভয় হচ্ছে। কারও নির্বাচনী অফিসে গিয়ে যে শুধু ‘হ্যালো’ বলব, সে উপায় নেই। দুর্জনেরা বসে আছেন সেই হ্যালোর রাজনৈতিক অনুবাদ করার জন্য। কারও সম্পর্কে যে দুটি ভালো কথা লিখব, তাতেও রক্ষা নেই। গবেষণা করে সেই লেখার নেপথ্যের রহস্য আবিষ্কার করার লোকও এ কমিউনিটিতে অনেক আছেন।

অবশ্য, বাংলাদেশি কমিউনিটির কোনো সংগঠন হলে সমস্যাটির সহজ সমাধান ছিল। একজনকে চেয়ারম্যান, অন্যজনকে সভাপতি করা যেত। প্রয়োজন হলে একজন হতেন প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, অন্যজন কার্যকরী সভাপতি। তাতেও আপত্তি উঠলে একজনকে প্রধান উপদেষ্টা এবং অন্যজনকে আহ্বায়ক বানানো যেত। আমাদের কমিউনিটিতে নতুন পদ সৃষ্টি করতে গঠনতন্ত্র সংশোধন করতে হয় না। পদটির নাম মুখে উচ্চারণ করতে যতটুকু সময় লাগে, সেটুকুই যথেষ্ট।

একবার একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখেছিলাম, একই আয়োজনের দুজন কনভেনর। কৌতূহলী হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, দুজন কনভেনর কেন? তিনি নির্বিকারভাবে বলেছিলেন, ‘অসুবিধা কী?’ সেদিন তাঁর উত্তর শুনে অবাক হলেও মুগ্ধ হয়েছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, সেই মহৎ উদারতা কানাডার নির্বাচনব্যবস্থায় নেই। এখানে দুজন প্রার্থী থাকতে পারেন, দুজনের পোস্টার পাশাপাশি ঝুলতে পারে, দুজন একই বাজারে গিয়ে একই ভোটারের সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন, কিন্তু নির্বাচনের রাতে দুজনকে বিজয়ী ঘোষণা করার ব্যবস্থা নেই। গণতন্ত্র অনেক কিছু দিয়েছে, কিন্তু এক আসনে দুই এমপিপি দেওয়ার মতো উদারতা এখনো দেখাতে পারেনি।

আমাদের কমিউনিটিতে ভোট গোপন রাখা মোটেই সহজ নয়। ফেসবুকে ছবি দেখে মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে কে কাকে সমর্থন করছেন। দুজন প্রার্থীর সঙ্গে আলাদাভাবে ছবি তোলাও নিরাপদ নয়। কার ছবিতে কে হাসিমুখে, কার কাঁধ ঘেষে কে দাঁড়ালো, কার সঙ্গে হাত মেলানোর সময় চোখে বেশি উজ্জ্বলতা ছিল, ফেসবুকের রাজনৈতিক গোয়েন্দারা সব বিশ্লেষণ করে ফেলবেন। একটি সাধারণ ছবির রাজনৈতিক ময়নাতদন্ত করতে তাঁদের কয়েক মিনিটের বেশি সময় লাগে না।

আমাদের আবেগের আরেকটি দিকও আছে। বহু বছর ধরে আমরা বলে এসেছি, মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। এখন প্রতিনিধিত্ব বাড়তে বাড়তে একই আসনে দুই শক্তিশালী বাংলাদেশি প্রার্থী এসে দাঁড়িয়েছেন। এত দিন আমাদের দুঃখ ছিল, বাংলাদেশি প্রার্থী নেই। এবার বিপদ হলো, প্রার্থী বেশি!

তারপরও ভোট তো একজনকেই দিতে হবে। ব্যালট হাতে নিয়ে কলমটি নিশ্চয়ই কাঁপবে। মনে হবে, একটি ঘরে টিক দিলে অন্য ঘরের পরিচিত মানুষটির প্রতি অন্যায় হয়ে যাচ্ছে। তখন দলীয় নীতি, প্রার্থীর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, জনসেবার অতীত, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং এলাকার প্রয়োজনও বিচার করতে হবে। আবেগ দিয়ে দুজনকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু ব্যালট পেপার আবেগ বোঝে না। সে নির্মমভাবে একটিমাত্র চিহ্ন দাবি করে।

সাধারণত আমি অন্যদের পরামর্শ দিয়ে বেড়াই। কিন্তু আজ নিজের বেলায় এসে সব জ্ঞান যেন ছুটিতে চলে গেছে। তাই এবার আমি আপনাদের পরামর্শ চাইছি। বলুন, কী করা যায়?



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews