ইরানের ভূপ্রকৃতি এখন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে স্থল অভিযানের হুঁশিয়ারি দেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের দুই বিশাল পর্বতমালা, সুবিস্তৃত মরুভূমি এবং দুই প্রান্তের সমুদ্র দেশটির জন্য এক অজেয় ঢাল হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইরানের বৈচিত্র্যময় ভূগোল যেকোনো আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য যমদূত হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে নৌযান চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন এই পথ পুনরায় উন্মুক্ত করার জন্য সামরিক চাপ বৃদ্ধির পরিকল্পনা করলেও সমরবিদরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, এই সংকীর্ণ জলপথে যেকোনো ভুল পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিতে ধস নামাতে পারে।

স্থলপথে ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশটির বিশাল আয়তন এবং দুর্ভেদ্য পাহাড়ী এলাকা। ইরানের উত্তর-দক্ষিণ জুড়ে বিস্তৃত জাগ্রোস এবং আলবোরজ পর্বতমালা যেকোনো আধুনিক সেনাবাহিনীকে ধীর করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে ২০০৩ সালের ইরাক আক্রমণের তুলনায় ইরান অনেক বেশি জটিল প্রতিপক্ষ, কারণ দেশটির আয়তন ইরাকের চেয়ে প্রায় চার গুণ বড় এবং এর সামরিক স্থাপনাগুলো পাহাড়ের গভীরে সুড়ঙ্গ তৈরি করে লুকানো রয়েছে।

দক্ষিণের দ্বীপগুলোতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও পেন্টাগন দোটানায় রয়েছে বলে জানা গেছে। খারগ দ্বীপ বা হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত দ্বীপগুলো দখল করা হয়তো অসম্ভব নয়, কিন্তু দীর্ঘ সময় সেগুলোকে ধরে রাখা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সামরিক বিশেষজ্ঞ আরমান মাহমুদিয়ান মনে করেন, ইরান হয়তো শুরুতে দ্বীপগুলো ছেড়ে দেবে এবং পরবর্তীতে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের ওপর বিধ্বংসী আক্রমণ চালাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বড় ফাঁদ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে।

পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে কুর্দি যোদ্ধাদের ব্যবহারের যে পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে, সেটিও খুব একটা ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যদিও কিছু বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দি গোষ্ঠী ইসরায়েলের সাথে সহযোগিতার ইঙ্গিত দিয়েছে, তবে তাদের সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। তাছাড়া ইরানের নিজস্ব বাহিনী ইতিমধ্যে সীমান্ত এলাকায় বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়ে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করেছে, যার ফলে পাহাড়ী পথে অনুপ্রবেশ করা বিদেশি মদতপুষ্ট যোদ্ধাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে ইরান কোনো ভূখণ্ড দখল থাকা অবস্থায় আলোচনায় বসতে রাজি হয় না। আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান তখন চরম সংকটের মাঝেও আলোচনার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল যতক্ষণ না তাদের মাটি থেকে শত্রু বাহিনী বিদায় নিয়েছিল। বর্তমান সংঘাতের ক্ষেত্রেও একই জাতীয়তাবাদী চেতনা কাজ করছে যা বিদেশি শক্তির যেকোনো পদক্ষেপে হিতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, তা এখন কেবল একটি আশার ওপর টিকে আছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যালেক্স ভাতানকা। তার মতে, সপ্তাহব্যাপী বিমান হামলা বা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের গুপ্তহত্যার পরও তেহরানের ক্ষমতার কাঠামোতে কোনো ফাটল ধরেনি। বরং এই বাহ্যিক চাপ ইরানের জনমানসে বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে আরও বেশি ঐক্য এবং ক্ষোভ তৈরি করছে যা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের ইঙ্গিত দেয়।

সামগ্রিকভাবে ইরানের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য দেশটির সামরিক শক্তির চেয়েও বড় হাতিয়ার হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত মরুভূমি, বরফে ঢাকা উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এবং গভীর সমুদ্র উপকূল একযোগে মার্কিন বাহিনীর সামনে এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে। এই বৈরী পরিবেশে একটি কার্যকর স্থল অভিযান চালানো এবং তাতে জয়ী হওয়া আধুনিক সমরাস্ত্রের যুগেও এক বিশাল অনিশ্চয়তার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

বিডি প্রতিদিন/নাজমুল



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews