দুর্গম হাওড়পারের গ্রাম আলীনগরের মানুষ ভালো নেই। দিরাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ভাটিপাড়া ইউনিয়নের এ গ্রামটি এখন পুরুষশূন্য। পতিত আওয়ামী লীগের ছায়াতলে ফুলে-ফেঁপে ওঠা ইউপি সদস্য শাহাদ্বীব তালুকদার এখন ভয়ংকররূপে দৃশ্যমান। তার পেটোয়া বাহিনীর ভয়ে গ্রামের নারী-শিশুদের কাটছে নির্ঘুম রাত। অজানা আশঙ্কায় উঠতি বয়সি মেয়েদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে স্বজনদের বাসায়। কিছু দিন ধরে কোনোমতে দিন পার করতে পারলেও গ্রামজুড়ে রাতে নেমে আসে আতঙ্ক। যখন-তখন দেশীয় অস্ত্র হাতে দল বেঁধে বাড়িঘরে ঢুকে পড়ছে শাহাদ্বীব বাহিনীর লোকজন। যা পাচ্ছে, জোরপূর্বক তাই নিয়ে যাচ্ছে। ১২ মে আধিপত্য নিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে রতন মিয়া নামের এক তরুনের মৃত্যুর পর গ্রামজুড়ে চলে ব্যাপক লুটপাট। শাহাদ্বীব বাহিনীর লোকজন অন্তত অর্ধশত বাড়িঘরে ঢুকে অর্থ, স্বর্ণালংকার, গরু-বাছুর, জমির ধান-যা পেয়েছে, তাই লুটে নেয়। ধারালো রামদার কোপো গ্রামের অসংখ্য বাড়িঘর ক্ষতবিক্ষত করা হয়। নারীদের শ্লীলতাহানির অভিযোগও উঠেছে। হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয়েছে ১৬৯ জনকে। গ্রেফতারের ভয়ে পুরুষরা এখন গ্রামছাড়া। সন্ধ্যার পর থেকে প্রতিদিন দেশি অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শুরু হয় শাহাদ্বীব বাহিনীর মহড়া। আরেক দফা লুটপাটের ভয়ে নারী ও শিশুরা নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

ন্যক্কারজনক এ ঘটনার দায় এড়াতে দিরাই থানার ওসি এনামুল হক চৌধুরী দিয়েছেন ভিন্নতথ্য। যুগান্তরকে তিনি বলেছেন, ‘আমাকে তো কেউ লুটপাট বা বাড়িঘরে হামলার কথা জানায়নি। অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অথচ ১৭ মে ১৫-২০ জন নারী বাড়িঘরে টিকতে না পেরে দিরাই থানায় গিয়ে আশ্রয় নেন। পুলিশ থানার গেট থেকেই অসহায় এসব নারীকে বুঝিয়ে বিদায় করেই দায়িত্ব শেষ করে।

আলীনগর গ্রামে যাওয়ার পর সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর আতঙ্কিত নারীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সর্বত্রই বাড়িঘর ভাঙচুর, টিনের বেড়া কোপানোর দাগ ছাড়াও লুটপাটের চিহ্ন চোখে পড়ে। কথা হয় গ্রামের নারীদের সঙ্গে। তারা জানান, সন্ত্রাসীরা এখন দিনে নয়, রাতে আসে। ১৫-১৬ জন লোক দল বেঁধে ঘোরাঘুরি করে, ভয়ভীতি দেখায়। কেউ কেউ আবার গালাগাল করে, সুযোগ বুঝে কারও ধান, কারও গরু, কারও নৌকা নিয়ে যাচ্ছে। তারা সবাই মেম্বারের (শাহাদ্বীব) লোকজন।

১২ মে আধিপত্য বিস্তার ও পূর্ববিরোধের জেরে ভাটিপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহাদ্বীব মেম্বার এবং গ্রামের রফিকুল ইসলাম, আমিন ও আব্দুল মুহিতের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় রতন মিয়া (২৭) চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। তিনি আলীনগর গ্রামের সোনাই মিয়ার ছেলে। নিহত রতন ছিলেন শাহাদ্বীব মেম্বারের সমর্থক। ১৭ মে নিহত রতন মিয়ার পিতা সোনা মিয়া বাদী হয়ে রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে ১৬৯ জনকে আসামি করে দিরাই থানায় মামলা করেন। থানাকে ম্যানেজ করে এরপর থেকে শুরু হয় শাহাদ্বীব বাহিনীর তাণ্ডব। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অর্ধশত বাড়িঘরে লুটপাট চালানো হয়। এরপর সাত দিন পার হলেও গ্রামজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল গ্রামের জাহানারা বেগম নামের এক নারীর। তিনি প্রতিবেদককে বলছিলেন, গ্রামে আর থাকতে পারছি না। আমাদের জেলে দিলে শান্তি পাব। রাতে রামদা নিয়ে সন্ত্রাসীরা টহল দেয়। ছেলে-মেয়ে নিয়ে ঘরে থাকতে ভয় লাগে। কখন কার সর্বনাশ হয়ে যায়। অনেকে বড় মেয়েদের অন্য গ্রামে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আঞ্চলিক ভাষায় জাহানারা বলেন, হাওড়ের ফসল পানিতে ভাসিয়ে নিলেও কিছু ধান ঘরে তুলেছিলাম। সেগুলো নিয়ে গেছে। ৪টা গরুও নিয়ে গেছে সন্ত্রাসীরা। পুলিশকে জানিয়েছিলাম কিন্তু তারা আসেনি।

গ্রামের মানিক বাদশার মা বলছিলেন, ‘যেদিন মাইর হইছে আমার পুতাইনতের (ছেলেদের) ৮টা মেরি (ভেড়া), নাও (নৌকা), বোমা (ধান মাড়াই) মেশিন নিয়ে গেছে।

এ সময় আরেক নারী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার বাপ (বাবা) গরিব। লুইড়া (ধান কাটার পর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধানের ছড়া) ৬ মন ধান আনছিলো, তাও নিয়া গেছে সন্ত্রাসীরা।’ গ্রামের আলেক মিয়ার শারীরিক প্রতিবন্ধী স্ত্রী বলছিলেন, আমার ৪টা গরু ও নৌকা নিয়ে গেছে।

কোনো কিছু না জেনেও ঘরে বসে আসামি হয়েছেন বাদশা মিয়া ও স্বপন মিয়া। লুট করা হয়েছে তাদের ঘরবাড়িও। সাবেক ইউপি সদস্য রেনুকা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে কেউ নেই। দরজা-জানালাসহ ঘরের দামি জিনিসপত্র তছনছ করা হয়েছে। এলোমেলোভাবে মেঝেতে পড়ে আছে জিনিসপত্র। আলমারি ভেঙে স্বর্ণালংকারসহ জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার ক্ষতচিহ্ন পরিষ্কার ফুটে উঠছিল।

রেনুকা বেগম বলেন, ছোট মেয়ের বিয়ের জন্য ১০ বছর ধরে কিছু কিছু করে স্বর্ণালংকার জোগাড় করেছিলাম। স্টিলের আলমিরা ভেঙে ৭ ভরি স্বর্ণালংকারসহ দামি জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসার জন্য শ্রমজীবী ২ ছেলে ও আত্মীয়স্বজন মিলে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়েছিল। কথা ছিল এ সপ্তাহেই তাকে সিলেট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করব। এর মধ্যেই এই ঘটনা। সব লুট হয়ে গেছে। তিনি এ ঘটনার জন্য শাহাদ্বীবকে দায়ী করেছেন।

পার্শ্ববর্তী ভাটিপাড়া গ্রামের আবু তাহের বলেন, দুই পক্ষের মারামারির ঘটনায় রতন মিয়া খুন হয়েছেন। আমরা চাই যারা জড়িত, তাদের বিচার হোক। কিন্তু এ নিয়ে কেউ কেউ রাজনৈতিক ফায়দা নিতে নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে মামলা বাণিজ্য করছেন। এটা ঠিক না। রাজনৈতিক নেতাদের এগুলো দেখা উচিত।

এদিকে মামলা বাণিজ্যের কারণে শাহাদ্বীব মেম্বারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন নিহত রতনের বড় ভাই খয়েজ আলী। তিনি বলেছেন, আমার ভাই মারা গেছে। আমি সাক্ষী হব। শাহাদ্বীব মেম্বারকে আমি সাক্ষী হিসাবে মানি না, মেম্বার সাক্ষী হতে পারে না। স্থানীয় বিএনপি সমর্থক একাধিক ব্যক্তি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শাহাদ্বীব মেম্বার সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে আখের গুছিয়েছেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ভোল পালটে বিএনপি হয়ে গেছেন। এমনকি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পদটিও বাগিয়ে নেন। এলাকায় একক আধিপত্য চলে আসে তার হাতে। কোণঠাসা হয়ে পড়েন এলাকার জনপ্রিয় ও ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি প্রার্থী আনাছ মিয়া। তিনি শাহাদ্বীব মেম্বারের চাচা। জানতে চাইলে আনাছ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, শাহাদ্বীব আমার কথা শোনে না। এলাকার কোনো গ্রাম্য পলিটিক্সে আমি নেই। এসব আমি পছন্দও করি না।

অভিযোগের বিষয়ে শাহাদ্বীব মেম্বার বলেন, লুটপাটের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews