বাংলাদেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ কেবল একটি উৎসবই নয়, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ চালিকাশক্তি। প্রতি বছর কোরবানির মৌসুমকে কেন্দ্র করে দেশে যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক লেনদেন হয়, তা একক কোনো উৎসব বা খাতের ক্ষেত্রে বিরল। আকার, বাজারমূল্য এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে কোরবানিকেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় অর্থনীতি এখন বাংলাদেশে।  বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নজর দিলে দেখা যায়, পাকিস্তানে বছরে গড়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ, ইন্দোনেশিয়ায় ১৮ লাখ, তুরস্কে ৩৮ লাখ এবং মিসরে ১৩ লাখ পশু কোরবানি হয়। এমনকি খোদ সৌদি আরবে হজ মৌসুমে কোরবানি হওয়া ১০-১৫ লাখ পশুর বেশির ভাগই আমদানি করা। সেখানে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় এক কোটিরও বেশি পশু কোরবানি হয়, যার প্রায় পুরোটাই আসে দেশীয় উৎপাদন থেকে।

গত এক দশকে দেশে কোরবানির পশুর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে যেখানে ৮৫ থেকে ৮৮ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল, ২০২৪ সালে তা ১ কোটি ৪ লাখে গিয়ে দাঁড়ায়। এ বছর (২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে) কোরবানির জন্য প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ পশু সরবরাহ রয়েছে, যেখানে চাহিদা রয়েছে প্রায় ১ কোটি ১ লাখের মতো। অর্থাৎ চাহিদার চেয়েও আমাদের উৎপাদন বেশি। গ্রামীণ প্রান্তিক খামারি থেকে শুরু করে আধুনিক শিক্ষিত তরুণ উদ্যোক্তা সবার শ্রমে-ঘামে আজ বাংলাদেশ গবাদি পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এই বিশাল অর্জন ও সম্ভাবনার উল্টো পিঠে লুকিয়ে আছে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, কাঠামোগত সংকট এবং নীতির অভাব।

বাংলাদেশে কোরবানির অর্থনীতি বহুমাত্রিক। এটিকে কেন্দ্র করে গোখাদ্য উৎপাদনকারী, খামার ব্যবস্থাপক, পশুচিকিৎসক, পরিবহনশ্রমিক, হাটের ইজারাদার, হাসিল আদায়কারী, কসাই এবং সবশেষে চামড়াশিল্পের বিশাল এক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহব্যবস্থা জড়িত।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাতে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। একসময় কোরবানির পশু বলতে বোঝানো হতো কৃষকের লাঙল টানা গরু বা বাড়ির উঠোনে লালিতপালিত দু-একটি ছাগল। কিন্তু এখন রাজধানীর বিশাল বাজারকে কেন্দ্র করে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোসহ সারা দেশে অসংখ্য বাণিজ্যিক খামার গড়ে উঠেছে। তরুণ ও শিক্ষিত সমাজ, বিভিন্ন পেশাজীবী এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই খাতে বিপুল বিনিয়োগ করছে। তারা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পশু হৃষ্টপুষ্ট করছে।

বাজারব্যবস্থাপনায়ও এসেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। চিরায়ত কাদাপানি আর যানজটে কোরবানির হাটের পাশাপাশি এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার পশু বিক্রি হচ্ছে অনলাইনে। লাইভ ওয়েট বা জীবন্ত ওজনে পশু বিক্রির চল শুরু হয়েছে, যা ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের জন্যই একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা। সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গাটি হলো আমাদের বাজার অর্থনীতির একটি বড় স্ববিরোধিতা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতেই এ বছর কোরবানি বাজারে প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। বাংলাদেশ প্রতি বছর ৮৭ লাখ মেট্রিক টনের বেশি মাংস উৎপাদন করে, যেখানে চাহিদা ৭৬ লাখ মেট্রিক টন। অর্থাৎ আমাদের মাংসের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি।

কোরবানি অর্থনীতির সম্ভাবনা ও সংকটএখন প্রশ্ন হলো, দেশে যদি এত বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত থাকে, তাহলে গরুর মাংসের দাম কেজিপ্রতি ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা কিংবা তারও বেশি কেন? কেন ২০০৯ সালে যে মাংস ২২০-২৫০ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন ৪ গুণ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে? এর চেয়েও বড় বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, প্রতি বছর বাংলাদেশকে ১৩-১৪ হাজার মেট্রিক টন হিমায়িত গরু ও মহিষের মাংস আমদানি করতে হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। উদ্বৃত্ত থাকার পরও কেন এই আমদানি? এর মূল কারণ দেশের দুর্বল মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। কোরবানির পশু মূলত কেনা হয় জীবন্ত অবস্থায়, ঈদের মৌসুমে। কিন্তু সারা বছর ফাইভ স্টার হোটেল, রেস্তোরাঁ, সুপার শপ ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের কারখানাগুলোর (সসেজ, মিটবল, নাগেটস ইত্যাদি) যে নিয়মিত, মানসম্পন্ন এবং হিমায়িত মাংসের সরবরাহ প্রয়োজন, তা দেশীয় বাজার দিতে পারে না। নিয়মিত সরবরাহ, মান নিয়ন্ত্রণ এবং কোল্ড চেইন- এই তিনটির অনুপস্থিতিতে শিল্প ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য মাংস আমদানির ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।

পাশাপাশি রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। একজন প্রান্তিক খামারি যে দামে গরু বিক্রি করেন, তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে তা ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। পথে পথে চাঁদাবাজি, হাটের অতিরিক্ত হাসিল এবং সিন্ডিকেটের কারণে উৎপাদক তাঁর ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, আর ভোক্তাকে গুনতে হয় অতিরিক্ত টাকা।

কোরবানির এই বিশাল অর্থনীতিকে শুধু উৎসবকেন্দ্রিক না রেখে, একে সারা বছরের একটি টেকসই ও রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিণত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

উদ্বৃত্ত ২২ লাখ পশু সম্পদে রূপান্তর করতে হলে দেশব্যাপী আধুনিক কসাইখানা এবং মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার এবং রেফ্রিজারেটেড ভ্যানের মাধ্যমে কোল্ড চেইন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। তাতে সারা বছর করপোরেট ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশীয় মাংস ব্যবহার করতে পারবে এবং কোটি কোটি টাকার আমদানি ব্যয় বাঁচবে।

বিশ্বে হালাল মাংসের বাজার ট্রিলিয়ন ডলারের। মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশগুলোতে হালাল মাংসের বিপুল চাহিদা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও হালাল সার্টিফিকেশন নিশ্চিত করে আমরা সহজেই এই বিশ্ববাজারে প্রবেশ করতে পারি। এর জন্য সরকারকে রপ্তানিকারকদের প্রণোদনা এবং নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। যত্রতত্র কোরবানির হাট বসিয়ে যানজট ও পরিবেশ দূষণ করার সনাতনী প্রথা থেকে যথেচ্ছ বেরিয়ে আসতে হবে। শহরতলিতে স্থায়ী ও আধুনিক ‘স্মার্ট হাট’ নির্মাণ করতে হবে, যেখানে পশু চিকিৎসক, ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র, পরিষ্কার পানি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকবে। ক্যাশলেস বা নগদবিহীন লেনদেন আরও উৎসাহিত করতে হবে, যাতে ক্রেতা-বিক্রেতারা ছিনতাই বা জাল টাকার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকেন। গোখাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি খামারিদের জন্য সবচেয়ে বড় বাধা। গোখাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং দেশীয় পর্যায়ে সাইলেজ বা ঘাস চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করতে হবে। এ ছাড়া পশুর মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সহজ শর্তে ‘প্রাণিবিমা’ ব্যাপকভাবে চালু করা প্রয়োজন।

কৃষক যাতে সরাসরি ভোক্তার কাছে পশু বিক্রি করতে পারেন, সেজন্য ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে বড় শহরগুলো পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিপণন চ্যানেল তৈরি করতে হবে। কোরবানির আগে মহাসড়কে পশু বহনকারী ট্রাকে চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করতে হবে। কোরবানির অর্থনীতির অন্যতম বড় অংশ হলো পশুর চামড়া। কিন্তু বিগত কয়েক বছর সঠিক সংরক্ষণ ও ন্যায্যমূল্যের অভাবে লাখ লাখ পিস চামড়া নষ্ট হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি। তৃণমূল পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ ও রাসায়নিকের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে এবং সিন্ডিকেট ভেঙে ট্যানারি মালিকদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও সরাসরি চামড়া কেনার সুযোগ করে দিতে হবে।

বাংলাদেশে কোরবানির অর্থনীতি একটি বিশাল সম্ভাবনার নাম। প্রয়োজন সঠিক নীতির বাস্তবায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।  কোরবানির বাজার যদি শুধু বাৎসরিক হাট হিসেবে না দেখে, একটি পূর্ণাঙ্গ কৃষিশিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে এটি দেশের জিডিপিতে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম। মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে যেমন আমদানিনির্ভরতা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা যায়, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে হালাল মাংস রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জন সম্ভব। দরকার শুধু সদিচ্ছা, সমন্বয় আর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

♦ লেখক : মিডিয়াব্যক্তিত্ব

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews