বর্তমানে আট থেকে আশি সবাই স্মার্টফোনে বুঁদ। বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে। সংবাদপত্র পড়ার আগ্রহেও ভাটা পড়েছে। বিজ্ঞাপনের আধিক্য ও কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে টেলিভিশনের খবরের আকর্ষণ আগের মতো আর নেই। ফেসবুক-ইউটিউব-টুইটার ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে মূলধারার গণমাধ্যমের জায়গা। প্রযুক্তির সৌজন্যে সব তথ্য এখন হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোনে এখন শুধু ব্যক্তিগত কথোপকথনই হয় না, ছবি-ভিডিও-রিলস ও মেসেজ আদানপ্রদান করা হয়। আজকের ব্যস্ত জীবনে স্মার্টফোন শুধু একটি ডিভাইস নয়, এটি ব্যক্তিগত তথ্যভান্ডারও বটে। মুঠোফোনে ব্যক্তিগত ছবি, গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টের তথ্য, ব্যাংকিং অ্যাপ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরসহ অনেক গোপন তথ্য থাকে। এটা অনস্বীকার্য, তথ্যপ্রযুক্তি একদিকে যেমন দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে কাজের গতি বাড়িয়েছে।মানুষের স্বভাবতই দেশবিদেশে কী ঘটছে, তা জানার আগ্রহ প্রবল। কিছুক্ষণ পরপর ডিজিটাল জগতে নেভিগেট করার নেশা আমাদের পেয়ে বসেছে। দিনরাতের একটা বড় সময় কাটে পর্দায় চোখ রেখে। কখনো ল্যাপটপ আবার কখনো বা নিজের মোবাইল ফোনে। এমনো দেখা যায়, দিন শেষে ঘরে ফিরে কর্মক্লান্ত দম্পতি পাশাপাশি বসে ডুবে যান যার যার স্মার্টফোনে। সামনে উপস্থিত ব্যক্তিটির সঙ্গে কথা না বলে ফোনের পর্দায় বেশি মনোযোগ। ফেসবুক আর ইউটিউবেই যেন জীবনের যত আনন্দ! এক ছাদের নিচে পাশাপাশি থেকেও দূরত্ব বাড়তে থাকে দুটি মানুষের মধ্যে। যেন শত যোজন দূরের! যাযাবরের (বিনয় মুখোপাধ্যায়) ‘দৃষ্টিপাত’ গ্রন্থের বিখ্যাত সেই উক্তিটির কথা মনে পড়ে, ‘আধুনিক বিজ্ঞান মানুষকে দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ।’

চিকিৎসকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ তাঁদের। সোশ্যাল মিডিয়া, বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউব ব্যবহার করার সময় অপ্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপন এবং নোটিফিকেশন বিরক্তি বাড়ায়। এতে মনঃসংযোগ নষ্ট হয়। সমাজমাধ্যমে দীর্ঘ পোস্ট দেখলেই ধৈর্যচ্যুতি ঘটে অনেকের। এখন চালু হয়েছে রিলস্ সংস্কৃতি। সরাসরি ফোনে আলাপ না করে অহেতুক মেসেজ পাঠানো হয়। ঘনঘন মেসেজে ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হন অনেকে। হয়তো বা সেটা প্রকাশ করেন না। পরিমিতিবোধ থাকতে হবে। মানুষ বিরক্ত হয় এমন কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যের সময়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সবকিছুরই যেমন ভালোমন্দ দুটি দিক রয়েছে; তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও কিন্তু এর ব্যতিক্রম হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যার যা খুশি তাই পোস্ট করছেন। ‘ট্রলিং’ যেন ছেলেখেলা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নারীদের প্রতি ‘বুলিং’ বেড়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অশ্লীলতার ছড়াছড়ি। এআই বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ প্রযুক্তি কাজটা সহজ করে দিয়েছে। ফেসবুকে অযাচিত মন্তব্য করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এমন কুরুচিপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করা হয়, যা সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। এটা ডিজিটাল শিষ্টাচারের মধ্যে পড়ে না। নিয়ন্ত্রণহীন সোশ্যাল মিডিয়া এখন ভুক্তভোগীদের কাছে রীতিমতো আতঙ্কের। ট্রলিং-বুলিংয়ের শিকার হয়ে ক্ষোভে-দুঃখে-অপমানে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন অনেকে, যা খুবই দুঃখজনক। প্রতিষ্ঠিত কোনো একটি নিউজ মিডিয়ার মতো করে একটা লোগো বানিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। মিস-ইনফরমেশন ও ডিজ-ইনফরমেশনের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। সম্প্রতি ‘সপ্তাহে তিন দিন অফিস’-সংক্রান্ত একটি স্মারকপত্র (আদেশ) সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, ছড়িয়ে পড়া আদেশটি সম্পূর্ণ ভুয়া। যাচাইবাছাই ছাড়া কোনো তথ্য বিশ্বাস না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়। এমন ভূরিভূরি উদাহরণ আছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব তথ্যের সত্যাসত্য বিচার করা দুরূহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কোনো ভিডিও বা তথ্য দেখলেই এটি আসল না নকল, এ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। অপতথ্য মোকাবিলা করা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত সব আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও সত্য হচ্ছে, মূলধারার গণমাধ্যমের চেয়ে ক্রমশ বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

স্কুলজীবনে পরীক্ষায় একটা রচনা লিখতে হতো-বিজ্ঞান আশীর্বাদ না অভিশাপ। প্রযুক্তি যে মানুষের কত উপকারে আসে, এক মুখে বর্ণনা করে তা শেষ করা যাবে না। কিন্তু প্রযুক্তির ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পায়ে পায়ে বিপদ। স্মার্টফোন হাতের নাগালের বাইরে রাখার পরামর্শ চিকিৎসকদের। অবসর জীবনে সময় কাটে না! কোনো কাজে মন বসে না। কিন্তু সুস্থ বিনোদনের অনেক মাধ্যম আছে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানো যায়। সৃজনশীল কাজে ব্যস্ত থাকা যায়। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ; পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া, শরীরচর্চা, খেলাধুলা, হাঁটাচলা, ভ্রমণ, শখের কাজ, অতিথি আপ্যায়ন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, মেডিটেশন বা ধ্যান-এসব কাজের মাধ্যমে স্ট্রেস কমানো যায় বহুলাংশে। জনহিতকর কাজে নিজকে সম্পৃক্ত করতে হবে। অন্যের কল্যাণে কিছু না কিছু করলে মনে সুখের অনুভূতি জাগে। নগরকেন্দ্রিক যান্ত্রিক জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে সেই কবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সভ্যতার প্রতি’ কবিতায় লিখে গেছেন, ‘দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর।’ আমরাও ডিজিটাল বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতে চাই। কবে মিলবে মুক্তি, কে জানে!

♦ লেখক : সাবেক ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews