নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের অনেক সিদ্ধান্তের তথ্য রাষ্ট্রীয় নথিপত্র ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে- বলে দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ভুল বা সঠিক হোক সব তথ্য জানার অধিকার রাষ্ট্রের নাগরিকদের রয়েছে। তথ্য সরিয়ে ফেলা আইনের পরিপন্থী। এটি তথ্য অধিকার আইনের সাথে সাংঘর্ষিক।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে গতকাল ‘অনতিবিলম্বে তথ্য কমিশন গঠন এবং তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এ প্রয়োজনীয় সংশোধন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এবং তথ্য অধিকার ফোরামের আহ্বায়ক শাহীন আনাম, মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান ও নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেনসহ অনেকে।
সংগঠনটি বলেছে, তথ্য কমিশনের প্রধান তথ্য কমিশনার ও কমিশনারদের অনুপস্থিতিতে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কমিশনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। এতে দেশে তথ্য অধিকার আইনের ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তথ্য অধিকার আইন জনগণকে ‘রাষ্ট্রের মালিক’ হিসেবে ক্ষমতা প্রয়োগের পথ তৈরি করে দিয়েছে। এই আইন সঠিকভাবে প্রয়োগ হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে, দুর্নীতি কমবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। তবে আইনটি পাসের দেড় দশক পরও কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছে। তাদের মতে, তথ্য কমিশন গঠনের প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, কমিশনারদের পদমর্যাদা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগ্যতা ও দক্ষতা এবং কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজ করার সীমাবদ্ধতা এর বড় কারণ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির জারি করা তথ্য অধিকার সংশোধন অধ্যাদেশ, ২০২৬ এ আইনের তিনটি ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে তথ্যের সংজ্ঞা, কর্তৃপক্ষের স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশ এবং জরিমানার পরিমাণ বাড়ানোর বিষয় রয়েছে। এ পরিবর্তন যথেষ্ট নয়।
ড. ইফতেখার আশা প্রকাশ করেন যে, সরকার তার নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে। তথ্য কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখতে হবে- যাদের সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা আছে তাদের। বিগত বছরগুলোতে দেখেছি যাদের এ বিষয়ে ধারণা নাই তাদের প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যারা স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করার সৎ সাহস আছে তাদেরকে নিয়োগ দেয়া দরকার। তথ্যকে গোপন রেখেছেন যে ব্যক্তি সারাজীবন তাকেই কমিশনার নিয়োগ দেয়ার উদাহরণ পরিবর্তনের আহ্বান। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন প্রক্রিয়ার মধ্যেও স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। তাদের সেসময়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তথ্য কমিশন গঠন উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে।
টিআইবি নির্বাহী বলেন, সরকার পরিবর্তন হয়, রাষ্ট্র তার জায়গায় থাকে। কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো কাজে স্বচ্ছতার অভাব পাওয়া গেলে অবশ্যই তা নিয়েও টিআইবি কথা বলবে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সিদ্ধান্ত হয়েছে অন্ধকারে। দেড় বছরে তথ্য কমিশনকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনব্যবস্থায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল।
সুশানের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, তথ্য অধিকার আইন দিয়ে যেকোনো তথ্য পাওয়া সম্ভব, যা সরকারি কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। তথ্যের অধিকার মানে সত্য জানার অধিকার। নাগরিকদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অধিকার কারও নাই। গত ১৬ বছরে দেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত ছিল। রাজনৈতিক দলকে যেন সম্পৃক্ত করা হয়, যেন আমরা তাদের হিসাব-নিকাশের বিষয়ে জানতে পারি।
বিলস-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, তথ্য প্রবাহ ঠিক থাকলে এই যে বাংলাদেশ থেকে এতো টাকা লুট হলো সেটা কমানো যেত। তথ্য কমিশনের ক্ষেত্রে সরকারের জবাবদিহিতা দরকার। যে কাউকে ওই আসনে বসাবে সেটি যেন দলীয় না হয়। আর সরকার পরিবর্তন হলে সব পরিবর্তন করতে হবে এই সংস্কৃতিও পরিবর্তন দরকার।