জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকাঠামো পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে বিএনপির নতুন সরকার।

দেশের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত সচিবালয়ে দায়িত্ব পালনকারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পদায়ন পাওয়া ১৬৯ জন পুলিশ সদস্যকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে তাদের স্থলে নিরাপত্তা যাচাই শেষে নতুন সদস্য নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে।

একই সঙ্গে দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল পরিচয় যাচাই, অতিরিক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, গেট ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং ভিজিটর ম্যানেজমেন্ট আধুনিকায়নের মতো একাধিক পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এগুলো কোনো তাৎক্ষণিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং সচিবালয়ের নিরাপত্তাকে দীর্ঘ মেয়াদে আরো কার্যকর, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক করার উদ্যোগ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবালয় নিরাপত্তা শাখা থেকে পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে একটি চিঠি পাঠানো হয়।

সেখানে সচিবালয়ের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের পদায়ন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে দায়িত্ব পাওয়া উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সদস্য এখনো একই দায়িত্বে রয়েছেন।

চিঠিতে বলা হয়, সচিবালয়ের বিভিন্ন প্রবেশদ্বার, মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংবেদনশীল দপ্তর এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসব সদস্যকে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করে সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স পাওয়া নতুন ও দক্ষ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

বর্তমানে সচিবালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণী বৈঠক এবং প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দর্শনার্থীর যাতায়াতের কারণে সচিবালয়কে দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সরকারি স্থাপনাগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, বদলি তালিকায় রয়েছেন তিনজন পুলিশ পরিদর্শক, একজন সার্জেন্ট, পাঁচজন উপপরিদর্শক (এসআই), ১৬ জন সহকারী উপরিদর্শক (এএসআই), ১২ জন নায়েক এবং ১৩২ জন কনস্টেবল। পর্যায়ক্রমে সবাইকে বদলি করা হবে।

শুধু জনবল পরিবর্তন নয়, প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপরও জোর দিচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতে কেবল নাম ও একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে ওটিপি সংগ্রহ করে সচিবালয়ে প্রবেশ করা গেলেও এখন জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর এবং সেই এনআইডির সঙ্গে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ছাড়া ওটিপি ইস্যু করা হচ্ছে না। ফলে কোনো দর্শনার্থীর পরিচয় যাচাই এবং প্রয়োজনে তাকে শনাক্ত করা আগের তুলনায় সহজ হবে।

এছাড়া সচিবালয়ের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে প্রায় ১০০ সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ করিডর, সংবেদনশীল ভবন এবং চলাচলের বিভিন্ন এলাকা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সচিবালয়ের কয়েকটি গেটের ব্যবহারও সীমিত করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট গেট খোলা রাখা হচ্ছে।

চলতি বছরের এপ্রিলে দর্শনার্থী প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে নতুন নির্দেশনা জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন নীতিমালায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য নির্ধারিত কোটার মধ্যে ওটিপিভিত্তিক প্রবেশ পাস ইস্যুর বিধান রাখা হয়েছে।

সেই অনুযায়ী একজন পূর্ণমন্ত্রী সর্বোচ্চ ২০টি, প্রতিমন্ত্রী ১৫টি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সিনিয়র সচিব ও সচিব ১০টি, অতিরিক্ত সচিব চারটি এবং যুগ্ম সচিব তিনটি দর্শনার্থী পাস ইস্যু করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই ব্যবস্থার ফলে অপ্রয়োজনীয় দর্শনার্থীর সংখ্যা কমেছে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

সচিবালয়ে সদ্য দায়িত্ব পাওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কনস্টেবল বলেন, ‘আমরা যারা এখন দায়িত্ব পালন করছি, তাদের অনেকেই সম্প্রতি যোগদান করেছি। আমার দায়িত্ব সচিবালয়ের ভেতরে। ৫ আগস্টের আগে রংপুর জেলায় দায়িত্ব ছিল বলে তিনি জানান।

সচিবালয়ে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশের উপ-কমিশনার কাজী আবু সাঈদ বলেন, এখন পর্যন্ত ৮২ জন পুলিশ ফোর্সকে পরিবর্তন করা হয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ, নিরাপত্তার অবস্থা ভালো আছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকারের কারণে দর্শনার্থীর চাপ একটু থাকবেই। আমরা অ্যালার্ট আছি। আগের সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি নতুন করে এখন প্রায় ১০০-এর মতো সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা নিরাপত্তার স্বার্থে ৪ নম্বর গেটটা সব সময় বন্ধ রাখি। ৫ নম্বর গেট প্রধানমন্ত্রী যখন ইন-আউট করেন সে সময় এবং বিকেলে অফিস ছুটির সময় খোলা রাখা হয়। অফিস শুরু ও শেষ হওয়ার সময় ৪ ও ৩ নম্বর গেট খোলা রাখা হয় বলে জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (সচিবালয় নিরাপত্তা শাখা) কাজী আরিফুর রহমান জানান, সচিবালয়ের দায়িত্বে থাকা ৫ আগস্ট ২৪-এর আগের দায়িত্বরত পুলিশ ফোর্স ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখন নতুন ফোর্স যোগদান করছে।

প্রধানমন্ত্রী সচিবালয়ে নিয়মিত অফিস করছেন, এক্ষেত্রে কোনো থ্রেট দেখছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, কোনো ধরনের থ্রেট নেই, তবে আমাদের থ্রেট নিয়েই কাজ করতে হয়। ইনআশাল্লাহ পরিস্থিতি ভালো আছে।’

সচিবালয়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের আগের নিয়মের চেয়ে এখন অনেক কিছু আপডেট হয়েছে।’ শিগগিরই দর্শনার্থীদের জন্য গলায় ঝোলানো কার্ডের ব্যবস্থা করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক স্থাপনায় দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের নির্দিষ্ট সময় পরপর রোটেশন বা বদলি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নিরাপত্তা কৌশল। দীর্ঘদিন একই স্থানে দায়িত্ব পালন করলে ব্যক্তিগত যোগাযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা প্রোটোকল দুর্বল হওয়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল পরিচয় যাচাই, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ এবং কেন্দ্রীয় মনিটরিং ব্যবস্থা একটি আধুনিক সরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সচিবালয়ে পুলিশ সদস্য বদলি, ডিজিটাল ভিজিটর ম্যানেজমেন্ট, অতিরিক্ত নজরদারি ক্যামেরা, সীমিত প্রবেশপথ এবং পরিচয় যাচাইয়ের নতুন ব্যবস্থা-সব মিলিয়ে প্রশাসনের কেন্দ্রস্থল সচিবালয়ের নিরাপত্তাকে নতুন কাঠামোয় সাজানোর একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

সূত্র: আমার দেশ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews