ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে এই খাতের সম্প্রসারণ এখনো সীমিত পরিসরেই আটকে রয়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশই নিয়মিত অনলাইনে পণ্য বা সেবা গ্রহণ করছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘আইসিটি অ্যাক্সেস অ্যান্ড ইউজ বাই হাউজহোল্ডস অ্যান্ড ইন্ডিভিজুয়ালস সার্ভে ২০২৪-২৫’ অনুযায়ী- দেশে মাত্র ১৪.৪ শতাংশ মানুষ অনলাইন কেনাকাটার সঙ্গে যুক্ত। এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে, যেখানে অনলাইন ক্রেতার হার ২১.৩ শতাংশ। বিপরীতে সবচেয়ে কম অংশগ্রহণ দেখা গেছে বরিশাল বিভাগে, মাত্র ৮.৭ শতাংশ।
অন্যান্য বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রামে ১৬.২ শতাংশ, খুলনায় ১৪.২ শতাংশ, রাজশাহীতে ১১.৭ শতাংশ, সিলেটে ১০.৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৯.৩ শতাংশ এবং রংপুরে ৯.২ শতাংশ মানুষ অনলাইনে কেনাকাটা করেন। শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্যও উল্লেখযোগ্য- শহরে যেখানে এই হার ২০ শতাংশ, গ্রামে তা নেমে আসে ১১.৮ শতাংশে।
পণ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পোশাক, জুতা ও খেলাধুলার সামগ্রী অনলাইন বাজারে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়, যা মোট লেনদেনের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি। এর পরের অবস্থানে রয়েছে খাদ্য ও মুদি পণ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, গৃহস্থালি সামগ্রী এবং ইলেকট্রনিক্স পণ্য। লেনদেন পদ্ধতির ক্ষেত্রে এখনো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ক্যাশ অন ডেলিভারি’। প্রায় ৮৬.৮ শতাংশ ক্রেতা পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১৩.৯ শতাংশ গ্রাহক লেনদেন করেন, আর ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার সীমিত- মাত্র ৩.১ শতাংশ। ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারীর হার আরও কম, ১.১ শতাংশ।
লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরুষদের অংশগ্রহণ নারীদের তুলনায় বেশি। পুরুষদের মধ্যে ১৭.৫ শতাংশ অনলাইন ক্রেতা থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ১১.৪ শতাংশ। বয়সভেদে সবচেয়ে সক্রিয় ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠী, যাদের অংশগ্রহণ ২৪.৭ শতাংশ। অন্যদিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে এই হার মাত্র ২.৬ শতাংশ।
শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রেও বড় পার্থক্য রয়েছে। উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার হার ৪১.৪ শতাংশ, যেখানে মাধ্যমিক পাসদের মধ্যে তা ১৯.৫ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষাপ্রাপ্তদের মধ্যে ৮.৩ শতাংশ এবং শিক্ষাহীনদের মধ্যে মাত্র ৩.৭ শতাংশ অনলাইনে কেনাকাটা করেন। পেশাভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়, বেকারদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি (২৩.৯ শতাংশ), কর্মজীবীদের মধ্যে ১৮.৯ শতাংশ এবং কর্মক্ষেত্রের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১০.৫ শতাংশ।
তবে এই খাতে ভোগান্তিও কম নয়। জরিপে প্রায় ১১.৪ শতাংশ ক্রেতা কোনো না কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে অর্ডার অনুযায়ী পণ্য না পাওয়া এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ নিয়ে। এছাড়া দেরিতে ডেলিভারি ও অতিরিক্ত মূল্য আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
ভৌগোলিকভাবে রংপুর ও চট্টগ্রাম বিভাগে সমস্যার হার বেশি, আর ঢাকা বিভাগে তুলনামূলক কম। বিশেষ করে বয়স্ক ক্রেতারা বেশি সমস্যায় পড়ছেন বলে জরিপে উঠে এসেছে। অন্যদিকে যারা এখনো অনলাইন কেনাকাটার বাইরে রয়েছেন, তাদের বড় অংশ সরাসরি পণ্য দেখে কেনাকাটায় স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কেউ কেউ প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না, আবার অনেকে দক্ষতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে জরিপের ফলাফল বলছে, দেশে অনলাইন বাণিজ্য ধীরে ধীরে বিস্তৃত হলেও আস্থা, সেবার মান এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিডি-প্রতিদিন/আব্দুল্লাহ