রফিকুল হায়দার ফরহাদ উড়িরচর (নোয়াখালী) থেকে ফিরে
এক সময় উড়িরচর ছিল জলদস্যুদের অভয়ারণ্য। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, নৌপথে লুটপাট-সবই ছিল এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। উপকূলের বিচ্ছিন্নতা, যোগাযোগের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক উপস্থিতির অভাব জলদস্যুদের জন্য এই চরকে নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত করেছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হওয়াই ছিল আতঙ্কের বিষয়। আর নদীতে ট্রলার নিয়ে কেউ মাছ ধরতে গেলে যেমন ডাকাতের কবলে পড়ত, তেমনি ট্রলারের যাত্রীরাও বহুবার এই ডাকাতের কবলে পড়ে হারিয়েছেন সর্বস্ব।
তবে গত কয়েক বছরে পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয়দের প্রতিরোধ, গণপিটুনি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের ফলে জলদস্যুতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। বর্তমানে চরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে, যা নিরাপত্তাব্যবস্থায় কিছটা স্থিতিশীলতা এনেছে। সেই পুলিশ ফাঁড়িও সাইক্লোন থেকে পুলিশ সদস্যদের যাতে রক্ষা করা যায় সেভাবে তৈরি। অর্থাৎ নিচতলা ফাঁকা। দ্বোতলায় থাকার ব্যবস্থা।
স্থানীয়দের দাবি, ‘এখন আগের মতো ডাকাতি নেই, পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক। আমরা যে মোটরসাইকেলে উড়িরচরের নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের চার খাইল্লা ঘাটে থেকে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপমুখী কলোনিবাজার ঘাটে গিয়েছিলাম, সেই মোটরসাইকেলের চালক মোহাম্মদ হৃদয় জানালেন, বেশ কয়েক বছর আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উড়িরচরের মূল ডাকাত জাশুকে ধরে পাশের চরে নিয়ে গুলি করে মেরে ফেলে রাখে। এরপর দীর্ঘ দিনের অত্যাচারিতরা ধরে ধরে পিটিয়ে মেরেছে এই ডাকাতদের। কয়েকজনকে মেরে নদীতেই ফেলে দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশ রেসলিং ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক এ কে এম আবদুল মোবিন। তিনি ২০/২২ বছর আগে এই উড়িরচরে গিয়েছিলেন স্থানীয় এক মাদরাসার হুজুরের আমন্ত্রণে। মোবিন ওই মাদরাসায় অনুদান দিয়েছিলেন। মোবিন তখন উড়িরচর থেকে ফেরার সময় ঘাটে বসা অবস্থায় পেয়েছিলেন সেই ডাকাত জাশুকে। সাধারণ পোশাকে থাকা দুই পুলিশের কাছ থেকে জাসু সম্পর্কে তথ্য পেয়েছিলেন মোবিন। লুঙ্গি পরে আর মাথায় বড় একটি হ্যাট লাগিয়ে কয়েক সহযোগীকে নিয়ে বসেছিলেন জাসু। উদ্দেশ্য ছিল ঘাটের যাত্রীদের সব লুটে নেয়া। কেন জানি সেদিন আর ডাকাতি করেনি জাশু। ফলে রক্ষা পান মোবিন। নিজেই এই তথ্য দিলেন।
তবুও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা না পাওয়ার আশঙ্কা এখনো রয়ে গেছে। যে কারনে রাতে সেখানে থেকে থেকে পুরের দিন আরো কিছু স্থানে যাওয়ার পরিকল্পনা বাদ দিতে হয়। ভয় নিয়েই ফিরে আসতে হয়েছে কোম্পানীগঞ্জে।
উড়িরচরের মানুষের কাছে নিরাপত্তার চেয়েও বড় উদ্বেগ এখন নদীভাঙন। এই ভাঙন শুধু জমি নয়, মানুষের স্মৃতি, বসতি এবং ভবিষ্যৎকেও গ্রাস করছে। জীবনতলা মোস্তাফিজুর রহমান মাদরাসার সুপারিনটেন্ডেন্ট হাফেজ মাইনুদ্দিন বলেন, “আমরা ১১ বার ঘর বদলিয়েছি। ভাঙনে ১০ কিলোমিটারের বেশি এলাকা নদীতে চলে গেছে। চলমান নদীভাঙন একটি আতঙ্ক আমাদের জন্য। এই নদীভাঙনে ১৩৫টি পাকা ঘরও বিলীন হয়ে গেছে। মাইনুদ্দিনের দেয়া তথ্য, ১৯৮৫ সালের ভয়াবহ সেই ঘূর্ণিঝড়ের পর এরশাদ সরকারের সময় ১৩৫টি পাকা ঘর নির্মাণ করে হয়েছিল। আমারও একটা ঘর ছিল। কিন্তু নদীভাঙনে একে একে সব ঘরই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সর্বশেষ ঘরটি ৮/১০ বছর আগে নদী গিলে ফেলেছে।
চরের দক্ষিণাংশে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস, অথচ সেখানে রয়েছে মাত্র একটি সাইক্লোন সেন্টার, যার ধারণক্ষমতা কয়েক শ মানুষের বেশি নয়। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের সময় অধিকাংশ মানুষকে দুর্বল ঘরে আশ্রয় নিতে হয়। যা প্রাণহানির ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এ পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের প্রধান দাবি নদীভাঙন রোধে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, পর্যাপ্ত সাইক্লোন সেন্টার, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ন্যূনতম স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অবকাঠামো। হাফেজ মাইনুদ্দিনের দাবি, ‘সরকার তথা পানি উন্নয়ন বোর্ড যেন বোল্ডার ফেলে নদীভাঙন থেকে এই চরের বাসিন্দাদের রক্ষা করে।’ ব্যবসায়ী কায়সার জানান, গোয়ালখালিতে প্রস্তাবিত বাঁধটি নির্মাণ হলে নোয়াখালীর মূল ভূখণ্ডের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন সহজ হবে । এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, সময় বাঁচবে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে। তিনি বলেন, এখন আমাদের এক বস্তা ধান নোয়াখালী পাঠাতে ট্রলার ভাড়া, কুলি ভাড়া, ট্্রাক ভাড়া মিলে ২৫০ টাকা খরচ হয়। বাঁধ নির্মিত হলে এই খরচ ৫০ টাকায় নেমে যাবে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দিক থেকেও উড়িরচর পিছিয়ে থাকার কথা নয়। এখানে রয়েছে উর্বর জমি, মৌসুমি মাছের প্রাচুর্য এবং উপকূলীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ থাকলে এই চর গড়ে উঠতে পারে কৃষিভিত্তিক উৎপাদন কেন্দ্র, মৎস্যসম্পদের গুরুত্বপূর্ণ হাব এবং সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকায়। মোটরসাইকেল চালক মোহাম্মদ হৃদয় জানান, সন্দ্বীপগামী কলোনিবাজার ঘাটের ৫ কিলোমিটার পূর্বে উপকূলীয় বন আছে। হাফেজ মাইনুদ্দিন জানান, সেই বনে কেওড়া, গেওয়া, বাইন, নোনা (ঝাউ গোত্রের গাছ) গাছসহ আরো গাছ আছে। তবে পর্যটকরা যান দক্ষিণ উড়িরচরের রাস্তার মাথায়। সেখানে জিও ব্যাগ দিয়ে নদী ভাঙ্গন রোধ করা হয়েছে। বাইরে থেকে কোনো পর্যটক উড়িরচরে এলে তাদের থাকার জন্য সাধারণ হোটেল আছে। সোজা বাংলায় বোর্ডিং। কলোনিবাজারে দুলাল মিস্ত্রির হোটেল আছে। এ ছাড়া বাংলা বাজার ও জনতা বাজারেও বাইরে থেকে আসা লোকদের থাকার জন্য বোর্ডিং আছে। তবে এই সুযোগ-সুবিধা মোটেই পর্যাপ্ত নয়। বাস্তবতা হলো অবকাঠামোর অভাব, দুর্বল যোগাযোগ এবং দীর্ঘ দিনের অবহেলার কারণে এই উড়িরচরের অর্থনৈতিক ও পর্যটন সম্ভাবনাগুলো এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে উড়িরচর এক কঠিন বাস্তবতার নাম। এখানে মানুষ প্রতিদিন প্রকৃতির সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকে। ঘূর্ণিঝড়ের আতঙ্ক, নদীভাঙনের হুমকি, চিকিৎসা ও শিক্ষার সঙ্কট সবকিছু মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় জীবনের এক সংক্ষিপ্ত প্রতিচ্ছবি।
এখন প্রশ্ন একটাই- রাষ্ট্র কি এবার কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে উড়িরচরের পাশে দাঁড়াবে, নাকি এই জনপদ আবারো কোনো এক অজানা দুর্যোগের অপেক্ষায় থাকবে।