শীতে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় থাকে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। ফলে শীতে—সর্দি, কাশি, জ্বর, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ ঠান্ডাজনিত রোগে সহজে আক্রান্ত হন তারা। দেশে প্রতিবছর শীতে বহু মানুষের মৃত্যু হয় তাদের মধ্যে প্রবীণদের সংখ্যাই বেশি। শীতে শিশুরাও ঝুঁকিতে থাকে; তবে শিশুরা বাবা-মায়ের যতটা যত্নে থাকে, বয়োজ্যেষ্ঠরা ততটা যত্ন বা মনোযোগ পান না। ফলে কনকনে শীত ও ঘন কুয়াশায় নিম্ন আয়ের মানুষ—বয়স্কদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। বিশেষ করে ষাটোর্ধ্ব প্রবীণরা সবচেয়ে কষ্ট পেয়ে থাকেন।

তারা সারা বছরই কোনো না কোনো রোগে আক্রান্ত থাকেন, আর সেই রোগগুলোই শীতকালে তীব্র হয়ে ওঠে। তার মধ্যে অন্যতম—হাঁপানি, নিউমোনিয়া, জয়েন্ট পেইন, শ্বাসনালির প্রদাহ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতে প্রবীণদের একটা সমস্যা—হাইপোথার্মিয়া। এটি হচ্ছে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়া। শরীরের জন্য কেন্দ্রীয় তাপমাত্রা নিচে চলে গেলে সাধারণত হাইপোথার্মিয়া দেখা যায়। এটি সবার হতে পারে, কিন্তু বয়স্কদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

এ সময় অনেকেই হাড়ে ব্যথায় ভোগেন। কারণ শীতে শারীরিক চলাফেরা কমে যায় বলে, এই রোগের লক্ষণগুলো আরো বেড়ে যায়। তা ছাড়া আবহাওয়া বদলের কারণে হাড়ের জোড়ার অভ্যন্তরীণ বায়ুচাপে পরিবর্তন আনে। শীতে বয়স্কদের হাঁপানি সমস্যা প্রবল হয়। শীতের শুষ্ক আবহাওয়া, উড়ন্ত ধুলাবালি এর জন্য দায়ী। বিশেষ করে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়ে। ফলে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক সাবেক উপদেষ্টা ডা. মোজাহেরুল হক ইত্তেফাককে বলেন, শীতে প্রবীণদের বিশেষ করে শ্বাসকস্ট, শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ, হার্টের সঙ্গে লাঞ্চের সংক্রমণ, এসব জায়গায় ইনফেকশন হতে পারে। জ্বর, কাশি, গায়ে ব্যথা—এসব হতে পারে। যেহেতু তারা প্রবীণ তাই সঠিক সময় যদি চিকিত্সা না নেওয়া হয়, তাহলে ক্রণিক সমস্যায় রূপ নিতে পারে। সময়মতো উপযুক্ত চিকিত্সা না নিলে এই সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে তাদের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞ এই চিকিত্সক বলেন, এছাড়া এই সময়ে কোভিড থেকে শুরু করে ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং পানিবাহিত যে সমস্ত রোগ আছে, যেমন—ফুসফুসে আক্রান্ত হতে পারে, সেই সমস্ত রোগের কারণে অনেক সময় অনেক লোক সংক্রমিত হতে পারে এবং সময়মতো চিকিত্সা না নিলে বয়স্কদের মৃত্যুর ঝুঁকি আছে। প্রতিরোধে তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, এই সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। প্রাথমিক অবস্থায় চিকিত্সা নিতে হবে। আর নিউমোনিয়া ও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকাগুলো নিয়ে নেওয়া ভালো বলে জানান তিনি। 

জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সামনুন তাহা ইত্তেফাককে বলেন, শীতে প্রবীণদের শ্বাসকষ্ট সবচেয়ে বেশি হয়। বিশেষ করে আমাদের বয়স্ক ব্যক্তিরা একটা সময় ধূমপান করতেন। সে কারণে তাদের শ্বাসকষ্টজনিত রোগগুলো এমনিতেই বেশি। শীতের সময় ইনফ্লুয়েঞ্জা বেশি হয়। শ্বাসকষ্টের পরে যে সমস্যাগুলো নিয়ে আসেন তারা, তা হলো শরীর ব্যথা, এটি প্রবীণদের বড় সমস্যা। সেই সঙ্গে দেখা যায় অন্যান্য ইনফেকশন। যেমন প্রবীণদের প্রস্টেট বড় থাকে, ইউরিনের ইনকন্টিনিউ থাকে, শীতের কারণে প্রবীণরা অনেক সময় বিছানা থেকে ওঠে না, সে কারণে ইউরিন ইনফেকশন পাওয়া যায় বেশি। এর বাইরে হার্টের সমস্যা হয়। এটা হাঁটাচলার সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনেক সময় গ্রামাঞ্চলের মানুষের পর্যাপ্ত গরম কাপড় থাকে না। সে ক্ষেত্রে হাইপোথার্মিয়া একটা বিশাল সমস্যা। শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। তিনি বলেন, প্রত্যেক শীতে প্রবীণদের ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেওয়া প্রয়োজন। এই টিকা নিলে প্রবীণরা বেশকিছু রোগ থেকে বেঁচে যেতে পারেন। বিশেষ করে সর্দিজনিত এবং যাদের অ্যাজমা আছে। শ্বাসতন্ত্রের ইনফেকশনগুলো অনেক কমে যায়। শীতের সময় এমনিতে চলাফেরা কম হয়। যে কারণে তাদের সমস্যা দেখা দেয়। চলাফেরা কম হলে ঘুমের সমস্যা হয়। যে কোনো সময়ের চেয়ে শীতে প্রবীণদের বেশি সমস্যা তৈরি করে সব ক্ষেত্রে।

শীতে প্রবীণদের যত্নে পরামর্শ: হাইপোথার্মিয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বয়স্কদের। তাই শীতকালে ঠান্ডা বেশি পড়লে বয়স্কদের প্রতি অধিক যত্নবান হতে হবে। তাদেরকে অপ্রয়োজনে বাইরে যেতে অনুত্সাহিত করুন, বিশেষত সকাল ও রাতে। যথাসম্ভব ঘরে রাখতে হবে। তাদের উষ্ণতার জন্য যা যা প্রয়োজন তার ব্যবস্থা করতে হবে। কড়া ঠান্ডার প্রতিক্রিয়ায় তাদের ত্বক, হূদ্স্পন্দন ও শ্বাসক্রিয়াতে পরিবর্তন দেখলে রুম হিটারের ব্যবস্থা করতে পারেন। ঠান্ডার কারণে বয়স্করা একেবারেই নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়ে। তারা বিছানা ছেড়ে উঠতে চান না। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ শুয়ে বা বসে কাটালে বয়স্কদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই তাদেরকে দিনের কিছুটা সময় বয়স ‍উপযোগী হালকা ব্যায়ামে ব্যস্ত রাখা ভালো।

শীতে তৃষ্ণা অনুভব হয় না। ফলে শরীরের জন্য যতটুকু পানি প্রয়োজন তা যোগাতে তত্পর থাকে না। পর্যাপ্ত পানির অভাবে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রমের স্বাভাবিকতা ব্যাহত হতে পারে। যেমন—নিয়মিত মলত্যাগের চাপ কম আসে বা কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে। তাই ঠান্ডা আবহাওয়ায় বয়স্কদেরকে সুস্থ রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করাতে হবে। শীতের ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসে ত্বক শুস্ক হয়ে পড়ে। ফলে ত্বকের শুষ্কতা, চুলকানি বেড়ে যায়। তাই ত্বককে সজীব, কোমল ও সুস্থ রাখতে কিছু স্কিনকেয়ার প্রোডাক্টস ব্যবহারের প্রয়োজন। শীতের আশঙ্কায় বয়স্কদেরকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ গোসল না করিয়ে রাখা হয়। এতে করে ত্বকের সংক্রমণ ও চর্মরোগের ঝুঁকি বাড়ে। বয়স্কদেরকে সপ্তাহে দুই বার গোসল করানো উচিত বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews