কয়েকদিন আগেই বজ্রপাতে আমাদের দেশে অনেকগুলি মানুষের প্রাণহানী হল। ইদানীং বজ্রপাতে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। বজ্রপাতকে আদিকাল থেকে আঞ্চলিকভাবে ‘ঠাটা পড়া’ কিংবা ‘বাজ পড়া’ বলা হয়। গবেষকরা বলেছেন, প্রকৃতিতে পজেটিভ ও নেগেটিভ চার্জের বিনিময় বেশি হলে বজ্রপাতের সংখ্যা বাড়ে। আবহাওয়াবিদেরা বলেন, মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশের আবহাওয়া বেশী পরিবর্তন হয়। মার্চের আগে শীতের শেষের দিকে উত্তর দিক হিমালয় থেকে শীতল ও শুষ্ক বাতাস বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং ওই সময়ে আবার দক্ষিণ দিক বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয়বাষ্পপূর্ণ গরম বাতাস প্রবেশ করতে থাকে। এর ফলে গরম ও ঠা-া বাতাসের সংঘর্ষ হয়, যার দরুন প্রচুর পজেটিভ ও নেগেটিভ চার্জ সৃষ্টি হয়ে বজ্রের আকার ধারণ করে। বজ্র থেকে আকাশে বিজলি চমকাতে থাকে।

গবেষণায় উল্লেখ আছে, গরম বাতাস ঠা-া বাতাসের চেয়ে হালকা হয় ও ঘনত্ব কম থাকে বিধায় গরম বাতাসের অণুগুলো ঠা-া বাতাসের ঘন ও ভারী অণুর ওপর ভাসতে থাকে। ঠা-া বাতাসের অণুর ওপরে উঠে গরম বাতাসের অণুগুলো ঠা-া হয় এবং গতি ধীর হয়। অণুগুলো পরস্পর আরো বেশি নিকটবর্তী হতে থাকে। একই সাথে এটা নিচের দিকে ডুবে যেতে থাকে। গরম ও ঠা-া বাতাসের অণু এভাবে ওপর ও নিচে আন্দোলিত হতে থাকলে প্রচুর বৃষ্টি হতে থাকে। বায়ুম-লে গতিশীল বিদ্যুতের সৃষ্টি হলে বিশাল আয়তনের কালো মেঘের সৃষ্টি হয়। মাঝে মধ্যে এ কালো মেঘগুলো থেকে বজ্রঝড়ের সৃষ্টি হয়। গবেষকেরা বলেছেন, বায়ুম-লে পজেটিভ নেগেটিভ চার্জের পরিমাণ বেশি হলে তা অনেক সময় ভূপৃষ্ঠে আঘাত করে। এ সময় খোলা স্থানে মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী থাকলে এরা প্রচুর পরিমাণে চার্জযুক্ত হয়ে হার্টের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যায়।

পরিবেশবিদেরা বলেছেন, আবহাওয়া দূষিত হওয়ায় প্রকৃতিতে সালফার ও নাইট্রোজেনের পরিমাণ বেড়েছে। যার ফলে সালফার ও নাইট্রোজেনের অণুগুলো পরস্পর যুক্ত হয়ে প্রকৃতিতে চার্জের পরিমাণ বাড়ায় ও বজ্রপাতের সৃষ্টি হয়। আমাদের দেশে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত কালবৈশাখী হয়ে থাকে। এ সময়ই বেশি বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। তবে এর আগে পরেও হতে পারে। তাই এ সময়টা চলতে হয় সাবধানতার সাথে। দূরের পথে বের হলে জেনে নিতে হবে আকাশের খবর, মানে আবহাওয়ার খবর। মেঘের আনাগোনা দেখেও ধারণা করতে পারেন বজ্রপাত হতে পারে কি না। উত্তর-পশ্চিম, পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর আকাশে মেঘের গর্জন শুরু হলে সাধারণত বজ্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। পূর্ব, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে বজ্রপাতের সম্ভাবনা কম থাকে। মার্চ থেকে এপ্রিলে কালবৈশাখী দুপুরের পর হয়ে থাকে। এরপর মে মাসের শেষ পর্যন্ত সকালেও হতে পারে। কালবৈশাখী শুরু হলে সাথে সাথে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হবে। নিরাপদ আশ্রয় বলতে পাকা ঘরকে বোঝানো হয়। অর্ধ শেড, পুরনো-জীর্ণ বাড়িতে আশ্রয় না নেয়াই ভালো। বাড়িতে অবস্থান করলে জানালা, সিঙ্ক, টয়লেট, বাথটাব, ইলেকট্রনিক্স থেকে দূরে থাকা ভালো। বাসা, অফিস কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হলে বিদ্যুতের সব সুইচ বন্ধ রাখুন। অনেক সময় এসবে বজ্রপাত হয়ে তা থেকে বিদ্যুৎ লাফিয়ে আপনার শরীরে আসতে পারে। গাছের নিচে, টেলিফোনের খুঁটির পাশে বা বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইনের খাম্বা বা উঁচু কোনো দালানের পাশে দাঁড়ানো মোটেই নিরাপদ নয়। টেলিফোনের লাইনে বজ্রপাত হলে সে সময় আপনি কথা বলতে থাকলে আক্রান্ত হতে পারেন। তাই এ সময় ফোনে কথা না বলাই ভালো। তবে মোবাইলে কথা বললে সমস্যা নেই। বজ্রপাতের সময় বাহিরে গোসল না করাই ভালো।

এ সময় গাড়িতে থাকলে সমস্যা নেই। তবে গাড়ি থামিয়ে দরজা বন্ধ করে বসে থাকুন। অনেক সময় আছে যখন নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না তখন নিজেকে যতটা সম্ভব গুটিয়ে নিন। মাথার চুল যদি এক দিকে লম্বা হয়ে থাকে তা হলে বজ্রপাত পড়ার সম্ভাবনা বেশি। কারণ বজ্রপাত সব সময় উঁচুতে আঘাত করে। আপনার পায়ের পাতার ওপর ভর দিয়ে বসুন। দুই পা যতটা সম্ভব কাছাকাছি আনুন। দুই হাত রাখুন হাঁটুর ওপর। এবার মাথা নিচু করুন যতটা সম্ভব। তবে কোনোভাবেই হাত বা হাঁটু মাটিতে লাগাবেন না। এটি করলে আপনি সহজেই বিদ্যুতায়িত হয়ে পড়বেন। অনেকে মনে করেন বজ্রপাতের সময় শুয়ে পড়তে হয়। এটি খুবই মারাত্মক ভুল ধারণা। এতে বজ্রপাতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। যদি নদীতে নৌকায় থাকেন তা হলে একই ভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখুন। সম্ভব হলে ছইয়ের নিচে অবস্থান নিতে পারেন। বনের মধ্যে থাকলে বড় গাছের নিচে না অবস্থান করে ছোট গাছপালার নিচে নিজেকে গুটিয়ে রাখুন।

কেউ বজ্রপাতে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকে যতটা দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিতে হবে। বজ্রপাতে আক্রান্ত হবার পর তাকে ধরলে কোনো সমস্যা নেই কারণ এ সময় তার শরীরে বিদ্যুৎ থাকে না। যদি শ্বাস না নেয় তা হলে চিৎ করে শোয়ানোর পর মুখ হা করান। এবার আপনি বুক ফুলিয়ে বাতাস নিন। তার মুখের সাথে মুখ লাগান। তার নাক চাপ দিয়ে বন্ধ করে আপনি ফু দিয়ে বাতাস দিন। যদি নাড়ির স্পন্দন না থাকে তা হলে বুকে চাপ দিতে থাকুন ও মুখে মুখ লাগিয়ে বাতাস দিন।

মো. লোকমান হেকিম
চিকিৎসক-কলামিস্ট
মোবা: ০১৭১৬-২৭০১২০



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews