রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ইমারত নির্মাণে অনুমোদিত নকশা ব্যত্যয় ঘটানোর আইনকে আরো কঠোর করেছে। উদ্দেশ্য রাজউকের অনুমোদিত নকশা (প্ল্যান) অনুসরণ না করে নিজের মতো ইমরাত নির্মাণ করলে নির্মাণকারীকে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান করা হয়েছে (২০২৬ সালের ১৩ নম্বর অধ্যাদেশ)। অপরদিকে জলাশয় ভরাট নিয়েও আরেকটি ভালো আইন করেছে রাজউক। এ ব্যাপারে অধ্যাদেশে, জলাশয় ভরাট বা ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন করলে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা জরিমানা ও ১০ বছরের জেলের কথা বলা হয়েছে। জলাশয় আইন ভঙ্গ করলে রাজউক কর্মকর্তারাও দায়ী থাকবেন বলা হয়েছে এবং প্রমাণিত হলে তারাও শাস্তি পাবেন। এ ব্যাপারে পুরনো টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট বাতিল করে আধুনিক আইনটি চালু করা হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। এই আইন ঢাকার পাশাপাশি সাভার, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকাতেও প্রযোজ্য হবে।
কিন্তু নির্মাণের সাথে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, প্রকৌশলীরা বলছেন আইনটি যথাযথ হয়েছে, প্রয়োগ করতে পারলে রাজউকের আওতাধীন এলাকায় নির্মাণে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। কিন্তু এটা বাস্তবায়ন হবে কি না- তা নিয়েই যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অনেক অনেক ভালো আইনের মতো এই আইনটিও শেষ পর্যন্ত আইনি বইতেই সীমাবদ্ধ থাকার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, আইন যারা প্রয়োগ করবেন তাদের আন্তরিকতা না থাকলে তা বাস্তবায়ন হওয়া সম্ভব হবে না।
নির্মাণের সাথে যুক্ত প্রকৌশলী রাশিদুল হাসান বলেন, রাজউকের আওতার মধ্যে গড়ে উঠা ভবনগুলো পরিদর্শন করলেই রাজউক কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা সম্পর্কে বেশ ধারণা পাওয়া যাবে। রাজউক থেকে নকশা বা প্ল্যান অনুমোদন করিয়ে নিয়ে যাওয়ার পর ভবনটি শেষ হওয়া পর্যন্ত রাজউকের পরিদর্শকদের নজরে থাকার কথা। পরিদর্শকরা কাজটি করেও থাকেন কিন্তু রাজউকে তিনি যথাযথ রিপোর্টটি জমা দেন না। নকশা ব্যত্যয় করলেও তিনি ম্যানেজ হয়ে যেতে পারেন এবং রাজউকে যে রিপোর্টটি দিয়ে থাকেন তা বাস্তবের বিপরীত। প্রকৌশলী রাশিদুল হাসান বলেন, বরং বলা যায় রাজধানীর ইমারত নির্মাণে যে বিশৃঙ্খলা হয়েছে বা হচ্ছে এর জন্য রাজউকের পরিদর্শকরা দায়ী। তাদের সামনেই নকশা ব্যত্যয় করে ভবন নির্মাণ হয়ে থাকে কিন্তু তারা রাজউকে যথাযথ রিপোর্ট করেন না। তা ছাড়া ইমারত পরিদর্শকরা ছাড়াও আরো অনেকেই এসব কাজে জড়িত। রাজউকের অফিস পরিদর্শনে গেলে এসব আলোচনা ওপেনলি হয়ে থাকে, সবাই শুনেন কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
আরেকজন প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ বলেন, এভাবে আইন করে ইমরাত নির্মাণে খুব বেশি উন্নয়ন সম্ভব নয়। বরং আরো বাস্তবসম্মত আইন করা যেতে পারে। আগে দেখতে হবে মানুষ কেন রাজউক থেকে অনুমোদিত নকশা যথাযথ বাস্তবায়ন করে না। কেন তারা, আইন ভেঙে নিজের মতো করে ভবন নির্মাণ করে? এই প্রশ্নের উত্তর থেকেই সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে বলে প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ দাবি করেছেন।
নির্মাণশিল্পের সাথে জড়িতরা বলছেন, নির্মাণকারীরা আইন ভঙ্গ করতে ভয় পান না। কারণ, রাজউকের লোকজন রাতের বেলা সাইট অফিসে পরিদর্শনে এসে তাদের ‘প্রাপ্যটা’ নিয়ে যান। এই প্রাপ্যটা শুধু পরিদর্শক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে না, আরো উপরের দিকে যায়। ফলে একেবারে উপরের মহল থেকে কোনো চাপ না এলে কোনো সমস্যা হয় না। আবার রাজউকের মোবাইল কোর্ট ভবনের অননুমোদিত অংশ ভেঙে দিয়ে আসার কিছুদিন পরই ভাঙা ভবন সংস্কার করে আগের মতোই ব্যবহার হচ্ছে। মোবাইল কোর্ট যদি যেখানে ব্যবস্থা নিয়েছে সেখানে একমাস পর আবার পরিদর্শনে গেলে এসব কথার সত্যতা পাওয়া যাবে বলে নির্মাণশিল্পের সাথে জড়িতরা জানিয়েছেন।