বর্তমান বিশ্ব এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষ, অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর চরম লাঞ্ছনা ও পরনির্ভরশীলতা। বিশ্বের মানচিত্রে ৫৭টি মুসলিম দেশ, অফুরন্ত খনিজ সম্পদ আর ২০০ কোটির এক বিশাল জনসমষ্টি থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন এত পরাধীন? মক্কা-মদিনার খাদেমরা বা আরবের প্রভাবশালী শেখরা কেন এই পরিস্থিতির সামনে অসহায়? কেন ২০০ কোটি মুসলমান আজ পৃথিবীর সবচাইতে দুর্বল জাতি? এর উত্তর একটিই। আমাদের তেল আছে; কিন্তু সেই তেল রক্ষার তলোয়ার (প্রতিরক্ষা শক্তি) নেই, আমাদের অঢেল টাকা আছে; কিন্তু সেই টাকা দিয়ে বিশ্ব পরিচালনার মগজ (জ্ঞান) নেই।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুসলিম উম্মাহকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। সূরা আল-ইমরানের ১১০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছেÑ ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে; তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দাও ও অসৎকাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখো।’ কিন্তু এই শ্রেষ্ঠত্বের শর্ত ছিল জ্ঞান, আমল এবং দাওয়াত। আজ ২০০ কোটি মুসলিমের বিপরীতে মাত্র এক কোটি ৭০ লাখ ইহুদি পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ, তারা জ্ঞানকে অস্ত্র বানিয়েছে।
মুসলিম বিশ্ব তার স্বর্ণযুগের ইতিহাস নিয়ে তার অর্জনÑ বীজগণিত, আলোকবিদ্যা চিকিৎসাবিদ্যা ইত্যাদি নিয়ে গর্ববোধ করে, আধুনিক যুগের রূঢ় বাস্তবতা হলোÑ এ উম্মাহ আজ বিজ্ঞানচর্চায় যোজন যোজন পিছিয়ে। বিশাল মুসলিম জনসংখ্যার বিপরীতে বিজ্ঞান বিভাগে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সংখ্যা মাত্র তিনটি (পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান মিলিয়ে)। অথচ মাত্র এক কোটি ৭০ লাখের ক্ষুদ্র এক জাতি হয়েও ইহুদিরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ১১০টিরও বেশি নোবেল পুরস্কার জয় করেছে। এই আকাশ-পাতাল ব্যবধানই প্রমাণ করে, জ্ঞানের অন্বেষণ আজ আমাদের কাছে বিলাসিতা আর আরাম-আয়েশের নিচে চাপা পড়ে গেছে। এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের সেই কঠোর বুদ্ধিভিত্তিক কৌতূহল থেকে এক বিশাল বিচ্যুতি। সূরা আদ-দুখানের ৪৪:৩২ নম্বর আয়াত যেমন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, অতীতে অন্যদের জ্ঞানের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছিল, তেমনি বর্তমানের এই স্থবিরতা আমাদের কেবল অতীত গৌরব নিয়ে পড়ে না থাকার কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়। আবিষ্কারের সামনের সারিতে নিজেদের আসন পুনরায় দখল করতে হলে, মুসলিম বিশ্বকে কেবল ‘ভোক্তা’ হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় সেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধির চর্চায় ফিরতে হবে যা একসময় আমাদের ঐতিহ্যের পরিচয় ছিল।
মরুভূমির বুকে আজ কাচের বিশাল সব অট্টালিকা। আরবের শেখরা আজ প্রতিযোগিতায় নেমেছে কার টাওয়ার কত উঁচুতে উঠবে। এ প্রসঙ্গে একটি চিরন্তন সত্য উঠে আসেÑ আরবদের আকাশচুম্বী টাওয়ার আছে; কিন্তু আকাশচুম্বী মিসাইল নেই। শেখরা বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু ভবন বুর্জ খলিফা টাওয়ার আর বিলাসবহুল প্রাসাদ বানাতে ব্যস্ত, অথচ উম্মাহর নিরাপত্তার জন্য, প্রযুক্তির জন্য পশ্চিমাদের মুখাপেক্ষী। এই বিলাসিতা আমাদের ঈমানি তেজকে শুষে নিয়েছে। যখন অট্টালিকার উচ্চতা বাড়ে, তখন মানুষের আত্মিক ও ঈমানি শক্তি নি¤œমুখী হয়।
ইসলামে কোনো বংশীয় রাজতন্ত্রের স্থান নেই; এটি একটি অনৈসলামিক ব্যবস্থা, যা পশ্চিমা বিশ্ব তাদের স্বার্থে তৈরি করেছিল। এই রাজপরিবারগুলো মূলত অতীতের সাধারণ উপজাতীয় সমাজ থেকে আসা মানুষের উত্তরসূরি, যাদের পশ্চিমা শক্তিগুলো দাবার ঘুঁটি হিসেবে বসিয়েছিল। আজ সেই রাজা ও রাজপুত্ররা ক্ষমতা ছাড়তে চাইছেন না এবং পশ্চিমা প্রভুদের সন্তুষ্টির জন্য কুরআনের বিধান সূরা মায়িদার ৫১ (ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা) অমান্য করছেন।
আমি গোয়েন্দা সংস্থায় কিছু সময় দায়িত্ব পালনের সুবাদে দেখেছি, কীভাবে ‘হানি ট্র্যাপ’ বা নারী ও লালসার ফাঁদে ফেলে এই শাসকদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। ইহুদি গোয়েন্দারা আজ মুসলিম শাসকদের ‘বেডরুম’ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ফলে অঢেল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও উম্মাহর কোনো সামরিক ওজন তৈরি হচ্ছে না। সত্য এই যে, বিশ্বের অনেক মুসলিম ব্যবসায়ী আছেন, যারা চাইলে বিল গেটস বা ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেরদের অনায়াসেই পকেটে ভরে রাখতে পারেন।
ট্র্যাজেডি হলোÑ এই বিশাল সম্পদ পশ্চিমা ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত এবং আমাদের টাকায় কেনা অস্ত্র দিয়েই আমাদের ভাইদের ওপর আক্রমণ করা হয়। ‘পেট্রো-ডলার’ চুক্তির মাধ্যমে আমরা পশ্চিমাদের সেবাদাসে পরিণত হয়েছি। নেতৃত্বের এই চরম অভাব এবং ব্যক্তিগত লোভের কারণে আমরা আজ ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না।
ইহুদিরা আজ বিশ্ব শাসন করছে মূলত দুটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েÑ এক হলো, ‘সুদ’ আর দুই হলো ‘মিডিয়া’। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, প্রতিটি রাষ্ট্রকে সুদি ব্যবস্থার জালে বন্দি করা হয়েছে। আইএমএফ এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক মূলত জায়নবাদী নীতিমালার মাধ্যমেই মুসলিম দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে শোষণ করছে। আল্লাহ সুদকে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল বলেছেন। আমরা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে কীভাবে বরকত আশা করতে পারি?
এর পাশাপাশি রয়েছে মিডিয়ার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। তারা সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে পরিবেশন করে। ফিলিস্তিনের ওপর চলা নির্মম গণহত্যাকে তারা ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে প্রচার করে। মুসলিম তরুণদের মনে হীনম্মন্যতা ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরা আজও একটি আন্তর্জাতিক মানের মিডিয়া হাউজ তৈরি করতে পারিনি, যা পশ্চিমাদের এই প্রোপাগান্ডার জবাব দিতে পারে।
ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে বাধা দেয়া হচ্ছে কারণ পরাশক্তিগুলো জানে, একটি ঐক্যবদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্র তাদের জন্য হুমকি। কিন্তু বাস্তব সত্য হলোÑ মুসলিমদের হাতে যদি শত পারমাণবিক অস্ত্রও থাকে, তবে তা কোনো কাজে আসবে না, যদি আমাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব থাকে। আমেরিকা ও ইসরাইল শত শত বোমা নিয়ে আমাদের হুমকি দিচ্ছে; কিন্তু আমাদের ঈমানি ঐক্য যেকোনো ভৌত পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে শতগুণ বেশি শক্তিশালী। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নৌবাহিনী গঠন করেছিলেন হজরত উসমান (রা.), যা ভূমধ্যসাগরে মুসলিম আধিপত্য নিশ্চিত করেছিল। আজ সেই সমরকৌশল ও নৌশক্তির গুরুত্ব অনুধাবনের বদলে আমরা অনৈক্যে নিমজ্জিত।
যদি পশ্চিমাদের ‘ন্যাটো’ থাকতে পারে, তবে ৫৭টি মুসলিম দেশের কেন একটি সম্মিলিত সামরিক জোট বা ‘মুসলিম ডিফেন্স অ্যাক্ট’ থাকবে না? একটি মুসলিম দেশের ওপর আক্রমণ মানে পুরো উম্মাহর ওপর আক্রমণ, এই নীতিতে অটল থাকলে আজ ফিলিস্তিন বা ইরানের ওপর কেউ চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেত না। যদি আজ শিয়া-সুন্নি বিভাজন ভুলে আরবের সম্পদ এবং এই উপমহাদেশের বিশাল জনশক্তি এক হতো, তবে বিশ্ব রাজনীতির সমীকরণ মুহূর্তেই বদলে যেত। আমাদের এই কৃত্রিম অনৈক্যই আজ শত্রুর সবচাইতে বড় শক্তি, আর আমাদের ঐক্যই তাদের জন্য সবচাইতে বড় আতঙ্ক।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত ইসলামী নেতৃত্বের দিকে ফিরে আসা কি আদৌ সম্ভব? বা এই কঠিন কাজের সূচনা করবে কে? এক্ষেত্রে ইরান আজ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি বিশাল দৃষ্টান্ত। ইরান আজ যেভাবে ইসরাইল এবং আমেরিকার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে একা লড়ে যাচ্ছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন।
১৯৭৯ সালের আগে ইরানও একটি শক্তিশালী রাজতন্ত্র দ্বারা শাসিত ছিল, যারা ছিল আমেরিকার পরম বন্ধু। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারল, তাদের সম্পদ পশ্চিমাদের স্বার্থে ব্যয় হচ্ছে, তখন তারা রাজপথ দখল করে বিপ্লব ঘটায়। আজ ইরান একা লড়তে পারছে, কারণ তারা পশ্চিমাদের থেকে অস্ত্র কেনে না; বরং নিজেরাই তা তৈরি করে। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার জন্য আমাদের প্রয়োজনÑ
১. বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ। ২. নির্ভীক ওলামা সমাজ। ৩. আত্মনির্ভরশীলতা।
ইরান প্রমাণ করেছে, পশ্চিমা শৃঙ্খল ছিঁড়ে বের হতে পারলে একা লড়াই করার সাহস পাওয়া যায়। আরব উম্মাহকেও আজ এই সাহসিকতা অর্জন করতে হবে।
আমরা আজ শুধু মুনাজাত করছি; কিন্তু বাস্তব আমল বা পদক্ষেপ নিচ্ছি না। আল্লাহ কুরআনে আমাদের শ্রেষ্ঠ জাতি বলেছেন; কিন্তু আমরা আজ লাঞ্ছিত। সুতরাং, আমরা যতই মুনাজাত করি না কেন, মূল নির্দেশনা অনুসরণ না করা হলে আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করবেন না। আমাদের করণীয় হলোÑ
১. জ্ঞানের বিপ্লব। ২. সুদমুক্ত অর্থনীতি এবং ৩. অনৈসলামিক শাসনের বিলোপ করতে হবে।
প্রশ্ন হলোÑ উম্মাহ কি কেবল দর্শক হয়েই থাকবে? না, সময় এসেছে জেগে ওঠার। আমাদের তেল আছে, টাকা আছেÑ এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক জ্ঞানের প্রয়োগ এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা শক্তি। পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় শক্তি হলো আমাদের ঈমানের ঐক্য। শিয়া-সুন্নি বিভাজন ভুলে আমরা যদি একে অপরের হাত ধরি এবং সূরা মায়িদার বিধান অনুযায়ী শত্রুদের চিহ্নিত করি, তবেই আমরা ফিরে পাবো আমাদের হারানো শৌর্য ও গৌরব।
লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য বিইউপি