আমেরিকা–ইসরাইল–ইরান যুদ্ধ বিশ্বরাজনীতিতে নতুন এক অস্থিতিশীলতা ও আতঙ্কের ঢেউ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত ইসরাইল–ইরান সংঘাতে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। ইরানের একটি স্কুলে শতাধিক শিশু নিহত হওয়ার ঘটনাও বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে। মার্কিন কিংবা ইসরাইলি বাহিনীর আক্রমণে ওই স্কুলের শিশুরা মারা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। মিসাইল ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অগ্নি আঘাতে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে তৈরি হয়েছে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। যুদ্ধের এই ঢেউয়ে টালমাটাল হয়ে উঠেছে গোটা বিশ্ব।
এই যুদ্ধে ব্রিটেন রাষ্ট্র হিসেবে সরাসরি জড়ায়নি। তবে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের কিছু সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের সরকার অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগ্রাসী যুদ্ধকে সমর্থন করলেও বর্তমানে লেবার পার্টির রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনমতের চাপকে উপেক্ষা করা তাদের পক্ষে সহজ হয়নি। ফলে কিছু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তাদের অবস্থান তুলনামূলক সংযত, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের অসন্তোষের কারণও হয়েছে। এ নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ হয়েছে, শান্তির পক্ষে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছে।
কিন্তু এই শান্তির পদযাত্রার মাঝেই ইরানপন্থী কিছু মানুষের কর্মকাণ্ড ম্যানচেস্টারকে বিতর্কের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে। ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার প্রতিবাদে গত ৪ মার্চ বিক্ষোভের জন্য একদল মানুষ জড়ো হলে বিপরীত অবস্থানের আরেকটি পক্ষও সেখানে উপস্থিত হয়। ফলে পুরো শহরে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর মধ্যেই কয়েকজন মুখোশধারী অশ্বারোহী বিক্ষোভকারীর উপস্থিতি আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। অবৈধভাবে ঘোড়ায় চড়ে তাদের উপস্থিতিকে পুলিশ চ্যালেঞ্জ করলেও তারা তাতে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
ম্যানচেস্টারের এই ঘটনাকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আবারও একটি পুরোনো প্রশ্নকে সামনে এনেছে—অর্থাৎ বহুসাংস্কৃতিক এই সমাজে ধর্মীয় পরিচয়, প্রবাসী রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামোর সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
কিছু ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে দাবি করা হয়, ওই ঘোড়সওয়ার ব্যক্তিরা নাকি “শরিয়া আইন কার্যকর” করার পক্ষে কথা বলতে এখানে উপস্থিত হয়েছিল। এমনকি স্থানীয় প্রভাবশালী পত্রিকা ম্যানচেস্টার ইভনিং নিউজ এবং ডেইলি মেইলও বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিরোনাম প্রকাশ করে। পত্রিকা দুটিতে ‘শরিয়া আইন’ এবং অশ্বারোহীদের প্রশ্নটি বেশ আলোচনায় উঠে আসে। যদিও এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবু ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ বিষয়টি কেবল একটি ভিডিও বা বিক্ষোভের মুহূর্ত নয়; বরং এটি যুক্তরাজ্যের মতো আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে সমান্তরাল আইন বা ধর্মীয় কর্তৃত্বের ধারণা কতটা গ্রহণযোগ্য কিংবা উগ্র জাতীয়তাবাদীদের প্রপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য একটি প্লট সৃষ্টি হয়ে যায়—সেই প্রশ্নটিই উঠে আসে।
প্রথমেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন, যুক্তরাজ্যের সংবিধানিক ও আইনি কাঠামোর বাইরে কোনো ধর্মীয় আইনের বাস্তব প্রয়োগের সুযোগ নেই। ব্রিটিশ আইনই সেখানে একমাত্র বলবৎ আইন। ধর্মীয় পরামর্শ বা সামাজিক সালিশি ব্যবস্থার কিছু কাঠামো থাকলেও সেগুলো কখনোই রাষ্ট্রীয় আইনের বিকল্প নয়। সুতরাং শরিয়া আইনকে একটি সমান্তরাল আইনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে ধারণা মাঝে মাঝে আলোচনায় আসে, তা কেবল বাস্তবতাবিবর্জিতই নয়; বরং সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন তৈরির ঝুঁকিও বহন করে।
ম্যানচেস্টারের ঘটনাটি আরেকটি দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতেই উল্লেখ করা হয়েছে, ওই দিন শহরে ইরানকে ঘিরে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষের বিক্ষোভ চলছিল—একটি দল ইরানের বর্তমান শাসকব্যবস্থার সমর্থক, অন্যটি তার তীব্র বিরোধী। প্রবাসী ইরানিদের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান যুক্তরাজ্যের রাস্তায় উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করে। সেই মুহূর্তেই ঘোড়ায় চড়া কয়েকজন ব্যক্তির উপস্থিতি ভিডিওতে ধরা পড়ে এবং ঘটনাটি দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু এই ধরনের প্রবাসী রাজনীতির সংঘাত একটি বিতর্কিত কিংবা সমস্যাজনক বাস্তবতা। অন্য দেশের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব যখন প্রবাসের মাটিতে প্রকাশ পায়, তখন তা অস্থিরতার ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে এটি ইসলামোফোবিয়াকে আরও উসকে দিতে পারে। উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর জন্য এ ধরনের ঘটনা অনেক সময় অভিবাসনবিরোধী প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যুক্তরাজ্যের মতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা যদি বিদেশি রাজনৈতিক সংঘাতের প্রতিফলন হয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে, তবে তা শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষের জন্যই ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না।
শরিয়া আইন নিয়ে বিতর্কও এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচিত হয়েছে। বাস্তবে যুক্তরাজ্যের মুসলিম সমাজের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই রাষ্ট্রীয় আইন এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের জীবন পরিচালনা করে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এরকম অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর বয়ান অনেক সময় পুরো একটি সম্প্রদায়কে সন্দেহের চোখে দেখার পরিবেশ তৈরি করে। এটি যেমন মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য ক্ষতিকর, তেমনি বহুসাংস্কৃতিক সমাজের সহাবস্থানের ধারণাকেও দুর্বল করে।
অতএব, ম্যানচেস্টারের এই ঘটনাকে ঘিরে দুটি বিষয় পরিষ্কারভাবে আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, যুক্তরাজ্যের আইনি কাঠামোর ভেতরে শরিয়া আইন প্রয়োগের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এবং এমন কোনো প্রচেষ্টা সমাজের জন্য নেতিবাচক, অনৈতিক তথা বেআইনি হবে। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদেশি রাজনৈতিক সংঘাতকে যুক্তরাজ্যের রাস্তায় টেনে আনা—সেটিও সমানভাবে উদ্বেগজনক।
বহুসাংস্কৃতিক সমাজের শক্তি তার বৈচিত্র্যে। সেই বৈচিত্র্যকে আরও শক্তিশালী করতে হয় রাষ্ট্রের সাধারণ আইনি কাঠামো এবং নাগরিক নীতির প্রতি সকল নাগরিকের সম্মান প্রদর্শন ও আস্থার মধ্য দিয়ে। ম্যানচেস্টারের সাম্প্রতিক বিতর্ক তাই শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরে—ধর্মীয় বা বিদেশি রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রের আইন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাই নাগরিক জীবনের অভিন্ন ভিত্তি।
লেখক: ব্রিটেন প্রবাসী কলাম লেখক।
এইচআর/এএসএম