জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে দেশের বিভিন্ন এলাকার পেট্রল পাম্পগুলোতে। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে হাতেগোনা কয়েকটি পাম্পে থেকে পাওয়া যাচ্ছে সামান্য তেল। বাকি পাম্পগুলো বেশির ভাগ সময় থাকছে বন্ধ। এতে করে তেলের সঙ্কট দিন দিন তীব্র আকার ধারণ করছে। এর জেরে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।

জ্বালানি তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অপচয় হচ্ছে শত শত কর্মঘণ্টা। পাম্পলোতে অপেক্ষা করতে করতে গ্রাহকরা এতটাই রুক্ষ হয়ে উঠছেন যে অল্পতেই একে অপরের ওপর চড়াও হচ্ছেন। এমনকি জরুরি সেবার গাড়িগুলোকে বিশেষ সুবিধায় তেল নিতেও বাধা দিচ্ছেন তারা।

পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন তারা। ভয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি ছাড়া পাম্প চালু করার সাহস পাচ্ছেন না। তাদের দাবি এই মুহূর্তে সরকারের পক্ষ থেকে পাম্পের নিরাপত্তা প্রদান ও গ্রহকদের সচেতন করার কর্মসূচি হাতে নেয়া উচিত। যাতে করে গ্রাহকদের মধ্যে প্যানিক বায়িংয়ের প্রবণতা কমে যায়। এ দিকে গ্রাহকরা বলছেন, সরকারের বক্তব্য এবং পাম্প কর্তৃপক্ষের আচারনের মিল না পাওয়ায় অনেকেই উদ্বিগ্ন হয়ে বাড়তি তেল কিনছেন। এ জন্য সরকারের উচিত প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে গ্রাহকদের সচেতন করা। কারণ এটা বৈশ্বিক সমস্যা। ঠিকমতো সচেতন করতে পারলে হয়তো জনগণ বিষয়টি বুঝবে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পেট্রল পাম্পে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। কোনো কোনো পাম্প বন্ধ থাকলেও রাস্তায় রয়েছে তেলপ্রত্যাশী যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। অনেকেই আগের রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। আর যে সব পাম্প তেল দিচ্ছে সেখানে চলছে রীতিমতো যুদ্ধ। কেউ কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে যে যেভাবে পারছেন সেভাবেই গাড়ি ঢুকিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন। এসব যানবাহনের লাইন ও তেল নেয়ার যুদ্ধের কারণে রাস্তায় দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ যানজট।

দুপুরে শেওড়াপাড়া সোবহান ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় সেটি বন্ধ। শিকল দিয়ে চারপাশ আটকে রাখা হয়েছে। বাইরে সাঁটিয়ে দেয়া হয়েছে ‘বন্ধ’ লেখা ব্যানার। কিন্তু তবু এই পাম্পটি ঘিরে প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের লম্বা লাইন। এক লাইনে প্রাইভট কার, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ ভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহন। তার সাথে লাগানো অপর সারিতে রয়েছে মোটরসাইকেল। রোকেয়া স্মরণির প্রায় তিন ভাগের একভাগ জায়গা দখল করে রাখায় দেখা দিয়েছে যানজট। পাম্পের গেটের প্রথম দিকে তেলের জন্য দাঁড়িয়ে প্রাইভেটকার চালক আব্দুল মোতালেব জানান, তিনি আগের রাত অর্থাৎ মঙ্গলবার রাত ১২ দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। সারারাত এখানেই কাটিয়েছেন। দুপুরের পর তেল দেয়া শুরু করলে তিনি প্রথম দিকে তেল পাবেন বলে আশা করছেন।

মোতালেব বলেন, সব থেকে কষ্টে রয়েছেন প্রাইভেট কারের চালকরা। তারা চাকরি করেন দিনের বেলা গাড়ি চালানোর। কিন্তু এখন সারারাত তেলের জন্য অপেক্ষা করে আবার দিনের বেলা গাড়ি চালাতে হয়। পাম্পের ভেতরে পেছনের দরজা দিয়ে তাদের অফিসে ঢুকে দেখা যায় ম্যানেজার মিজানুর রহমান বসে আছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার পাম্পের জন্য আগে দিনে ৬ হাজার লিটার তেল পেতেন। কিন্তু সম্প্রতি তাকে সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার দেয়া হচ্ছে, যা খুব কম সময়ে শেষ হয়ে যাওয়ায় অনেক গ্রাহক অপেক্ষা করেও তেল পান না। তার মতে, গ্রহকদের প্যানিক বায়িং বন্ধ করতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে এই সমস্যা সমাধান করা কঠিন হবে।

আগারগাঁও হাসান ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় পাম্পে তেলের গাড়ি আসায় কর্তৃপক্ষ মাত্র সরবরাহ শুরু করবেন। কিন্তু গ্রহকরা এমনভাবে হুড়াহুড়ি শুরু করে যে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশও সামাল দিতে পারছে না। ম্যানেজার সুজন জানান, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তেল শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু এই কয়েক ঘণ্টা প্রচণ্ড আতঙ্কে থাকতে হয়। কারণ গ্রাহকরা এতোটাই উত্তেজিত থাকে যে, যেকোনো সময় ভায়োলেন্স হতে পারে। সেখানে দেখা যায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু উত্তেজিত মোটরসাইকেল চালকরা তাদের পায়ের ওপর দিয়ে বাইক তুলে দিতেও দ্বিধাবোধ করছে না। গ্রাহকরা জরুরি সেবার বাহনগুলোকেও বিশেষ সুবিধা দিতে বাঁধা দিচ্ছে বলে জানান পাম্প কর্তৃপক্ষ।

মাইনুল হোসেন নামে একজন গ্রাহক বলেন, ‘গতকাল কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাইনি। আজ আবার লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। এখন আর মাথা কাজ করছে না।

ঢাকা-গাজীপুর রুটের ভিআইপি পরিবহনের বাসচালক চান মিয়া নীলক্ষেত মোড়ে বাস রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, দুপুরের পর থেকে তেল দেয়া শুরু হবে বলেছে। তাই সিরিয়াল দিয়ে বসে আছি। সবসময় বাস চালাতে পারি না, তাই আয়ও কমে গেছে। হলিফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চালক কামাল হোসেন জানান, তেল সঙ্কটে তারা মুমূর্ষু রোগী নিয়ে দূরের পথে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও সিএনজি গ্যাসেরও সংকট দেখা দিচ্ছে, যা পরিস্থিতি আরো জটিল করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটেছে। এর প্রভাবে দেশে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। সময়মতো ও পর্যাপ্ত জ্বালানি না আসায় পাম্পগুলো গ্রাহকদের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। আবার অনেকেই অধিক মুনাফার আশায় অনৈতিকভাবে তেল মজুদ করছেন।

গত মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ৯ হাজার ১১৬টি অভিযানে ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। এ সবের মধ্যে রয়েছে ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার এক লিটার ডিজেল, ৩৯ হাজার ৭৭৬ লিটার অকটেন, ৮৭ হাজার ৯৫৯ লিটার পেট্রল ও ৪৮ হাজার ৫০০ লিটার ফার্নেস অয়েল। এ সব ঘটনায় ৩ হাজার ৫১০টি মামলা দায়ের করে ৪৫ জনকে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে এক কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews