ইরান যুদ্ধে মোতায়েনকৃত মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কনে ক্রমবর্ধমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সামরিক পরিবার এবং কংগ্রেসের সদস্যরা। দ্য নেভি টাইমস এবং স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস জানিয়েছে, বিমানবাহী রণতরীটিতে অবনতিশীল পরিস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপ চরমে পৌঁছালে নৌসেনারা একাধিকবার জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
এই জাহাজে ৫ হাজার নৌসেনা ইরানের সাথে যুদ্ধের কারণে এক রেকর্ড-ভাঙা মোতায়েন সহ্য করছেন। নাবিকেরা সমুদ্রে তাদের নবম মাস পার করছেন এবং একটানা ২শ’ ৫০ দিন কোনো স্থলভাগে পা রাখেননি, যা একটি বিমানবাহী রণতরীর জন্য আধুনিক যুগের একটি নজিরবিহীন ঘটনা। কলোরাডোর কংগ্রেস সদস্য এবং আফগানিস্তান ও ইরাকে কর্মরত প্রাক্তন আর্মি রেঞ্জার জেসন ক্রো বলেছেন, “সামরিক সদস্য এবং তাদের পরিবারের উপর চাপ সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে বাড়ছে”।
গত বৃহস্পতিবার সান দিয়েগোতে অনুষ্ঠিত এক আবেগঘন সভায় প্রায় ২শ’ সামরিক পরিবারের সদস্য নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে উদ্বেগ তুলে ধরেন। এক স্ত্রী জানান, তার স্বামী সেদিন তাকে বার্তা পাঠিয়ে বলেছিলেন, “তিনি আশা করছেন, আগামীকাল যেন ঘুম থেকে না জাগেন।” ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সচিব হাং কাওসহ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সভায় উপস্থিত ছিলেন। এক নারী কাওকে বলেন, “নৌবাহিনী আমাদের এবং নেতৃত্বের মধ্যকার আস্থা ভেঙে দিয়েছে”।
নেভি টাইমস বর্তমান মোতায়েনের সময় বেশ কয়েকটি আত্মহত্যার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার খবর দিয়েছে। নৌসেনার স্ত্রী অ্যানাবেল লোমা বলেছেন, তার স্বামীর মোতায়েনের মেয়াদ বারবার বাড়ানো হলে তিনি জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “সে ভয় পেয়েছে। সে মনে করে যে তাকে অসম্মানজনকভাবে বরখাস্ত করা হবে, এবং শুধুমাত্র অতিরিক্ত কাজের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়ার কারণে তার ১৩ বছরের কর্মজীবন এভাবেই ধ্বংস হয়ে যাবে।”
আরেকজন নাবিকের স্ত্রী এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন যেখানে তার স্বামী একজন সহকর্মীকে ধরে ডেকে ফিরিয়ে এনে ঝাঁপ দেওয়া থেকে বিরত করেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেস সদস্য মাইক লেভিন হিমশীতল গভীর সাগরে আব্রাহাম লিঙ্কনের পরিস্থিতিকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, “ছত্রাকধরা গোসলখানা, নষ্ট শৌচাগার, দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ কাপড় কাচা, সুদীর্ঘ সময় ধরে গরম পানির অভাব, এবং আধা কাপ ভাত ও দুটি পাতলা রুটিতে সীমাবদ্ধ একটি খাবার, কোনো সাবান, শরীরের দুর্গন্ধ নিবারক বা টুথপেস্টও নেই।”
উল্লেখ্য, লিঙ্কন জাহাজটি গত ২১ নভেম্বর সান ডিয়েগো থেকে যাত্রা শুরু করে, যার মূল গন্তব্য ছিল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। কিন্তু ইরানের সাথে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাহাজটিকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। এমএস নাউ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর ৫ হাজারেরও বেশি নৌসেনা ডিসেম্বরে গুয়ামে এবং জুলাইয়ে ওমানে মাত্র দুই দিন স্থলে থাকার সুযোগ পেয়েছিল। এই মোতায়েন মে মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা বেশ কয়েকবার প্রলম্বিত হয়েছে।
এরআগে, এপ্রিলে, নিম্নমানের ও রেশনের খাবারের ছবি প্রকাশের পর সমালোচনা তীব্রতর হয়। প্রকাশিত ছবিতে নিম্নমানের ও পরিমাণে সীমিত খাবার দেখা যায়। পাশাপাশি পানি সংকট, ছত্রাকধরা গোসলখানা এবং নষ্ট লন্ড্রি মেশিনের খবরও প্রকাশিত হয়।এর পাশাপাশি পানির অভাব, ছত্রাকযুক্ত শাওয়ার এবং ভাঙা লন্ড্রি মেশিনের খবরও প্রকাশিত হয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই বিবরণগুলোকে ‘আরও একটি ভুয়া খবর’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
গবেষকরা দেখেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে মোতায়েণকৃত মার্কিন যুদ্ধ জাহাজের প্রায় অর্ধেক সেনাসদস্য বলেছেন যে সমুদ্রে মানসিক চাপ মোকাবেলায় তারা পর্যাপ্ত সাহায্য পাচ্ছেন না। দ্য গার্ডিয়ান মার্কিন নৌসেনাদের সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টার খবর নিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে এক নৌবাহিনী কর্মকর্তা ঘটনাগুলোর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন আমাদের সামরিক সদস্য ও তাদের পরিবারের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ সৃষ্টি করে এবং তারা যে দৃঢ়তা ও ত্যাগ দেখান, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ।”
লেভিন এই সপ্তাহে পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “এই নারী-পুরুষেরা দেশের সেবা করার জন্য যোগ দিয়েছেন। তাদের দেশ অন্তত তাদের গরম পানি, একটি সচল শৌচাগার এবং যথাযথ খাবার দিতে বাধ্য। হেগসেথ সেটুকুও নিশ্চিত করতে পারেন না, অথচ তিনি তাদের পরিবারের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের মিথ্যাবাদী বলার সাহস দেখান।”



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews