দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে গত এক দশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি হলো বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বের অভূতপূর্ব বৃদ্ধি। একসময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশকে মূলত উন্নয়নশীল অর্থনীতি, শ্রমবাজার কিংবা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হলেও বর্তমানের বাস্তবতা ভিন্ন। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথ, আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প এবং চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজারের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত মন্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি হামাসের প্রভাব বিস্তার এবং দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করেন। কূটনৈতিক ভাষায় এমন মন্তব্যকে সাধারণ কোনো বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ কম। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বয়ান প্রায়ই রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা বহন করে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই বক্তব্য : বাংলাদেশ গত দুই দশকে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০০৫ সালে জেএমবির দেশব্যাপী বোমা হামলা থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলোকে দুর্বল করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিরাপত্তা মূল্যায়নেও বাংলাদেশকে বর্তমানে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি নয়, কিন্তু পরোক্ষভাবে নিরাপত্তা উদ্বেগ উত্থাপন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ ধরনের বয়ান তৈরি করতে পারে। ইতিহাস বলে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রকে “নিরাপত্তা ঝুঁকি” বা “উগ্রপন্থার সম্ভাব্য ক্ষেত্র” হিসেবে চিত্রিত করা হলে তা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট ও বাংলাদেশের অবস্থান : ফিলিস্তিন প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান বরাবরই সুস্পষ্ট। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং এখনো ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়নি।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর বাংলাদেশের জনমত, রাজনৈতিক দল, ইসলামপন্থী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন শহরে বড় বড় বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গাজা ইস্যু ব্যাপক আলোচিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল বর্তমানে শুধু সামরিক যুদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিক জনমত ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও একটি কঠিন লড়াইয়ের মুখোমুখি। ফলে যেসব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে দৃশ্যমান অবস্থান নিচ্ছে, সেগুলোর প্রতি ইসরাইলি কূটনীতির বিশেষ নজর থাকাটা অস্বাভাবিক নয়।
ভারতের নিরাপত্তা বয়ান ও বাংলাদেশের নাম : ভারতের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে কয়েকটি নির্দিষ্ট উদ্বেগ তুলে ধরে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে- অবৈধ অভিবাসন; সীমান্ত নিরাপত্তা; জঙ্গি নেটওয়ার্ক; উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম; সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন।
যদিও গত এক যুগে ঢাকা ও নয়াদিল্লির নিরাপত্তা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভারত নিজেও বহুবার বাংলাদেশের সহযোগিতার প্রশংসা করেছে, তবুও ভারতের রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম পরিসরে বাংলাদেশকে ঘিরে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট বয়ান পুরোপুরি অদৃশ্য হয়নি।
বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তা ও অভিবাসন ইস্যু প্রায়ই নির্বাচনী আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। ফলে বাংলাদেশের নাম অনেক সময় কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে নয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথেও যুক্ত হয়ে যায়।
চীন-ভারত প্রতিযোগিতা : বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্য : বর্তমান ভূরাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো চীন ও ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা।
চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় বাংলাদেশে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং শিল্পখাতে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। পদ্মা সেতুর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা ও মাতারবাড়ী ঘিরে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল- সবকিছুই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নজরে রয়েছে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ শুধু প্রতিবেশী নয়; বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে মূল ভূখণ্ডের সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রভাব রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সমুদ্র নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি মোকাবেলার আলোচনায় বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
ফলে বাংলাদেশকে ঘিরে প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ- তা চীন সফর হোক, মালয়েশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদার হোক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে নতুন অংশীদারিত্ব-আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিবিড় পর্যবেক্ষণের মধ্যে পড়ে।
সীমান্ত রাজনীতি ও আস্থার সঙ্কট : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বর্তমানে সহযোগিতা ও অমীমাংসিত বিরোধ দুই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে।
এক দিকে রয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা; বাণিজ্য সম্প্রসারণ; রেল ও সড়ক সংযোগ; নিরাপত্তা সহযোগিতা।
অন্য দিকে রয়েছে তিস্তা চুক্তির অনিশ্চয়তা; সীমান্ত হত্যা; বিএসএফের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক; সীমান্তে কাঁটাতার নির্মাণ; কথিত ‘পুশইন’ ইস্যু; সংখ্যালঘু ও অভিবাসন প্রশ্নে রাজনৈতিক বক্তব্য।
এসব অমীমাংসিত ইস্যু দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি করে। ফলে যখন নতুন কোনো নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ সামনে আসে, তখন তা দ্রুত রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়।
তথ্যযুদ্ধ ও কূটনৈতিক বয়ানের যুগ : আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধ শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। তথ্যযুদ্ধ, গণমাধ্যম বয়ান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক জনমত এখন পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা সঙ্ঘাত কিংবা যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে তথ্য ও বয়ানের নিয়ন্ত্রণ কৌশলগত শক্তির অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশকেও এখন এই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের অবস্থান রক্ষা করতে হচ্ছে। কোনো অভিযোগ বা অপপ্রচারের জবাব শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে নয়, বরং তথ্য, পরিসংখ্যান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সক্রিয়তার মাধ্যমে দিতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে করণীয় : বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ- প্রথমত, সন্ত্রাসবাদ দমনে অর্জিত সাফল্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো জোরালোভাবে তুলে ধরা। দ্বিতীয়ত, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। তৃতীয়ত, সীমান্ত, পানি বণ্টন ও অভিবাসন ইস্যুতে তথ্যভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা। চতুর্থত, জাতীয় ঐকমত্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। কারণ অভ্যন্তরীণ বিভাজন আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলার সক্ষমতাকে দুর্বল করে। পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিঙ্কট্যাঙ্ক পর্যায়ে বাংলাদেশের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরার জন্য কার্যকর জনকূটনীতি পরিচালনা করা।
ভারত ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে সরাসরি ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে সুস্পষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। তবে এটিও অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিরাপত্তা বয়ান, গণমাধ্যম প্রচার এবং কূটনৈতিক মন্তব্য প্রায়ই বৃহত্তর কৌশলগত উদ্দেশ্যের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তাকে একই সাথে চীন-ভারত প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তথ্যনির্ভর কূটনীতি, কৌশলগত ভারসাম্য, জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা। কারণ একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় নয়; বরং তার কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার মধ্যেও নিহিত।