• আরমান হোসাইন

এক সময় রাজকীয় প্রাসাদ ছিল যে বাড়িটি, আজ সেটা প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে। নেই আগের মত জৌলুশ, নেই প্রাণের স্ফুরণ। তবে পূবে এটি ছিল বিখ্যাত জমিদার বংশের আবাসস্থল। দেশ ভাগের কারণে তাদের ছাড়তে হয়েছে এ দেশ সাথে নিজস্ব এই মনমুগ্ধকর বাড়িটিও। বলছিলাম লক্ষীপুর সদর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দালাল বাজার জমিদার বাড়ি সম্পর্কে। এটি লক্ষীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নে অবস্থিত।

দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ছাড়াও লক্ষ্মীপুরে ছিল আরও কয়েকটি বিখ্যাত জমিদার বাড়ি। যেমন : কামানখোলা জমিদার বাড়ি ও ঈসহাক জমিদার বাড়ি। তবে অন্যগুলার তুলনায় দালাল জমিদার বাড়ির বিশেষত্ব একটু বেশি সেটার পেছনেও নানা কারণ রয়েছে।

এই বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৪০০ বছরের ইতিহাস।

দালাল বাজার নামটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে বহদিন ধরে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য মতামতটি হলো, প্রায় ৪০০ বছর আগে এই বাড়িতে থাকতেন লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণব। তার আদি নিবাস ছিল কলকাতায়। তিনি লক্ষ্মীপুরে এসে কাপড়ের ব্যবসা করতেন। তাই অনেকের কাছে এটি লক্ষ্মী নারায়ণ বৈষ্ণবের বাড়ি হিসেবেও পরিচিত।

আবার অনেকে এটাও মনে করেন যে তার নাম অনুসারে লক্ষ্মীপুর নামকরণ করা হয়ছে। তবে এটা নিয়ে অনেকের ভিন্ন মতও রয়েছে।

Dalal Bazar-02

আর দালাল বাজার বলে পরিচিতির কারন হলো, তার বংশধরেরা ব্রিটিশ আমলে এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক এজেন্ট ছিল। তার পুত্র ব্রজবল্লব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে সম্পর্ক করে বাবার ব্যাবসাকে এ অঞ্চলে আরো প্রসারিত করেন। সে কারণে স্থানীয় লোকেরা তাদের ব্রিটিশদের দালাল মনে করতেন আর ওই দৃষ্টিকোণ থেকে বাড়িটির এমন নামকরণ করা হয়েছে বলে ধারনা করা হয়।

বর্তমানে বাড়িটির নানা অংশ ধসে পড়েছে, তারপরেও অবশিষ্ট অংশগুলো দেখে বোঝা যায় যে, রাজকীয় প্রবেশদ্বার, প্রশস্থ অন্দরমহল, অন্দর পুকুর এবং শানবাঁধানো ঘাটসহ এক সময় সবই ছিল। এখন পুরনো ইটের দেয়ালে অসংখ্য পরগাছা, ঘরের ভেতরে ময়লা আবর্জনা। এমনকি অনেক সময় এখানে মাদকসেবিরা আড্ডাও দিয়ে থাকে। জমিদার বাড়ি ঘেঁসে রয়েছে নারকেল ও সুপারির বাগান।

এই জমিদার বাড়িটি ছিল তৎকালীন জমিদারের রূচির এক অনন্য উদাহরণ। ইউরোপীয় ও উপমহাদেশের স্থাপত্য রীতির সংমিশ্রনে নির্মিত এই ভবনের ব্যবহৃত হয়েছিল মোটা ইট, চুন, সুরকি ও লোহার ভিম। দরজা এবং জানালায় ছিল নকশা করা কাঠের কাজ যা এখনো অতীতের সৌন্দর্যের সাক্ষ্য বহন করে।

এক সময় দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ছিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। এখানে নিয়মিত নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হতো। যেমন : দুর্গাপূজা ও ধর্মীয় উৎসব, নাটক গান ও নৃত্য অনুষ্ঠান , প্রজাদের বিচার ও সালিশ ও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের আগমন অনুষ্ঠান। একই সাথে তারা এলাকায় স্কুল মন্দির ও রাস্তা নির্মাণে অবদান রাখতেন বলেও জানা যায়।

তবে সময় চিরস্থায়ী নয়। ব্রিটিশ শাসনের অবসান, জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ৪৭ এর দেশভাগ সবকিছু মিলিয়ে দালাল বাজার জমিদার পরিবারের ভাগ্যে আসে বড় পরিবর্তন। নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পরিবারের সদস্যরা একসময় এই অঞ্চল ছেড়ে চলে যায়।

অনেকদিন আগে থেকে লক্ষীপুর জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা প্রায় এখানে ঘুরতে আসেন। চলচ্চিত্রের শুটিং এর ক্ষেত্রে নির্মাতাদের অনেকে এ স্থানটি পছন্দ করেছেন বলেও জানা যায়।

স্থানীয় তরুণ নির্মাতা নিরব অধিকারী বলেন, পুরানো দিনের কাহিনী অথবা ভৌতিক চলচ্চিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে এই বাড়িটি খুবই উপযুক্ত। তিনি আরো জানান, ইতোমধ্যে তার রচনা ও পরিচালনায় মৃত্যুরূপ এবং বিসর্জন নামে দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটক নির্মাণ করেছেন আর তার বেশিরভাগ শুটিংই এখানে সম্পন্ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এটি একটি আকর্ষণীয় শুটিং লোকেশন হিসাবে অনেকের পছন্দের তালিকা থাকবে।

এছাড়া এর পাশে রয়েছে খোয়া সাগর দিঘী। সেখানে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা করলে স্থানটি পর্যটকদের কাছে আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠবে বলে অনেকেই মনে করেন।

বিভিন্ন সময় এটিকে সংস্কারের চেষ্টা করা হলে নানা কারণে সেটি আর সম্পন্ন হয়নি। ২০১৫ সালে দালাল বাজার জমিদার বাড়ি ও খোয়া সাগর দিঘী সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছিল তৎকালীন জেলা প্রশাসক। কিন্তু স্থানীয় একটি মহল আদালতের রিট করলে উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়ে যায়। কারণ তারা চাচ্ছে এটিকে দখল করে নিজেদের করে নিতে।

রামগঞ্জ থেকে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী মেছবাহ জানান, যেহেতু এটি আমাদের জন্য কাছেই তাই প্রায় সময় এখানে আসা হয়। এটি একটি প্রাচীন বিখ্যাত জমিদার বাড়ি হলেও দিনে দিনে প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। পূর্বে যখন এখানে এসেছিলাম তখন এর এক প্রকার ভালো অবস্থাই ছিল কিন্তু বর্তমানে এটি প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে। এভাবে চলতে থাকলে হয়তো একদিন এর নামই মুছে যাবে। সুতরাং কর্তৃপক্ষের উচিত এটি সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া।

স্থানীয় বাসিন্দা মোকাররম বেপারি জানান, এলাকার অনেকে এটি দখলের চেষ্টা করছে এমনকি কেউ কেউ এটাকে মাদক সেবনের আখড়া বানিয়ে ফেলেছে। এ কারণে পর্যটকেরা এক প্রকার নিরাপত্তা ঝঁকিতে থাকে। এসব কারণে পর্যটকের সংখ্যাও দিন দিন কমে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।

লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে সিএনজি বা বাসে দালাল বাজার পৌঁছাতে ভাড়া পড়ে মাত্র ২০ টাকা। বাজার থেকে ১৫০ গজ পূর্বে ঢাকা-রায়পুর মহাসড়কের উত্তর পাশে রয়েছে খোয়া সাগর দিঘী। দিঘির বিপরীত পাশে রয়েছে মঠবাড়ী। এখান থেকে দালাল বাজার ডিগ্রি কলেজের পেছন দিয়ে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছানো যায় জমিদার বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামোতে।

ইতিহাসের সাক্ষী জমিদার বাড়িটি হয়তো আর বেশি দিন টিকবে না। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজপ্রাসাদ হয়তো একদিন পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। হারিয়ে যাবে গৌরবময় এক অধ্যায়।

লেখক: নয়া দিগন্তের ইন্টার্ন শিক্ষার্থী।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews