বাংলাদেশের অর্থনীতি একদিকে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক গল্প তুলে ধরছে, অন্যদিকে ব্যাংক খাতের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ একটি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই সংকট আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়—দেশের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদেই এমন সদস্য রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে খেলাপি ঋণের অভিযোগ রয়েছে বা ছিল। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—যারা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার নীতিমালা প্রণয়ন করেন, তারা নিজেরাই যদি সেই শৃঙ্খলা মানতে ব্যর্থ হন, তবে সাধারণ মানুষের কাছে এর বার্তা কী?

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবম দিনে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এসব কোম্পানির কাছে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

গত সোমবার (৬ এপ্রিল) এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত (কুমিল্লা-৪)-এর এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী এ তথ্য জানান।

একই দিন একই সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সংসদ সদস্য এবং তাদের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে দেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলো থেকে নেওয়া মোট ঋণের স্থিতি ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

ঋণের একটি বড় অংশই বর্তমানে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। অর্থমন্ত্রী সংসদকে জানান, উল্লিখিত ঋণের মধ্যে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি। তবে তিনি বিশেষ দ্রষ্টব্য হিসেবে উল্লেখ করেন যে, আদালতের নির্দেশনা বা স্থগিতাদেশের কারণে এই খেলাপি ঋণের একটি অংশ নিয়মিত ঋণ হিসেবে দেখানো হতে পারে, যা আইনি মারপ্যাঁচে খেলাপি তালিকার বাইরে ছিল।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫.৫৭ লাখ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১১-১২ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ৫ শতাংশের বেশি ।

খেলাপি ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়—সে হিসেবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত স্পষ্টতই উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিপুল খেলাপি ঋণের প্রায় ৭০ শতাংশই বড় ঋণগ্রহীতাদের হাতে কেন্দ্রীভূত, যাদের একটি অংশ প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।

এই প্রেক্ষাপটে সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততা বিষয়টিকে আরও স্পর্শকাতর করে তোলে। সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তথ্য বলছে, অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন, এবং তাদের মধ্যে ১১ জন নির্বাচিত হয়ে সংসদ সদস্য হন। নতুন নির্বাচিত এমপিদের ঘোষিত মোট দায়-ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১,৩৫৬ কোটি টাকা, যেখানে একাধিক এমপির ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ১০০ কোটি টাকারও বেশি।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা রয়েছে—আইনগতভাবে “খেলাপি” না থাকলেও অনেক প্রার্থী নির্বাচন করার আগে ঋণ পুনঃতফসিল (rescheduling) করে নিজেদের বৈধতা নিশ্চিত করেন। ফলে কাগজে-কলমে তারা খেলাপি নন, কিন্তু বাস্তবে ঋণের দায় বহাল থাকে। এই আইনি বৈধতা ও নৈতিক দায়ের ফারাকই মূল বিতর্কের জায়গা।

সংসদ সদস্যরা শুধু আইন প্রণয়ন করেন না; তারা সমাজের জন্য একটি মানদণ্ডও তৈরি করেন। যদি তারা নিজেরাই আর্থিক দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থ হন, তবে এটি সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়—“ক্ষমতা থাকলে নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক নয়”। এর ফলে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একজন ক্ষুদ্র কৃষক বা উদ্যোক্তা ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়েন, অথচ বড় ঋণখেলাপিরা বছরের পর বছর পার পেয়ে যান। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও তুলে ধরে।

ঋণ পুনঃতফসিল বাংলাদেশে একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া হলেও এর অপব্যবহার এখন একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সময়কালে ব্যাংকগুলো প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। অনেক ক্ষেত্রে একই ঋণ একাধিকবার পুনঃতফসিল করা হয়েছে, এমনকি কিছু ঋণগ্রহীতা ১০-১৫ বছর ধরেও ঋণ পরিশোধ না করে আইনি প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর ব্যবহার করেছেন। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে একটি “মরাল হ্যাজার্ড” তৈরি হয়েছে—অর্থাৎ বড় ঋণগ্রহীতারা ধরে নিচ্ছেন, শেষ পর্যন্ত তারা কোনো না কোনোভাবে ছাড় পেয়ে যাবেন।

খেলাপি ঋণের এই প্রবণতা অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঋণ ফেরত না আসায় ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে, ফলে নতুন ঋণ বিতরণে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ঝুঁকি বাড়ায় সুদের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পাচ্ছেন না, ফলে কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উচ্চ খেলাপি ঋণ একটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ১-২ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে—যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় ধাক্কা।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নৈতিকতার। একজন প্রার্থী যদি আইনের সুযোগ নিয়ে সাময়িকভাবে “খেলাপি” তালিকা থেকে বেরিয়ে আসেন, তাহলে তিনি আইনের দৃষ্টিতে যোগ্য হতে পারেন। কিন্তু একজন আইনপ্রণেতার কাছে কি শুধু আইনি বৈধতাই যথেষ্ট? তার কি আরও উচ্চতর নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা উচিত নয়?

সংসদ সদস্যরা শুধু আইন প্রণয়ন করেন না; তারা সমাজের জন্য একটি মানদণ্ডও তৈরি করেন। যদি তারা নিজেরাই আর্থিক দায়বদ্ধতা পালনে ব্যর্থ হন, তবে এটি সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা দেয়—“ক্ষমতা থাকলে নিয়ম মানা বাধ্যতামূলক নয়”। এর ফলে সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে কিছু গভীর কাঠামোগত কারণ। প্রথমত, বাংলাদেশে ব্যবসা ও রাজনীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। অনেক ব্যবসায়ী রাজনীতিতে প্রবেশ করে রাজনৈতিক প্রভাবকে অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করেন। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঋণ অনুমোদনের সময় যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হয় না, আবার ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা বড় ঋণখেলাপিদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করেছে।

এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একজন ক্ষুদ্র কৃষক বা উদ্যোক্তা ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপের মুখে পড়েন, অথচ বড় ঋণখেলাপিরা বছরের পর বছর পার পেয়ে যান। এই বৈষম্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও তুলে ধরে।

তাহলে সমাধান কী?

প্রথমত, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রার্থীদের শুধু বর্তমান খেলাপি অবস্থাই নয়, তাদের পূর্ণ ঋণ ইতিহাস প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, ঋণ পুনঃতফসিলের নীতিমালা কঠোর করতে হবে, যাতে একই ঋণ বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ সীমিত হয়। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে।

এছাড়া গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা জনমত তৈরি করতে পারে, যা নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। একইসঙ্গে বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো জরুরি, যাতে আইনের শাসন বাস্তব অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়।

সংসদ একটি দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে যদি আর্থিক অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের উপস্থিতি থাকে, তবে তা শুধু অর্থনীতির জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, এতে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয় এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।

সংসদ সদস্যদের খেলাপি ঋণের বিষয়টি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামো, নৈতিকতা এবং সুশাসনের গভীর সংকটের প্রতিফলন। এই সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সচেতন নাগরিক সমাজ। অন্যথায়, খেলাপি ঋণের এই ক্রমবর্ধমান বোঝা একসময় শুধু ব্যাংকিং খাত নয়, পুরো অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]

এইচআর/এমএস



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews