গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক কমিটির সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর বলেছেন, আইনি মারপ্যাঁচে এই গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করা কোনোভাবেই ঠিক নয়। জুলাই সনদ যাতে বাস্তবায়ন হয়, বর্তমান সংসদের এটিই প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল। সংসদের কাছে আমাদের প্রত্যাশা ছিল এই যে গণ-অভ্যুত্থান হলো এবং তার মধ্যে দিয়ে যে জাতীয় একটা আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের জন্য যাতে বাংলাদেশে ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো স্বৈরাচার তৈরি না হয়, সবকিছু জবাবদিহিতার মধ্যে থাকে, সেটাই আসলে জুলাই সনদ। সেই জুলাই সনদ যাতে বাস্তবায়ন হয়, সেটা এই বর্তমান সংসদের সবচেয়ে প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, আগের ফ্যাসিস্ট শক্তি ফিরে আসার চেয়ে আমরা এখন নতুন ফ্যাসিস্ট শক্তি তৈরি হওয়ার ব্যাপারে বেশি শঙ্কিত।
নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশে গত দেড় দশক ধরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে আন্দোলন চলছে। এখন আবার জুলাই সনদ নিয়ে রাজনীতি চলবে মনে হচ্ছে। এই মুহূর্তে করণীয় কি জানতে চাইলে ফাহিম মাশরুর বলেন, করণীয় হচ্ছে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এখন প্রেশার তৈরি করলে খুব তাড়াতাড়ি কিছু হবে আমার তা মনে হয় না। কিন্তু পর্যাপ্ত চাপ সৃষ্টিরও কোনো লক্ষণ দেখছি না।
নয়া দিগন্ত : জাতীয় সংসদের সামনে তো আপনারা দাঁড়ালেন
ফাহিম মাশরুর : আমরা কয়েকজন লোক দাঁড়ালাম, তাতে কি বা যায় আসে। আবার বাংলাদেশে রাস্তায় না নামলে তো কোনো কাজও হয় না। এ বিষয়গুলো নিয়ে অন্যান্য সিভিল সোসাইটি বা সবাইকে তো কথা বলতে হবে। কোনো সিভিল সোসাইটিকে তো কথা বলতে দেখছি না।
নয়া দিগন্ত : গণ-অভিপ্রায় থেকে কি তাহলে পুরনো রাষ্ট্রকাঠামোতে ফিরে যাচ্ছি আমরা?
ফাহিম মাশরুর : তাইতো মনে হচ্ছে। অন্য কিছু তো দেখি না। ভবিষ্যতে হয়তো ফের দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠতে। পাঁচ-দশ বছর লাগবে। কিন্তু চাপ বজায় রাখতে হবে। সমস্যা হলো আমরা অনেক সময় ভুলে যাই। এ্যাটলিস্ট গণভোটটা যে হলো, ৭০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে এটা তো অফিসিয়াল একটা রেকর্ড। এই রেকর্ডটা নিয়েই পলিটিক্যাল মুভমেন্ট হবে। আশা করি যে, অন্যান্য রাজনৈতিক দল এটাকেই প্রধান রাজনীতি হিসেবে নেবে।
নয়া দিগন্ত : আগামী দিনের রাজনীতিতে তাহলে গণভোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করার বিষয়টি বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে?
ফাহিম মাশরুর : তাই তো হওয়ার কথা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে গত ১৫ বছর রাজনীতি হয়েছে। আমার দৃষ্টিতে আগামী দশ বছরের রাজনীতি এই গণভোট নিয়েই হবে।
নয়া দিগন্ত : সংস্কার ছাড়া তো কোনো পথও নাই, অস্তিত্বের প্রশ্ন বলা যায়।
ফাহিম মাশরুর : শুধু অস্তিত্বের প্রশ্ন নয়, সাধারণ মানুষ একটা রায় দিয়েছে, বুঝে দিক, না বুঝে দিক, সেটাকে অপমান করা মানে গণতন্ত্রকে অপমান করা।
নয়া দিগন্ত : সিভিল সোসাইটি, নাগরিক সংগঠন ও মিডিয়ার তো একটা ভূমিকা থাকে।
ফাহিম মাশরুর : মিডিয়া সরকারের আজ্ঞাবহ হলে চলবে না। মালিক পক্ষ বা এডিটরিয়াল বিভাগ এ ইস্যুকে যে খুব একটা সমর্থন দিচ্ছে তা চোখে পড়ছে না।
নয়া দিগন্ত : অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?
ফাহিম মাশরুর : অফকোর্স। হয়তো গ্রামের মানুষ জুলাই সনদ বা সংস্কার হয়তো এতটা বুঝে না। কিন্তু শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বা শহুরে মানুষের মধ্যে গণভোট নিয়ে তীব্র আকাক্সক্ষা বিরাজ করেছে। আমার ধারণা ঢাকা শহরের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ মানুষ গণভোটে ‘হাঁ’ ভোট দিয়েছে। সারা দেশের চেয়ে ঢাকায় দেখুন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নির্বাচনে ভালো ফলাফল করেছে। তার মানে ঢাকার মধ্যবিত্ত সমাজ বা শিক্ষিত মানুষ ব্যাপকভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা সংস্কারের পক্ষে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কিন্তু বলে যে মধ্যবিত্ত সমাজ বা শিক্ষিত মানুষ কোনো একটা ব্যাপারে বিরক্ত হয়, সরকারের কোনো সিদ্ধান্তে বিরক্ত হয় তাহলে সে সরকার তাড়াতাড়ি অজনপ্রিয় হয়ে যায়।
নয়া দিগন্ত : জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অনীহায় সাধারণ মানুষকে বিস্ময়ের দিকে কি ঠেলে দিচ্ছে, তারা কি অনেকটা ‘স্ট্যান্ড’ বা কিংকর্তব্যবিমূঢ়, এত রক্ত, এত প্রাণহানি, হাসপাতালে এখনো আহতদের আহাজারি... নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব তো ছিল স্বাভাবিকভাবে বিষয়টিকে এগিয়ে নেয়া।
ফাহিম মাশরুর : আমার ধারণা ঐকমত্য কমিশন সরকারি দলের কথাবার্তা শোনেনি, নোট অব ডিসেন্ট বা সংস্কারের ক্ষেত্রে আপত্তির বিষয়গুলোকে ভালো করে শোনেনি এমন উপলব্ধি থেকে এমন সমস্যাটা হতে পারে। তারা গুরুত্ব দেয়নি। এ জন্য আসলে তারা গণভোটের ব্যাপারে নেগেটিভ।
নয়া দিগন্ত : বিষয়টি কি রাজনৈতিক ইগোতে পরিণত হচ্ছে?
ফাহিম মাশরুর : এক্সাটলি। আপনি রাইট টার্মটা ইউজ করছেন। আমার কাছে মনে হয়েছে ব্যাপারটা ইগো। কিন্তু রাজনীতি তো আসলে কমপ্রোমাইজ। শেখ হাসিনা তো ইগো দিয়েই, মানে ইগো না থাকলে তো তার এই পরিণতি হতো না।
নয়া দিগন্ত : ইগোর জন্য রাজনীতির সাথে সাথে তো সাধারণ মানুষও দুর্ভোগে আটকে থাকে।
ফাহিম মাশরুর : আমার মনে হয় সরকারি দলের মধ্যে একটা অংশ হয়তো এমন ইগো থেকে মনে করছে ঠিক আছে বিরোধী দল কমপ্রোমাইজ করুক। কিন্তু এখনো তো কোনো কমপ্রোমাইজিং টোন দেখছি না।
নয়া দিগন্ত : এ সুযোগে পুরাতন ফ্যাসিস্ট শক্তি ফিরে আসার সুযোগ করে নেবে না?
ফাহিম মাশরুর : ফ্যাসিস্ট শক্তি তো অলরেডি ফিরে আসা শুরুই করছে। গণভোট হোক আর না হোক।
নয়া দিগন্ত : সামনে পৌরসভা, স্থানীয় সরকার নির্বাচন।
ফাহিম মাশরুর : আগের ফ্যাসিস্ট শক্তি ফিরে আসার চেয়ে আমরা এখন নতুন ফ্যাসিস্ট শক্তি তৈরির ব্যাপারে বেশি আতঙ্কিত। আগে যারা গেছে তারা তো চলেই গেছে। ফ্যাসিস্ট তো যে কেউ হতে পারে, আপনি হতে পারেন, আমি হতে পারি, সুযোগ পেলে। সেটাই মেইন সমস্যা। আমরা যাতে কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারি সে জন্যই তো এত সংস্কার।
নয়া দিগন্ত : কারো কারো ধারণা সংবিধানের দোহাই দেয়া হচ্ছে।
ফাহিম মাশরুর : সংবিধান তো মানুষই তৈরি করে মানুষের জন্য। গণভোট তো করাই হয় যাতে জনগণের রায় সংবিধানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়। তা না হলে তো গণভোট দরকার ছিল না। টু থার্ড সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নিজেরা নিজেরা সংস্কার করে ফেললেই হতো। গণভোট করাই হয়েছে যাতে এর রায় সংবিধানের ওপরে একটা অবস্থান পায়।
নয়া দিগন্ত : তারেক রহমান নিজেও গণভোটে ‘হ্যা’ ভোট দিতে বলেছেন, ভবিষ্যতে উনি ভোটারদের কাছে কী জবাব দেবেন।
ফাহিম মাশরুর : বাংলাদেশে তো আর জবাব দেয়ার কালচার নাই। আমরা ভয়েস রেইজ করতে পারি, যারা রাজনীতি করেন তারা মাঠে নামতে পারেন। যারা রাজনীতি করি না তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি, আলোচনা করতে পারি। মিডিয়া প্রেশার তৈরি করতে পারে। এখনো আমরা আশাবাদী এ কারণে যে যারা তরুণ, আমরা তো একটু মধ্যবয়সী, যারা জুলাইয়ে ফ্রন্ট লাইনে ছিল, তিরিশ বছরের কম, এ রকম বেশ কিছু অর্গানাইজেশন তৈরি তো আছেই, তারা আবার নতুন করে আন্দোলন করার চিন্তাভাবনা করছে। আমরা তাদের দিকেই তাকিয়ে আছি।
১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে সংসদ সদস্যরা যেভাবে নির্বাচিত হয়েছেন, একই সাথে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেই গণভোটে দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ কিন্তু সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হওয়ার কথা। গণভোটে সুস্পষ্টভাবে বলা ছিল কিভাবে এই সংবিধান সংস্কার হবে। এবং সেখানে সংবিধান সংস্কার কমিশন তৈরির কথা ছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম ঈদের আগে যে সংসদ বসেছিল সেখানে এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এসব ব্যাপারে সরকারি দলের সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। আশঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করছি সরকারের কিছু সিনিয়র নেতৃবৃন্দের কথায় যেখানে বলা হয়েছে গণভোট সংবিধান সম্মত কি না এমন প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জনগণ সব সংবিধানের ঊর্ধ্বে। জনগণ যেখানে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট দিয়ে রায় দিয়েছে এই সংবিধান সংস্কারের ব্যাপারে সেখানে শুধুমাত্র আইনি মারপ্যাঁচে এই গণভোটকে কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক না। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি জনগণের এই রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে খুব দ্রুত সময়ে সংবিধান সংস্কার সভা গঠন করা হয়। এবং যেভাবে গণভোটে বলা হয়েছিল, যেভাবে জনগণ রায় দিয়েছিল সেভাবে সংবিধানের এই সংস্কারগুলো খুব দ্রুতই এই বছরের মধ্যে যেন বাস্তবায়ন করা হয়।