জনগনের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাইলট প্রকল্প হিসেবে চালু করা হয়েছিল "বৈকালিক চিকিৎসাসেবা"।
এ সেবার মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে স্বল্প খরচে সেবা পেয়ে উপকৃত হচ্ছিলেন উপজেলার সাধারন মানুষ। তবে এ সেবার কার্যক্রমের একটি ভিডিও বেশ কয়েকটি ফেক একাউন্ট থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করে ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির পুরো চিকিৎসা কার্যক্রমে। পরে ভিডিওটি ভাইরাল হলে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে সেই বৈকালিক চিকিৎসা সেবা বন্ধ করে দেন কর্তৃপক্ষ। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত রোগী ও স্বজনরা।
জানা গেছে, স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ২০২৩ সাল থেকে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ বৈকালিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু হয়। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিনামূল্যে ঔষধও পেত শত শত রোগীরা। সরকারি ছুটি ব্যতীত প্রতিদিন বিকেল ৩ টা থেকে ৬ টা পর্যন্ত হাসপাতালের সরকারি দায়িত্ব শেষে এমবিবিএস/বিডিএস ও সমমানের চিকিৎসকরা সরকার নির্ধারিত ২০০ টাকা ফি নিয়ে বর্হিবিভাগে এ বৈকালিক সেবা দিতেন। যার পুরোটাই সরকারি কোষাগারে জমা হতো।
সম্প্রতি 'সানজিদ ইকবাল সজল' নামে ফেসবুকের ফেক একাউন্ট থেকে চিকিৎসকদের বিনা অনুমতিতে ভিডিও ধারন করে " ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডিউটিরত চিকিৎসকরা অতিরিক্ত টাকা নিয়ে রোগী দেখছেন" এমন শিরোনামে বিউটিফুল ঈশ্বরদী নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে মিথ্যাভাবে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেন। পরে সেই একই ভিডিওটি 'আজকের পাবনা' নামে আরেকটি ফেক একাউন্ট থেকে শেয়ার করা হলে ভিডিওটি মূহুর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়। পরে চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে জেলা সিভিল সার্জন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বৈকালিক চিকিৎসা সেবাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
সরেজমিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা গেছে, কার্যক্রমটি বন্ধ থাকায় ঘুরে যাচ্ছেন অনেক রোগী। তাদের দাবি প্রাইভেট হাসপাতালে সিরিয়াল দিয়ে বাড়তি টাকায় ভিজিট দিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সক্ষমতা অনেকেরই নেই। তাই এখানে এসে স্বল্প খরচে চিকিৎসা নিতে পারতেন। তবে সেবাটি বন্ধের কারনে ঘুরে যেতে হচ্ছে এবং ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
চিকিৎসা নিতে আসা বাপ্পি হোসেন ও শেখ মেহেদী হাসানসহ কয়েকজন বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বৈকালিক সেবাটি চালু ছিল। কিন্তু মিথ্যাভাবে প্রচারনা করে সেটি বন্ধ করে দিয়ে আমাদের মত অনেক মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলেছেন। হাসপাতাল কর্তুপক্ষকে বলবো এই সেবাটি যেন পুনরায় চালু করা হোক।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির চিকিৎসক পূরবী সরকার(এমও) বলেন, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আমাকে দেখা যাচ্ছে। সেদিন বৈকালিক সেবার দায়িত্বে আমি ছিলাম। কিন্তু বিনা অনুমতিতে এভাবে ভিডিও ধারন করে মিথ্যাভাবে উপস্থাপন করে তা ছড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। ভিডিওটিতে উল্লেখ করা হয়েছে রোগীদের থেকে ২০০ টাকা নিয়ে তারপর রোগী দেখছি যা একটা ভিত্তিহীন ব্যাপার। এটা সরকার নির্ধারিত ফি যা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। ভিডিওটির কারনে বৈকালিক সেবাটি বন্ধ তো হয়েছেই পুরো চিকিৎসা কার্যেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
আরেক চিকিৎসক ইশরাত জাহান বলেন, জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন শেষ করে আবারও বর্হিবিভাগে রোগী দেখি যা সরকারি নিয়ম। তবে এ সংক্রান্ত যে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যাভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাতে আমার নাম ব্যবহার করা হয়েছে অথচ সেদিন আমি ডিউটিতেই ছিলাম না। বৈকালিক সেবাটি চালু করা হয়েছে শুধুমাত্র সাধারন মানুষের কথা ভেবে, ভিডিওটির কারনে চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি। বর্তমানে বৈকালিক চিকিৎসা সেবাটি বন্ধ রাখা হয়েছে যার কারনে অনেক রোগীই ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. শোভন পাল বলেন, সাধারন মানুষের সুবিধার কথা ভেবে সরকার নির্ধারিত ফি নিয়ে বৈকালিক চিকিৎসা সেবাটি চালু করা হয়েছিল। কিন্তু সেটাকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করে হাসপাতালের পুরো চিকিৎসা কার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে। বর্তমানে বৈকালিক সেবাটি বন্ধ রয়েছে, সাধারন মানুষের সুবিধার কথা ভেবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি সেটা যেন পুনরায় আবার চালু করা হয়।
এদিকে আজ সকালে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় উপস্থিত হয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পরিদর্শন করেছেন পাবনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক আবু তালেব মন্ডল। তিনি বলেন, এখানে বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে এখনও। সেবার মান উন্নত করতে খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বৈকালিক সেবা নিয়ে যে মিথ্যা ভিডিওটি ছড়ানো হয়েছে তা খুবই দুঃখজনক। সিভিল সার্জন বিভাগে কথা বলে সেটি আবারও চালু করার ব্যবস্থা করা হবে।
এনআই