প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর লেবার পার্টির নতুন নেতা এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। এর মাধ্যমে গত প্রায় এক দশকে ব্রিটেন তার সপ্তম প্রধানমন্ত্রীকে পেল, যা দেশটির সংসদীয় রাজনীতির গতিশীলতা ও জবাবদিহিমূলক চরিত্রকে প্রতিফলিত করে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যবেক্ষকদের জন্য এই পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি শুধু ব্রিটেনের বৈশ্বিক প্রভাবের কারণেই নয়, বরং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, দলীয় নেতৃত্ব, জনমত এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মূল্যবান শিক্ষা প্রদান করে।


ব্রিটিশ ও বাংলাদেশি সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে অন্যতম পার্থক্য হলো রাজনৈতিক নেতা ও তাঁর দলীয় সংসদ সদস্যদের সম্পর্ক। ব্রিটেনে সংসদ সদস্যরা প্রায়ই নিজেদের দলের নেতৃত্বের সমালোচনা করেন, যদি তারা মনে করেন যে, কোনো নীতি জাতীয় স্বার্থ বা জনমতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের প্রকাশ্য সমালোচনাকেও সেখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্রিটেনে একজন প্রধানমন্ত্রী ততদিনই ক্ষমতায় থাকেন, যতদিন তিনি নিজ দলের এবং সংসদের আস্থা বজায় রাখতে সক্ষম হন। ফলে সাধারণ নির্বাচন ছাড়াও ক্ষমতাসীন দল প্রয়োজন মনে করলে নেতৃত্ব পরিবর্তন ঘটাতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশসহ অনেক উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি কেন্দ্রীভূত। দলীয় নেতারা দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্বে থাকেন এবং ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরে নেতৃত্ব পরিবর্তনের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। উভয় ব্যবস্থাই গণতান্ত্রিক হলেও ব্রিটিশ অভিজ্ঞতা দেখায় যে, দলীয় অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি জাতীয় নেতৃত্বকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে।


অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটেনের একজন অভিজ্ঞ লেবার রাজনীতিবিদ। তিনি পূর্বে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেয়র হিসেবে তিনি আঞ্চলিক উন্নয়ন, শক্তিশালী জনসেবা এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল বিষয়গুলো হলো আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবহন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলকে লন্ডন ও দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের বাইরে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া। তাঁর প্রধানমন্ত্রী হওয়াকে অনেকেই লেবার পার্টির পক্ষ থেকে ভোটারদের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপন এবং অর্থনৈতিক সুযোগ, জীবনযাত্রার মান ও জনসেবা নিয়ে জনসাধারণের উদ্বেগের কার্যকর সমাধান খোঁজার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।


যুক্তরাজ্যে বিশ্বের অন্যতম সফল বাংলাদেশি প্রবাসী সম্প্রদায় বসবাস করে। হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও কর্মী ব্রিটিশ সমাজ ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের ফলে অভিবাসন নীতিতে তাৎক্ষণিক ও নাটকীয় পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এ ধরনের নীতি সাধারণত বৃহত্তর সরকারি কৌশল ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। তবে বার্নহ্যামের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনসেবা সংস্কারকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন যে, নতুন সরকার দক্ষ অভিবাসন, শিক্ষা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে কতটা উৎসাহিত করে।


বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং জনগণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এই সম্পর্কের ভিত্তি। বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের জন্য যুক্তরাজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। একই সঙ্গে ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলেছেন। নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশ-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের মৌলিক চরিত্র পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে প্রতিটি নতুন সরকারই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের উচিত কূটনৈতিক সংলাপ, সংসদীয় বিনিময়, ব্যবসায়িক ফোরাম, শিক্ষা অংশীদারিত্ব এবং বিনিয়োগ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন সরকারের সঙ্গে সক্রিয় যোগাযোগ বৃদ্ধি করা। এতে বাংলাদেশের অগ্রাধিকার বিষয়গুলো ব্রিটিশ সরকারের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতিতে যথাযথ গুরুত্ব পেতে পারে। আগামী মাসগুলোতে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ বাণিজ্য, শিক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রে সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।


বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের দীর্ঘদিনের একজন পর্যবেক্ষক ও সমর্থক হিসেবে আমি মনে করি, চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। চীন ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক একদিকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অন্যদিকে কৌশলগত উদ্বেগÑ এই দুই বাস্তবতার সমন্বয়ে গঠিত। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। একই সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কিছু ক্ষেত্রে মতপার্থক্যের কারণ হয়ে রয়েছে।


অ্যান্ডি বার্নহ্যামের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার মূলত অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোর দিকে কেন্দ্রীভূত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে স্বল্পমেয়াদে চীন নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। যুক্তরাজ্য সম্ভবত চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বজায় রাখার পাশাপাশি তার ঐতিহ্যগত পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতাও অব্যাহত রাখবে।


বাংলাদেশের জন্য স্থিতিশীল চীন-যুক্তরাজ্য সম্পর্ক ইতিবাচক। কারণ, বাংলাদেশ উভয় দেশের সঙ্গেই গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিক্ষা ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত সুযোগ থেকে উপকৃত হতে পারে। ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক: ব্রিটেনের প্রধান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবেই থাকবে। ন্যাটো, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। ভারতের সঙ্গে বিস্তৃত অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত, প্রযুক্তিগত ও প্রবাসী সংযোগের কারণে সম্পর্ক আরও দৃঢ় থাকবে বলে ধারণা করা যায়। একইভাবে জাপান বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে থাকবে।


মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা বিবেচনার দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকবে। যদিও নেতৃত্ব পরিবর্তন কূটনৈতিক অগ্রাধিকার ও শৈলীতে কিছু পরিবর্তন আনতে পারে, তবে জাতীয় স্বার্থ সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলোর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে।


বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং ন্যাটো সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা ইস্যুতে কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনের কারণে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইউক্রেনের প্রতি ব্রিটেনের সমর্থন দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনের বিস্তৃত অংশের সমর্থন পেয়ে থাকে। একইভাবে ন্যাটোর প্রতি প্রতিশ্রুতিও ব্রিটিশ নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে থাকবে। তবে বার্নহ্যামের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ওপর তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হতে পারে, যা বর্তমানে অনেক পশ্চিমা দেশের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।


বাংলাদেশের উচিত যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করা, পাশাপাশি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখা। বর্তমান আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে সফল কূটনীতির জন্য সব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতা অপরিহার্য। ব্রিটেনের এই নেতৃত্ব পরিবর্তন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সবসময় পরিবর্তনশীল। সরকার পরিবর্তিত হয়, নেতা আসেন ও যান; কিন্তু জাতীয় স্বার্থ, গঠনমূলক কূটনীতি এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতাই দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি।

লেখক: অ্যাডজাঙ্ক্ট প্রফেসর,
একজন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক বিশ্লেষক,
চীনা ভাষা শিক্ষাবিদ ও সমাজসংগঠক।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews