মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি ও সরকার—দুই জায়গাতেই বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। মহাসচিবের পদ থেকে ফখরুলের পদত্যাগে যেমন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে, তেমনি তার ছেড়ে দেওয়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়েও আসছে নতুন মুখ—এমন আলোচনা জোরালো হয়েছে। আরও কিছু মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসতে পারে।
এরই মধ্যে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিমকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শূন্য মহাসচিব পদে কে আসছেন, ছয় মাস পূর্তিতে মন্ত্রিসভায় কতটা রদবদল হচ্ছে এবং ফখরুলের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনে শেষ পর্যন্ত কে বিএনপির হাল ধরছেন—এসব প্রশ্ন এখন দল ও রাজনীতির অন্দরমহলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন ঢাবি ছাত্রদলের শীর্ষ পদে আলোচনায় যাদের নাম
রাষ্ট্রপতি পদে ফখরুলের শপথের পরপরই এসব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আরও দৃশ্যমান হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশেষ করে মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সম্ভাব্য উপনির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির ভেতরে নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
স্থানীয়ভাবে ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে তার ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন এবং বড় মেয়ে মির্জা শামারুহর নাম আলোচনায় এলেও এ বিষয়ে এখনো পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য আসেনি। ফলে রাষ্ট্রপতি ভবনে ফখরুলের যাত্রার সঙ্গে সঙ্গেই বিএনপির রাজনীতিতে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে, তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হতে যাচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ আসন।
স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত হওয়া রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা। সাবেক সচিব ইসমাইল জবিউল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পেশায় চিকিৎসক ফরহাদ হালিম জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।
নতুন চার সদস্যকে নিয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। তারা হলেন—বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম।
এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিবের পদসহ দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। অসুস্থতার কারণে বহু বছর ধরে তাকে দলের সভা ও কর্মসূচিতে দেখা যায় না।
বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলের চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বলে গণ্য হন। তাদেরসহ জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসংখ্যা ১৯ জন। চেয়ারম্যান স্বয়ং এ কমিটির প্রধান থাকবেন।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন ছাত্রদলের কমিটি প্রায়ই চূড়ান্ত: শেষ মুহূর্তে যাদের ঘিরে বেশি আলোচনা
-6a818793b98c6.jpg)
২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। এরপর সদস্যদের মৃত্যু, পদত্যাগসহ বিভিন্ন কারণে কমিটির কয়েকটি পদ শূন্য হয়। বিভিন্ন সময়ে এসব পদে নতুন সদস্য যুক্ত করেছে দলটি। এবার একসঙ্গে চারজনকে স্থায়ী কমিটিতে যুক্ত করা হলো।
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী হওয়ায় তার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ায় মন্ত্রিসভার কাজ পর্যালোচনা করে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রপতির শপথের আগে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের রদবদলের সম্ভাবনা কম। তবে কয়েকজন নতুন মুখকে যুক্ত করে সীমিত পরিবর্তন আনা হতে পারে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ আনার আলোচনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরীর নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সরকার ও বিএনপির সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকন এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান, সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, লুৎফুজ্জামান বাবর, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থের নাম আলোচনায় রয়েছে।
আবার মিত্র দল নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করা হতে পারে এমন আলোচনাও রয়েছে রাজনৈতিক মহলে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন, এমন অন্তত কয়েকজনকে পূর্ণ মন্ত্রী করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আলোচনা আছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হলেন ৪ নেতা

এ বিষয়ে এই প্রতিবেদক গত দুই দিনে সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। কিন্তু কেউ মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য রদবদলের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিএনপির মহাসচিব পদটি এখন শূন্য। এ পদে কে আসবেন, তা নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে এখনো কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আনা হয়নি।
দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে স্থায়ী কমিটির সদস্য করার পর তাকে আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে দলীয়ভাবে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন মন্ত্রিসভায় নতুন করে জায়গা পেতে পারেন যারা
-6a7f1486d5c03-6a8026ad6326b.jpg)
রাষ্ট্রপতি হলে মির্জা ফখরুলের ঠাকুরগাঁও-১ সংসদীয় আসনও শূন্য হবে। ফলে ওই আসনে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হবে। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিন এবং বড় মেয়ে মির্জা শামারুহের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে। তবে মির্জা পরিবারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে এখনো কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরসূরি নির্বাচনের এ সিদ্ধান্ত শুধু একটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং জেলার সার্বিক রাজনৈতিক ভারসাম্যের সঙ্গে যুক্ত। একদিকে তৃণমূলকে সুসংগঠিত রাখার অভিজ্ঞ নেতৃত্বের দাবি, অন্যদিকে পরিবর্তিত রাজনীতিতে তরুণ ও আধুনিক চিন্তার প্রতিনিধিত্ব—এ দুইয়ের মাঝে দলীয় নেতাকর্মীরা কিছুটা দ্বিধাবিভক্ত।
তবে এ দ্বিমুখী আলোচনার শেষ পরিণতি কী হবে, তা নির্ভর করছে বিএনপির হাইকমান্ড এবং খোদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিদ্ধান্তের ওপর। ঠাকুরগাঁওয়ের সাধারণ মানুষ ও দলীয় নেতাকর্মীরা আপাতত সেদিকেই চোখ রাখছেন।